ঢাকা: সারাদেশে রেলপথের অধিকাংশ লেভেল ক্রসিং অরক্ষিত ও দুর্বল ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত হওয়ায় এগুলো এখন কার্যত ‘মরণফাঁদে’ পরিণত হয়েছে। অবৈধ ক্রসিং, গেইটম্যানের ঘাটতি, আধুনিক সংকেত ব্যবস্থার অভাব এবং তদারকির দুর্বলতাকে দুর্ঘটনার প্রধান কারণ হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।

রেলওয়ের তথ্য অনুযায়ী, দেশে মোট ১ হাজার ৪৬৮টি লেভেল ক্রসিং রয়েছে, যার অর্ধেকের বেশি অবৈধ। পূর্বাঞ্চলের ৮১১টি ক্রসিংয়ের মধ্যে মাত্র ৩২০টিতে এবং পশ্চিমাঞ্চলের ৬৫৭টির মধ্যে ২৪৪টিতে গেইটম্যান রয়েছে। অর্থাৎ মোট নেটওয়ার্কের মাত্র ২০ থেকে ২৫ শতাংশ ক্রসিংয়ে গেইটম্যান আছে; বাকিগুলো অরক্ষিত বা অনিয়মিত তদারকিতে চলছে।

অন্যদিকে, রেলের অনুমোদনের বাইরে অন্তত ১ হাজার ৩২১টি ক্রসিং তৈরি হয়েছে, যার অনেকগুলো স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তিগত উদ্যোগে নির্মিত। এসব ক্রসিংয়ের অধিকাংশেই নেই গেইটম্যান, সিগন্যাল বা নিরাপত্তা ব্যবস্থা।

বুয়েটের দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক হাদিউজ্জামান লেভেল ক্রসিংগুলোর অবস্থা ‘ভয়ানক নাজুক’ বলে উল্লেখ করে বলেন, অধিকাংশ স্থানে সংকেত বাতি, সাইরেন এমনকি যোগাযোগ ব্যবস্থাও অকার্যকর। “এটি এক ধরনের ভয়াবহ দুর্যোগ,” বলেন তিনি।

গবেষণা বলছে, দেশের ৬৯ থেকে ৮২ শতাংশ লেভেল ক্রসিং অরক্ষিত। ফলে রেল দুর্ঘটনার ৮০ থেকে ৯০ শতাংশই এসব ক্রসিংয়ে ঘটে। ২০২৪ সালে ২৫৩টি দুর্ঘটনায় ২৩০ জন নিহত হন। ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে এপ্রিলেই ৫৪টি দুর্ঘটনায় প্রাণ গেছে ৪৮ জনের।

সম্প্রতি কুমিল্লার পদুয়ার বাজারে ট্রেন-বাস সংঘর্ষে ১২ জনের মৃত্যু তদন্তে গেইটম্যানদের অবহেলা সামনে এসেছে। অভিযোগ রয়েছে, অনেক ক্ষেত্রে দায়িত্বপ্রাপ্ত গেইটম্যানের পরিবর্তে ভাড়ায় অন্য লোক কাজ করেন, যা নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়ায়।

বাংলাদেশ যাত্রীকল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ ক্রসিং চিহ্নিত করে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে দুর্ঘটনার তদন্তে জবাবদিহিতা বাড়ানোরও তাগিদ দেন তিনি।

সমস্যা সমাধানে স্বয়ংক্রিয় সংকেত ব্যবস্থা চালু, ওভারপাস-আন্ডারপাস নির্মাণ এবং অপ্রয়োজনীয় ক্রসিং বন্ধের পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, কিছু ক্রসিংয়ে সাইরেন ও সতর্কীকরণ ব্যবস্থা উন্নত করা হচ্ছে এবং নিয়ন্ত্রণ কক্ষ থেকে গেইটম্যানদের তদারকি জোরদার করা হয়েছে। ভবিষ্যতে গুরুত্বপূর্ণ ক্রসিংয়ে ওভারপাস বা আন্ডারপাস নির্মাণের পরিকল্পনাও রয়েছে।

তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, কেবল অবকাঠামো নয়, দক্ষ জনবল, আধুনিক প্রযুক্তি এবং সমন্বিত ব্যবস্থাপনাই পারে রেলক্রসিংয়ের এই দীর্ঘদিনের ঝুঁকি কমাতে।