নতুন ইনিশিয়াল পাবলিক অফারিং (আইপিও) বিধিমালা গেজেট আকারে প্রকাশ পেয়েছে। এর মাধ্যমে চলতি বছর পুঁজিবাজারে ভালো কোম্পানি আসবে বলে প্রত্যাশা করছে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)।
বৃহস্পতিবার রাতে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বিএসইসি জানায়, ৩০ ডিসেম্বর গেজেট আকারে প্রকাশ পেয়েছে Bangladesh Securities and Exchange Commission (Public Offer of Equity Securities) Rules, 2025। গেজেট প্রকাশের দিন থেকেই নতুন বিধিমালা কার্যকর হিসেবে গণ্য হবে।
নতুন আইপিও বিধিমালায় পুঁজিবাজারে কোম্পানি তালিকাভুক্তির ক্ষেত্রে স্টক এক্সচেঞ্জের ক্ষমতা বাড়ানো হয়েছে। বিধিমালা অনুযায়ী, আইপিও অনুমোদনের ক্ষেত্রে স্টক এক্সচেঞ্জ প্রাথমিক যাচাই ও অনুমোদন দেবে। স্টক এক্সচেঞ্জের সুপারিশের ভিত্তিতে বিএসইসি চূড়ান্ত অনুমোদন দেবে।
এ ছাড়া আইপিওর মাধ্যমে তালিকাভুক্ত হতে কোম্পানির পরিশোধিত মূলধন কমপক্ষে ৩০ কোটি টাকা হতে হবে। আইপিও–পরবর্তী মোট শেয়ারের অন্তত ১০ শতাংশ পুঁজিবাজারে ছাড়তে হবে। নতুন বিধিমালায় আরও বলা হয়েছে, আইপিওর মাধ্যমে উত্তোলিত অর্থ পাঁচ বছরের মধ্যে ব্যবহার শেষ করতে হবে।
নতুন আইপিও বিধিমালা কার্যকর প্রসঙ্গে বিএসইসির পরিচালক ও মুখপাত্র আবুল কালাম বলেন, “মিউচুয়াল ফান্ড ও মার্জিন রুলস সংস্কারের পর সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং কাজ ছিল আইপিও বিধিমালা সংস্কার। ডিসেম্বরের মধ্যেই তা সম্পন্ন করে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। নতুন আইপিও বিধিমালা দীর্ঘমেয়াদে পুঁজিবাজারের জন্য ইতিবাচক হবে।”
আইপিও বিধিমালা চূড়ান্ত হওয়ার আগেও এক বছর ধরে বাজারে ভালো কোম্পানি আনার চেষ্টা করেছিল কমিশন। তবে সেই প্রচেষ্টা আলোর মুখ দেখেনি। রাষ্ট্রায়ত্ত ও বহুজাতিক কোম্পানিগুলোকে তালিকাভুক্ত করতে একাধিক বৈঠক হলেও পুঁজিবাজারে নতুন কোনো ভালো কোম্পানি আসেনি। এতে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে চরম হতাশা তৈরি হয়েছে।
পুঁজিবাজারের বিনিয়োগকারী সাজ্জাদুল ইসলাম বলেন, “একটি ভালো কোম্পানি পুরো বাজার ঘুরিয়ে দিতে পারে। কিন্তু এক বছরেও কমিশন একটি ভালো কোম্পানি আনতে পারেনি। স্কয়ার ফার্মা, গ্রামীণফোন বা রবির মতো কোম্পানি বাজারে আসার সময় বাজার ঘুরে দাঁড়িয়েছিল। অথচ নতুন কমিশন দায়িত্ব নেওয়ার পর এখনো একটি ভালো কোম্পানি আনতে পারেনি।”
আরেক বিনিয়োগকারী আবুল হোসেন বলেন, ভালো কোম্পানির আশায় বিনিয়োগকারীরা দীর্ঘদিন ধরে অপেক্ষা করছেন। কিন্তু নতুন কোনো ভালো কোম্পানি তালিকাভুক্ত না হওয়ায় অনেকে হতাশ হয়ে বাজার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন।
এক বছরে ভালো কোম্পানি তালিকাভুক্ত না হওয়ার বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিএসইসির এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, বাজারটি মূলত আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় আটকে আছে। এই জটিলতা না থাকলে বহুজাতিক কোম্পানি না এলেও রাষ্ট্রায়ত্ত ভালো কোম্পানিগুলো বাজারে আনা সম্ভব হতো।
তিনি বলেন, “১৮টি রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানিকে সরাসরি পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত করতে কমিশন বছরজুড়ে চেষ্টা করেছে। প্রধান উপদেষ্টার নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সচিবদের গড়িমসির কারণে বিষয়টি এগোয়নি। একাধিক বৈঠক হলেও তারা বিষয়টি আমলে নেননি।”
নতুন আইপিও বিধিমালার আওতায় কবে নাগাদ নতুন কোম্পানি আসতে পারে—এ প্রশ্নে বিএসইসির মুখপাত্র আবুল কালাম বলেন, চলতি বছরেই বাজারে ভালো কোম্পানি তালিকাভুক্ত হবে বলে কমিশন আশাবাদী।
তবে বিনিয়োগকারীদের অভিযোগ, বর্তমান কমিশন দায়িত্ব নেওয়ার পর ডজনখানেক আইপিও আবেদন বাতিল করেছে। এতে ইস্যু ম্যানেজার হিসেবে মার্চেন্ট ব্যাংকগুলো নতুন আইপিও আনতে আগ্রহ হারিয়েছে।
এ বিষয়ে আবুল কালাম বলেন, “তাড়াহুড়ো করে কোনো খারাপ কোম্পানি আমরা বাজারে আনিনি। আগের কমিশনের সময়ে আসা বেশির ভাগ আইপিও ছিল মানহীন, যা বাজারে অস্থিরতা ও কারসাজি বাড়িয়েছে। আমরা কারসাজিমুক্ত বাজার গড়তে ভালো কোম্পানি তালিকাভুক্তির ওপর জোর দিচ্ছি।”
তবে নির্বাচনের আগে আইপিও আসার সম্ভাবনা কম বলে মনে করেন ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশনের (ডিবিএ) সভাপতি সাইফুল ইসলাম। তিনি বলেন, বাজারে সুশাসন নিশ্চিত না হলে ভালো কোম্পানি আসতে আগ্রহী হবে না।
“ভারতের সঙ্গে তুলনা না করলেও পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কার পুঁজিবাজারের সুশাসন সূচকের তুলনায় বাংলাদেশ অনেক পিছিয়ে। এ জায়গায় উন্নয়ন না হলে বাজার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরবে না,” বলেন তিনি।
সাইফুল ইসলাম আরও বলেন, ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের পর নতুন সরকার দায়িত্ব নিলে বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরতে পারে। তখন ভালো কোম্পানি তালিকাভুক্ত করা গেলে বাজারের চিত্র বদলাতে পারে।
কমিশন সূত্র জানায়, ভালো কোম্পানির আইপিও আনতে একমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশ (আইসিবি)–কে ইস্যু ম্যানেজারের দায়িত্ব দেওয়া হলেও কাঙ্ক্ষিত সুফল মেলেনি।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, একসময় লাভজনক প্রতিষ্ঠান আইসিবি এখন লোকসানে পড়েছে। ২০২৪–২৫ অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটির লোকসান ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। ঋণের ওপর নির্ভর করে টিকে আছে আইসিবি, আর সুদ পরিশোধে বারবার শেয়ার বিক্রি করতে হচ্ছে।
তবে আইসিবি ঘুরে দাঁড়াতে পারবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবু আহমেদ। তিনি বলেন, “অনেক চড়াই-উতরাই পার হয়েও আইসিবি টিকে আছে। আগে আইসিবির অর্থ দিয়ে কিছু বাজে আইপিওতে বিনিয়োগ করা হয়েছিল, যা বড় ক্ষতির কারণ হয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, “আমরা আশাবাদী, খুব শিগগিরই রাষ্ট্রায়ত্ত ও বহুজাতিক ভালো কোম্পানি পুঁজিবাজারে আসবে। এতে বাজারের চিত্র পাল্টে যাবে।”
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, নতুন আইপিও বিধিমালা কারসাজি রোধে শক্তিশালী হলেও কিছু ক্ষেত্রে তালিকাভুক্তি প্রক্রিয়া কঠিন হয়েছে। তবে দীর্ঘমেয়াদে এই বিধিমালা পুঁজিবাজারের জন্য ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে বলে তারা আশাবাদী।
পূর্বের পোস্ট :