ঢাকার বেশিরভাগ এলাকায় নেই গ্যাস, স্বল্পচাপে চুলায় যে পরিমাণে গ্যাস আসছে তাতে করে রান্নাসহ অন্যান্য কাজ করা দূরহ বলে জানিয়েছেন রাজধানীবাসী।

ঢাকার বেশিরভাগ এলাকার গ্যাস সরবরাহ তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন পিএলসির অধীনে। প্রায় এক সপ্তাহ ধরে গ্যাস পাইপ লাইনের নানা রকমের সমস্যার কারণে রাজধানীর অধিকাংশ এলাকায় বিরাজ করছে গ্যাসের স্বল্পচাপ।

রাজধানীবাসী বলছেন, তিতাসের পক্ষ থেকে স্বল্পচাপ বলা হলে বাস্তবে গ্যাসের সরবরাহ নেই বললেই চলে। এতে করে দৈনন্দিন কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হচ্ছে তাদের। অনেকে বাড়তি দামে এলপিজি সিলিন্ডার কিনছেন, অনেকে আবার বৈদ্যুতিক চুলা কিনে সারছেন রান্নাবান্নার কাজ।

উত্তরার বাসিন্দা রিয়াদ হোসেন জানিয়েছেন, বৃহস্পতিবার প্রায় পুরোদিন গ্যাস সরবরাহ বন্ধ ছিল উত্তরা ও আশপাশের এলাকায়। শুক্রবার সকাল থেকে গ্যাস আসলেও বিরাজ করছে স্বল্পচাপ, যাতে সাধারণ রান্নাবান্না করা কষ্টসাধ্য।

আব্দুল্লাহপুর এলাকার বাসিন্দা জাহিদুর রহমান জানান, টানা কয়েকদিন ধরে গ্যাস সংকটে ভুগছে তার এলাকার মানুষ। দিনে গ্যাস থাকেনা বললেই চলে।

“যে পরিমাণ গ্যাস আসে তাতে এক পাতিল পানি গরম করতেই প্রায় এক ঘণ্টা সময় লাগে। দৈনন্দিন কাজ চালাতে এলপিজি সিলিন্ডার কিনতে হচ্ছে। অনেকে ছাদে কাঠ এনে রান্না করছেন।”

এ ব্যাপারে তিতাস এক বার্তায় জানিয়েছে, এসব এলাকার সার্ভিস লাইনে সমস্যা থাকায় তা বারবার মেরামত করতে হচ্ছে। এতে করে গ্যাস সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এছাড়া আমিনবাজার এলাকায় তুরাগ নদীর তলদেশে তিতাসের একটি প্রধান পাইপলাইন মালবাহী ট্রলারের নোঙ্গরের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পরে একদফা মেরামত করা হলেও পাইপে পানি ঢুকে যাওয়ায় আবারও মেরামত করতে হয়েছে তিতাসকে। এতে করে উত্তরা, দক্ষিণখান, উত্তরখান, আব্দুল্লাহপুর, টঙ্গী ও গাজীপুর এলাকায় কয়েকদিন ধরেই গ্যাসের স্বল্পচাপ বিরাজ করছে।

এদিকে বাসাবো ও খিলগাঁও এর বাসিন্দারা জানিয়েছেন, তিন দিন ধরে তারা লাইনের গ্যাস পাচ্ছেন না। তিতাস স্বল্পচাপের কথা বললেও বেশিরভাগ বাসায় গ্যাস নেই বলে অভিযোগ তাদের।

বাসাবো মাদারটেকের বাসিন্দা ফরিদা আক্তার বলেন, “ভোররাতে উঠে রান্না করতে হচ্ছে। দিনের বেলা গ্যাস থাকে না। দুপুরের পর সামান্য আসলেও তা দিয়ে রান্না করা সম্ভব না।”

খিলগাঁও’র বাসিন্দা তাবাসসুম শিমু বলেন, “এক সপ্তাহ ধরে গ্যাসের লাইনে সমস্যা চলছে। প্রতিমাসে গ্যাস বিল দিয়েও কেন গ্যাস ছাড়া বসে থাকতে হবে—এ প্রশ্নের উত্তর তিতাসকে দেয়া উচিত।”

একই অভিযোগ ধানমণ্ডি, মোহাম্মদপুর, শ্যামলি ও আদাবর এলাকার বাসিন্দাদের। তারা জানিয়েছেন, প্রায় দুইদিন ধরে গ্যাস পাচ্ছেন না তারা।

মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা তাহসিন জেবা বলেন, “কালকে রাত থেকে একদমই গ্যাস নেই। আজকে দুপুর গড়িয়ে গেলেও গ্যাস আসেনি। দোকানে এলপিজি সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে বাড়তি দামে।”

ধানমন্ডির ঝিগাতলার বাসিন্দা লিপি আক্তার বলেন, “আমরা যারা কর্মজীবী নারী তারা বড় সমস্যায় পড়েছি। অফিসে যাওয়ার আগে দেখি গ্যাস নেই, অফিস থেকে এসেও দেখি গ্যাস নেই। বাইরে থেকে খাবার নিয়ে এসে খেতে হচ্ছে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে।”

এ ব্যাপারে তিতাস জানিয়েছে, মিরপুর রোডে গণভবনের সামনের রাস্তায় গ্যাস সরবারাহের ভাল্ব ফেঁটে এসব এলাকায় গ্যাসের সংকট তৈরি হয়েছে। ইতোমধ্যে নতুন বাল্ব লাগানো হলেও সরবরাহ স্বাভাবিক হতে আরও কয়েকঘণ্টা সময় লাগবে।

তিতাসের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় গ্যাস লাইনে লিকেজ সৃষ্টি হয়েছে। পরপর এমন ঘটনা ঘটায় গ্যাসের সংকট হয়েছে। এছাড়া পাইপলাইনে গ্যাসের চাপ এমনিতেই কম থাকায় বেশকিছু এলাকায় গ্যাস সরবরাহ এক রকমের বন্ধ।

টানা এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে গ্যাস না থাকা, চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস না দিয়ে ভোক্তাদের থেকে প্রতি মাসে একই পরিমাণ বিল আদায় করাকে হঠকারীতা বলে উল্লেখ করেছে ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)।

ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা শামসুল আলম বলেন, “গ্যাস না দিয়ে প্রতিমাসে বিল নিয়ে যাওয়া রীতিমতো নাগরিকদের থেকে টাকা চুরি করার শামিল। একটি সভ্য দেশে এমনটা হতেই পারে না। তিতাস প্রতিবছর ভোক্তাদের থেকে বাড়তি ২০০০ কোটি টাকা আয় করে। অথচ ভোক্তাসেবা দেয়ার বেলায় তাদের মান নিম্নমানের।”

জ্বালানি বিভাগকে দুষে শামসুল বলেন, তিতাসের এই অক্ষমতার দায় জ্বালানি বিভাগের ওপরে বর্তায়।২০১৫ সালে তিতাসের প্রিপেইড মিটার বসানোর কথা থাকলেও এখনো এর সুরহা হয়নি। মিটার থাকলে ভোক্তা যে পরিমাণ গ্যাস ব্যবহার করতো সেই বিলই দিতে হতো। লিকেজ হলে সহজে ধরা পড়তো।

“কেন দশ বছর পেরিয়ে গেলেও তিতাস প্রিপেইড মিটার বসাতে পারেনি এর জবাব বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনকে (বিইআরসি) দিতে হবে। কমিশন ও জ্বালানি বিভাগ গ্যাস সংকটের ভোক্তাদের ভোগান্তির এ দায় এড়াতে পারে না। শুধু দায় স্বীকার না ক্ষতিপূরণ দেয়া উচিত তাদের,” বলেন তিনি।