প্রায়শই সংবাদের প্রতিবেদনে বলা হয় ভর্তুকি মূল্যে দেশের দরিদ্র মানুষদের যেসব খাদ্যপণ্য দেয়া হয় তা নিম্নমানের এবং এ ধরণের কার্যকলাপ দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য প্রহসন ছাড়া আর কিছু না। কিন্তু অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে ভর্তুকি মূল্যে দেয়া এসব পণ্য নিম্নমানের হওয়া জরুরি এবং পণ্য যতটা নিম্নমানের হবে সামাজিক নিরাপত্তা ততটাই নিশ্চিত হবে।

ধ্রুপদী অর্থনৈতিক বিচারে বাজারে তিন ধরণের পণ্য আছে— বিলাসবহুল পণ্য, স্বাভাবিক পণ্য এবং নিম্নমানের পণ্য। বাংলাদেশের যারা ধনী এবং অতিধনী তারা মূলত বিলাসবহুল পণ্যের সবচেয়ে বড় খরিদদার। যারা মধ্যবিত্ত এবং নিম্ন মধ্যবিত্ত তারা স্বাভাবিক পণ্যের ক্রেতা এবং যারা দরিদ্র এবং হতদরিদ্র তারা নিকৃষ্ট পণ্যের গ্রাহক। সরকার যদি সামাজিক নিরাপত্তা বলয়ে দেশের দরিদ্র এবং হতদরিদ্র মানুষের জন্য স্বাভাবিক পণ্যের ব্যবস্থা করে তাহলে সবচেয়ে বড় সমস্যা হবে— যে পণ্য দরিদ্র এবং হতদরিদ্র মানুষের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে তা আদতে তাদের কাছে পৌঁছাবেই না, বরং চলে যাবে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর হাতে।

যদিও এই বয়ান শুনে বড় একটি অংশ বলবেন, দরিদ্র মানুষের প্রতি অমানবিক এবং অবিচার করার উদ্দেশ্যেই পুঁজিবাদী অর্থনীতি এই তত্ত্বের অবতারণা করেছে এবং এসব তত্ত্বের সঙ্গে বাস্তবের আসলে কোনো মিল নেই। কিন্তু বছরখানেক আগেও আওয়ামী লীগের শাসনামলে ন্যায্যমূল্যে এবং কিছুক্ষেত্রে ভর্তুকি মূল্যে সারাদেশে ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) এক কোটি ফ্যামিলি কার্ড দেয়া হয়৷ আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর দেখা যায়, এই এক কোটি কার্ডের মধ্যে প্রায় ৪০ লাখ কার্ড তারা পেয়েছেন যাদের টিসিবির ভর্তুকি মূল্যে পণ্য পাবার কোনো প্রয়োজন নেই এবং বাজারমূল্যে পণ্য কেনার সামর্থ্য তাদের আছে।

কেন তাহলে প্রায় অর্ধেকের বেশি মানুষ যারা আদতে দরিদ্র না কিন্তু দরিদ্র মানুষের জন্য বরাদ্দকৃত সুবিধা নিয়েছেন? বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এই সুবিধা পাওয়ার জন্য এলাকার প্রশাসন এবং নেতৃস্থানীয়দের ঘুষ পর্যন্ত দিয়েছেন মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্তরা৷ খেয়াল করলে দেখা যাবে, টিসিবির মাধ্যমে যে চিনি, তেল, পেঁয়াজ, ডাল এবং রমজানে ছোলা ও খেঁজুর দেয়া হয় তার মান বেশ ভালো।মান ভালো হওয়ার কারণে এসব পণ্য নিকৃষ্ট পণ্যের কাতারে না পড়ে জায়গা করে নিয়েছে স্বাভাবিক পণ্যের কাতারে। এতে করে বদলে গেছে এসব পণ্যের ভোক্তা। মধ্যবিত্ত সম্প্রদায় কম দামে পণ্য পেতে তছরুপ করেছে দরিদ্র মানুষের হক। আবার মধ্যবিত্ত এই শ্রেণীর ঘুষ দেয়ার সামর্থ্য থাকার কারণে প্রশাসন ও প্রতিনিধিরাও দুর্নীতিগ্রস্থ হওয়ার সুবর্ণ সুযোগ পেয়েছেন এবং সেটি কাজেও লাগিয়েছেন।

যদি টিসিবির পণ্য স্বাভাবিক পণ্য না হয় নিকৃষ্ট পণ্য হতো— অর্থাৎ যদি পেঁয়াজ বা চিনি ভালো মানের না হতো। তেল যদি বোতলজাত না হয় খোলা ও ময়লা তেল হতো, খেঁজুর যদি নিম্নমানের হতো তাহলে এসব পণ্য মধ্যবিত্ত শ্রেণীকে আকৃষ্ট করতো না এবং দরিদ্র মানুষদের এই পণ্য পেতে মধ্যবিত্তদের সঙ্গে প্রতিযোগিতাও করতে হতো না।

এই একই কথা প্রযোজ্য খাদ্য মন্ত্রণালয়ের ওপেন মার্কেট সেল (ওএমএস) কর্মসূচির ক্ষেত্রেও। ২০২৫ সালে শুধু ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনে ওএমএস ডিলারশিপ পাওয়ার জন্য আলাদা সিন্ডিকেট গড়ে তোলা, লটারির মাধ্যমে ডিলার নির্বাচনে কারসাজি এবং ডিলারদের থেকে ঘুষ গ্রহণের মতো অভিযোগ উঠেছে। কেন একটি অংশ ওএমএসের ডিলারশিপ পেতে এত মরিয়া তার কারণও স্পষ্ট। ওএমসের মাধ্যমে যেসব চাল বা আটা দেয়া হয় তার মান ভালো এবং ভর্তুকি মূল্যের এসব চাল বা আটা গুদামজাত করে খোলাবাজারে বিক্রি করলে রাতারাতি বড় মুনাফা করা সম্ভব। এই ভালো মানের চাল ও আটাই কাল হয়েছে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য। প্রায়শই শোনা যায় ওএমসের চাল তছরুপ করেছেন ডিলার কিংবা এলাকার প্রতিনিধিরা। যদি এই চাল বা আটা ভালো মানের না হতো এবং বাজারে বিক্রি করলে যদি মধ্যবিত্ত ক্রেতা পাওয়া না যেত তাহলে এ ধরণের দুর্নীতি হওয়ার সম্ভাবনাও অনেকাংশে কমে যেত। তাই ওএমএসের চালে বা আটায় পোকা থাকা মূলত দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য শাপেবর। কেননা সাদা চোখে ভালো পণ্য দেয়া হচ্ছে এটি যথেষ্ট মানবিক দেখালেও ভালো পণ্য আসলে যারা সত্যিকার ভাগিদার তাদের হাতে পৌঁছায় না, পৌঁছায় আরেকটি গোষ্ঠীর হাতে।

আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর ২০২৬ সালে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এসেছে এবং দেশের নতুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্বাচনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইশতেহারের একটি হচ্ছে ফ্যামিলি কার্ড। এই ফ্যামিলি কার্ডের পাইলট প্রজেক্ট ইতোমধ্যে উদ্বোধন হয়েছে এবং উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে দেখা গেছে দরিদ্র নারীরা এই কার্ড পেয়ে মহাখুশি। নিঃসন্দেহে তারেক রহমানের এই উদ্যোগ জনহিতকর। কিন্তু অর্থনীতির দৃষ্টিকোণ থেকে এই উদ্যোগের বড় কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে।

অর্থনীতিবিদ আকবর আলী খান তার পরার্থপরতার অর্থনীতি বইয়ে ভর্তুকির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরেছেন এবং ভালো উদ্দেশ্যেও সামাজিক কল্যাণমূলক কাজ করতে গেলে হিতে বিপরীত হতে পারে সেইদিকটি তুলে ধরেছেন একটি উদাহরণের মাধ্যমে। প্রাচীন কৌনজের রাজা হর্ষবর্ধন প্রতি চারবছর অন্তর প্রয়াগের মেলায় নিজের সব সম্পত্তি বিলিয়ে দিতেন গরীবদের মধ্যে। সে এতটাই দানশীল ছিলেন যে সব সম্পত্তি বিলিয়ে দিয়ে নিজের পোশাকটি পর্যন্ত শেষমেশ দান করে গঙ্গাস্নান সেরে অন্যের থেকে বস্ত্র ধার করে ঘরে ফিরতেন। হর্ষবর্ধনের দরবারের জীবনীকারদের বয়ানে এই ইতিহাস সুন্দর শোনালেও আকবর আলী খান এর একটি যৌক্তিক রূপ তুলে ধরেছেন। তার মতে, হর্ষবর্ধন স্বেচ্ছায় তার পোশাক দান করতেন না বরং দানের এই মহাযজ্ঞ এমন এক পর্যায়ে পৌঁছাতো যখন জনতাই হর্ষবর্ধনের কাপড় পর্যন্ত ছিড়ে নিয়েছিল। হর্ষবর্ধন দিশেহারা হয়ে গঙ্গায় ঝাঁপ দিয়েছিলেন এবং কাপড় ধার করে রাজ্যে ফিরেছিলেন।

একটি রাষ্ট্রে ভর্তুকির অর্থ বেড়ে যাওয়া মানে হচ্ছে একটি বড় অংশের উপকারভোগী জনগণের কাছে এই বার্তা দেয়া, কাজ না করেও সরকারের বদান্যতায় বেঁচে থাকা যায়। বিশ্বের কল্যাণমুখী এবং উন্নত রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সমস্যা এখন ভর্তুকির অর্থ এবং অকর্মণ্য জনতা। প্রায়শই মালয়েশিয়ার অর্থনীতির সঙ্গে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অর্থনীতির রোডম্যাপের তুলনা করা হয়। মালয়েশিয়ার সবচেয়ে বড় সমস্যা তাদের সামাজিক নিরাপত্তায় ব্যয় করা ভর্তুকির অর্থ। মালয়েশিয়ায় যারা ভূমিপুত্র বা আসল মালয় তারা বড় রকমের সামাজিক নিরাপত্তা বলয়ের উপকারভোগী। এদের এতটাই সুবিধা দেয়া হয়েছে যে তারা এখন আর চাকরি করতে ইচ্ছুক না, বলতে গেলে কর্মবিমুখ। আর তাইতো অর্থনীতি সামলাতে মালয়েশিয়াকে নির্ভর করতে হচ্ছে চীনা মালয়, তামিল মালয় এবং বিদেশ থেকে আসা শ্রমিকদের ওপরে। বাংলাদেশের ফ্যামিলি কার্ডের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ— অর্থ তছরুপ। ডিজিটাল মাধ্যমে অর্থ দেয়া হলেও এই অর্থ যে সঠিক সুবিধাভোগীর কাছে পৌঁছাচ্ছে দুয়ারে দুয়ারে গিয়ে সেই দেখভাল করার জনবল এবং যে জনবল আছে তারা দুর্নীতিগ্রস্ত না সেই নিশ্চয়তা পাওয়া দূরহ। ফ্যামিলি কার্ডের পাশাপাশি কৃষি কার্ডে কৃষককে ঋণের সুদ মওকুফ করে দেয়া হলে সেখানেও বড় দুর্নীতির শঙ্কা দেখা দিবে। কেননা ইতোমধ্যে স্বল্প সুদে যে কৃষিঋণ দেয়া হয়, তার অধিকাংশের সুবিধাভোগী কৃষকশ্রেণী নন বরং মহাজন শ্রেণী। সেখানে সুদ মওকুফের মতো ঘটনা ঘটলে সুদ মওকুফ করিয়ে দেয়া হবে এই বলেই সাধারণ কৃষকদের থেকে অনৈতিক সুবিধা নেবে অনেক স্থানীয় প্রতিনিধি।

অন্যদিকে যে গৃহ পরিচারিকা এতদিন পাঁচ বাসায় কাজ করে মাসে পাঁচ হাজার টাকা পেতেন সেখানে ফ্যামিলি কার্ডে কিছু না করেই পাঁচ হাজার টাকা পেলে আদতে তার উৎপাদনশীলতা কমবে। অনেকক্ষেত্রে তারা বাসাবাড়িতে কাজের বেতন বাড়ানোর দাবি জানাবেন এবং চাপ বাড়বে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর ওপরে। একদিকে ভর্তুকির অর্থ জোগাতে সরকারকে আয়কর ও মূল্য সংযোজন কর বাড়াতে হবে, পণ্যের ওপর বাড়িত কর আরোপ করতে হবে— সেই চাপও সরাসরি পড়বে মধ্যবিত্ত ভোক্তার ওপরে, অন্যদিকে যারা দরিদ্র এবং যাদের অনেকেই কাজ করতে ইচ্ছুক না তাই দরিদ্র তাদের সংখ্যা বাড়বে।

রাণী প্রথম এলিজাবেথের সময়ে যুক্তরাজ্যে গরীব জনগোষ্ঠীকে নগদ অর্থ প্রদানের যে আইন পাশ করা হয়েছিল সেটি ১৮৩৪ সালে গিয়ে আবার রহিত করতে বাধ্য হয়েছিল সরকার। কেননা নগদ অর্থ সবসময়ই লোভনীয় এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সেটি দরিদ্র মানুষের কাছে পৌঁছায় না এবং যদি পৌঁছায়ও সেটি দরিদ্র মানুষ বাড়তি উপার্জন এবং অবস্থা উন্নতির মাধ্যম হিসেবে না দেখে জীবিকার একমাত্র মাধ্যম হিসাবে গণ্য করে অলস সময় কাটাতে চায় যা দেশের উৎপাদনশীলতার জন্য ক্ষতিকর।

মনঃস্তাত্ত্বিক জায়গা থেকেও অধিক ভর্তুকি দেশের অর্থনীতিকে দুর্বল করে তুললেও জনগণের কাছে সরকারপ্রধানকে সাময়িক সময়ের জন্য জনপ্রিয় করে তোলে। জনগণ নগদ অর্থ পেয়ে সরকারপ্রধানের বদান্যতার প্রশংসা করে। এই প্রশংসার জোয়ারে জনগণ এবং সরকার দুই শ্রেণীই আমোদে ভাসতে থাকলেও আদতে রাষ্ট্রের অর্থনীতির বড় কোনো উন্নয়ন হয় না এবং অনেক ক্ষেত্রে সরকারের প্রতি অন্ধ সমর্থন আদায়ের হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করা হয় যেটি একসময় জার্মানিতে ব্যবহার করেছিলেন বিসমার্ক এবং যুক্তরাজ্যে চার্চিল। যার বড় একটি উদাহরণ সর্বশেষ বাংলাদেশের উচ্ছেদ হওয়া সরকার প্রধান শেখ হাসিনা।

সেই হিসাবে জনগণকে রাজা হর্ষবর্ধনের মতো ঢেলে দিতে চাইলে সেটিকে অর্থনীতির কানুন সমর্থন করবে না এবং এরপরও নিতান্ত বদান্যতা দেখাতে চাইলে গঙ্গাজলে ঝাঁপ দেয়ার প্রস্তুতি নিয়েই এমন দানশীলতা দেখানো উচিত। অনেক ক্ষেত্রে টিসিবির পচা পেঁয়াজ কিংবা ওএমসের পোকা ধরা আটা যা রোদের মধ্যে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে আনতে হয়; দেশের সামাজিক নিরাপত্তার জন্য এটিই যে উপযুক্ত (যদিও মানবিক না) সেটিও দেশের কল্যাণকামী মহলকে বুঝতে হবে।