সীমান্তবর্তী লালমনিরহাট জেলায় অতীত নির্বাচনের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, সাংগঠনিক শক্তি থাকা সত্ত্বেও জামায়াতে ইসলামীর ভোট কখনোই উল্লেখযোগ্য ছিল না। তবে চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী রাজনৈতিক বাস্তবতায় জেলার তিনটি আসনেই জামায়াতের প্রার্থীরা শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন।

ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জেলার তিনটি আসনের মধ্যে অন্তত দুটি আসনে জামায়াতে ইসলামী ও বিএনপির মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হতে যাচ্ছে। এবার যদি জামায়াত কোনো আসনে জয়ী হয়, তবে সেটি হবে দলটির জন্য ঐতিহাসিক সাফল্য। অন্যদিকে নিকট অতীতে লালমনিরহাটে বিএনপিরও জয়ের নজির নেই। ফলে বিএনপি জয়ী হলেও সেটি হবে তাদের জন্য নতুন অভিজ্ঞতা।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জেলার একাধিক আসনে বিএনপির অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব জামায়াতের জন্য ‘সুযোগ’ তৈরি করেছে। তবে বিএনপি ঐক্যবদ্ধ না হলে এই দ্বন্দ্ব তাদের জন্য ‘বুমেরাং’ হয়ে ফিরতে পারে। অপরদিকে জামায়াতের সাংগঠনিক তৎপরতা, বিশেষ করে নারী কর্মীদের বাড়ি-বাড়ি গিয়ে প্রচারণা চালানো, দলটির অবস্থানকে আরও শক্ত করেছে বলে মনে করছেন ভোটাররা।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর থেকেই জেলাজুড়ে প্রচার-প্রচারণায় উত্তাপ ছড়িয়েছে। গ্রাম-গঞ্জ, হাট-বাজার থেকে চায়ের দোকান—সবখানেই এখন আলোচনার কেন্দ্রে প্রার্থী, প্রতিশ্রুতি ও ভোট। দীর্ঘদিন ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত থাকার অভিযোগ তুলে এবার পরিবর্তনের প্রত্যাশা করছেন ভোটাররা।

স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, এবারের নির্বাচন শুধু সংসদ সদস্য বাছাইয়ের বিষয় নয়; বরং এটি দীর্ঘদিনের ক্ষোভ, বঞ্চনা ও প্রত্যাশার বহিঃপ্রকাশ। তিস্তা নদীকেন্দ্রিক উন্নয়ন বঞ্চনা, সীমান্ত নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান ও কৃষি সংকট—এসব ইস্যু ভোটের রাজনীতিকে ভিন্ন মাত্রা দিয়েছে।

লালমনিরহাট-১: অভিজ্ঞতা বনাম সংগঠন

পাটগ্রাম ও হাতীবান্ধা উপজেলা নিয়ে গঠিত লালমনিরহাট-১ আসনে বিএনপির প্রার্থী ব্যারিস্টার হাসান রাজীব প্রধান এবং জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী আনোয়ারুল ইসলাম রাজুর মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতার আভাস মিলছে। পাশাপাশি জাতীয় পার্টির সাবেক মহাসচিব মশিউর রহমান রাঙ্গার সক্রিয় প্রচারণা এই আসনে উত্তাপ বাড়িয়েছে।

আওয়ামী লীগের মোতাহার হোসেন এই আসনে দুই দশকের বেশি সময় প্রতিনিধিত্ব করেছেন। বিএনপি ও জামায়াতের জয়ের ইতিহাস প্রায় নেই বললেই চলে। ফলে এবার যে দলই জয়ী হোক, সেটি হবে নতুন অভিজ্ঞতা।

এই আসনে মোট ভোটার ৪ লাখ ৩৫ হাজার ৬১ জন; এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ২ লাখ ২ হাজার ৭০৭ এবং নারী ভোটার ২ লাখ ৮৫২ জন। হিজড়া ভোটার রয়েছেন দুজন।

লালমনিরহাট-২: বিএনপি–জামায়াতের মূল লড়াই

কালীগঞ্জ ও আদিতমারী উপজেলা নিয়ে গঠিত লালমনিরহাট-২ আসনে বিএনপির প্রার্থী রোকন উদ্দিন বাবুল এবং জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী ফিরোজ হায়দার লাভলুর মধ্যে মূল প্রতিযোগিতা হবে বলে ধারণা স্থানীয়দের। যদিও সদ্য নিবন্ধিত জনতার দলের চেয়ারম্যান অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শামীম কামালও এই আসনে প্রার্থী।

এই আসনে মোট ভোটার ৪ লাখ ৩২ হাজার ৯৬৪ জন; এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ২ লাখ ১৭ হাজার ২০০ এবং নারী ভোটার ২ লাখ ১৫ হাজার ৭৬১ জন। হিজড়া ভোটার রয়েছেন তিনজন।

লালমনিরহাট-৩: তিস্তা আন্দোলনের ছাপ

সদর উপজেলা নিয়ে গঠিত লালমনিরহাট-৩ আসনে বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক ও তিস্তা নদী রক্ষা আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী আসাদুল হাবিব দুলু ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তাঁর বিপরীতে জামায়াতে ইসলামীর জেলা আমির আবু তাহের মাঠে রয়েছেন।

একসময় জাতীয় পার্টির শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত এই আসনে বর্তমানে দলটির প্রভাব কমেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। দীর্ঘদিনের মাঠপর্যায়ের সম্পৃক্ততার কারণে দুলুর প্রতি ভোটারদের বড় একটি অংশ ঝুঁকছে বলেও জানা গেছে।

এই আসনে মোট ভোটার ৩ লাখ ৭ হাজার ৯৭০ জন; এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ১ লাখ ৫৪ হাজার ১৬৭ এবং নারী ভোটার ১ লাখ ৫৩ হাজার ৮০১ জন। হিজড়া ভোটার রয়েছেন দুজন।

সীমান্ত জেলা, আলাদা বাস্তবতা

ভৌগোলিকভাবে লালমনিরহাট একটি দীর্ঘ সীমান্ত জেলা। তিস্তা নদী ও ভারতীয় সীমান্ত ঘেরা এই জেলার জীবন-জীবিকা, অর্থনীতি ও রাজনীতির সঙ্গে নদী ও সীমান্ত বাস্তবতা ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে। জেলার তিনটি আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ১১ লাখ ৪৪ হাজার ৪৯৬ জন।

সব মিলিয়ে এবারের নির্বাচনকে লালমনিরহাটের মানুষ শুধু সংসদ সদস্য নির্বাচনের লড়াই হিসেবে নয়; বরং তিস্তা সমস্যার সমাধান, সীমান্ত নিরাপত্তা এবং দীর্ঘদিনের বঞ্চনা ঘোচানোর প্রত্যাশার প্রতিফলন হিসেবেই দেখছেন। অনেক ভোটারই বলছেন, এবার দলীয় পরিচয়ের চেয়ে প্রার্থীর গ্রহণযোগ্যতা, সক্ষমতা ও বিশ্বাসযোগ্যতাই হবে ভোট দেওয়ার প্রধান মানদণ্ড।