ভোটের সংস্কৃতিতে ‘মার্কা’ দেখে ভোট দেওয়ার প্রবণতার তীব্র সমালোচনা করেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর। তিনি বলেন, ‘আমরা যদি কেবল মার্কার ভিত্তিতে ভোট দেই, তাহলে অবশ্যই একজন স্বৈরাচারী প্রধানের জন্য পরিবেশ তৈরি করছি।’
সোমবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ের পর্যটন ভবনে রাষ্ট্রায়ত্ত গবেষণা সংস্থা বিআইডিএসের বার্ষিক সম্মেলনের ‘উন্নয়ন ও গণতন্ত্র’ অধিবেশনে এসব কথা বলেন গভর্নর। আলোচনায় ছিলেন অর্থনীতিবিদ রেহমান সোবহান, বিআইডিএসের সাবেক মহাপরিচালক কেএএস মুরশিদ, পরিকল্পনা কমিশনের জিইডি সদস্য মঞ্জুর হোসেন এবং ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের নির্বাহী পরিচালক সুলতান হাফিজ রহমান। অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন বিআইডিএস মহাপরিচালক এ কে এনামুল হক।
‘আমি তোমাকেই চাই’ সংস্কৃতি
গণ অভ্যুত্থানের আগে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে শেখ হাসিনার এক সভার উদাহরণ টেনে আহসান মনসুর বলেন, ব্যবসায়ীরা প্রকাশ্যে বলছিলেন— ‘তাকে ছাড়া দেশ চলবে না’। তার পর্যবেক্ষণ, ‘এই যে আমরা এমন অবস্থায় নিজেদের নিয়ে যাই, এর পেছনে আমাদের নিজেদেরই আত্মবিশ্লেষণ দরকার।’
তিনি বলেন, প্রতীকনির্ভর ভোটের কারণে দল, সরকার এবং পরে পুরো রাষ্ট্র পরিচালনার প্রক্রিয়া এক ব্যক্তির হাতে কুক্ষিগত হয়। এর ফলে ‘প্যাট্রন–ক্লায়েন্ট’ সম্পর্ক গড়ে ওঠে— যেখানে টিকে থাকতে হলে সরকারকেই সন্তুষ্ট রাখতে হয়।
‘যোগ্যতা দেখলে অনেকেই উঠে আসতেন’
গভর্নরের মতে, প্রতীক নয়— প্রার্থীর যোগ্যতা ও সততা বিবেচনায় ভোট দিলে দেশে বহু যোগ্য মানুষ উঠে আসতেন। তিনি বুদ্ধিজীবী মহলের ‘অবক্ষয়’-এর কথাও তুলেন ধরেন।
তিনি বলেন, ‘গত ১৫ বছরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, শিক্ষক সমিতি বা ইন্টেলেকচুয়াল গ্রুপ— কোথাও কোনো আলোড়ন দেখিনি। এটা খুবই দুঃখজনক।’
‘৯১–এর পর গণতন্ত্র, আসলে ছিল না’
গণতন্ত্রের ধারাবাহিকতা ব্যাহত হওয়ার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ১৯৯১ সালের পর যাদেরই ক্ষমতায় আসা, তারা ক্ষমতা ধরে রাখার প্রবল চেষ্টা করেছেন। ‘অবৈধভাবে হলেও ক্ষমতা ধরে রাখার প্রবণতা’ তাদের মধ্যে ছিল বলে মন্তব্য করেন তিনি।
তার ভাষায়, ‘এ নির্বাচন প্রক্রিয়ায় ক্ষমতা এত বড় হয়ে যায় যে এটাকে আর ছাড়া যায় না। ছেড়ে দিলে আমি আর আমি থাকব না— সাধারণ হয়ে যাব বা দেশ ছাড়তে হবে। অথচ উন্নত দেশে প্রধানমন্ত্রীসহ সবাই সাধারণ নাগরিক হয়ে ফেরত যান।’
রাজনৈতিক দলেও গণতন্ত্রের প্রয়োজন
শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তর না হওয়াকে বড় সংকট হিসেবে চিহ্নিত করে আহসান মনসুর বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যেই গণতান্ত্রিক চর্চা প্রতিষ্ঠা করা জরুরি। মনোনয়ন–প্রক্রিয়াকে তিনি ‘ওহি নাজিল’-এর মতো একমুখী ও অস্বচ্ছ বলে অভিহিত করেন।
পরিস্থিতি বদলে না গেলেও তিনি আশাবাদী হওয়ার কথা জানান— ‘যাই হোক, আমাদের আশাবাদী হতে হবে।’
পূর্বের পোস্ট :