এবার ঈদে যাত্রীদের থেকে কোথাও বাড়তি ভাড়া নেয়া হয়নি এবং কোনো কোনো বাসে যাত্রীদের থেকে বরং নির্ধারিত ভাড়ার কম নেয়া হয়েছে—সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম এমন দাবি করলেও যাত্রীরা বলছেন ভিন্ন কথা, প্রমাণ মেলে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশনের (বিআরটিসি) বাসেই বাড়তি ভাড়া নেয়ার।
মঙ্গলবার, বুধবার ও বৃহস্পতিবার রাজধানীর সায়দাবাদ, গুলিস্তান, গাবতলী ও মহাখালী বাস টার্মিনাল ঘুরে প্রমাণ পাওয়া যায় বাড়তি ভাড়া নেয়ার। সবচেয়ে অবাক করা বিষয় প্রাইভেট কোম্পানির বাসে বাড়তি ভাড়া নেয়ার পাশাপাশি সরকারের বিআরটিসি বাসে যাতায়াত করতেও যাত্রীদের গুণতে হয়েছে বাড়তি ভাড়া।
বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় গুলিস্তান বিআরটিসি কাউন্টার থেকে বরিশাল যাওয়ার জন্য টিকিট কেনেন ফয়সাল হোসেন। অন্যান্য সময়ে প্রতি টিকেটের দাম ৬০০ টাকা রাখা হলেও তার থেকে নেওয়া হয় ১০০০ টাকা। দুপুরের পর থেকে যারাই বিআরটিসি বাসে করে ঢাকা থেকে বরিশাল ফিরেছেন তাদের গুণতে হয়েছে বাড়তি ভাড়া।
কেন বিআরটিসি বাসে বাড়তি ভাড়া নেয়া হচ্ছে এমন প্রশ্নের জবাবে বরিশাল বিআরটিসির ডিপো ম্যানেজার জুলফিকার আলী বলেন, “ঈদের জন্য নতুন দুটি স্পেশাল গাড়ি নামানো হয়েছে। এই গাড়ির সিট সংখ্যা কম হওয়ায় ভাড়া ৬০০ এর থেকে একটু বেশি তবে সেটি ১০০০ টাকা নেয়া যৌক্তিক না।”
টিকেট কাউন্টারে ড্রাইভার-হেলপার ও অন্যান্যরা মিলে ঈদের আগমুহূর্তে সিন্ডিকেট করে ভাড়া বাড়ানোর পায়তারা করছে বলে দাবি করেন জুলফিকার।
দূরপাল্লার বিভিন্ন বিআরটিসি বাস ঘুরে দেখা যায়, সিটের বাইরেও বাসের সামনে অতিরিক্ত যাত্রী বসিয়ে এবং কোনো কোনো বাসে টুল বসিয়েও যাত্রী নেয়া হচ্ছে। বিষয়টি স্বীকার করে জুলফিকার বলেন, “ড্রাইভার-হেলপাররা মিলে এ কাজ করছে। ঈদের আগে বাড়তি আয়ের আশায় তারা এমনটা করছে।”
এ প্রসঙ্গে বিআরটিসির চেয়ারম্যান আব্দুল লতিফ মোল্লা বলেন, “এমনটা হওয়ার কথা ছিল না। অবশ্যই বাড়তি ভাড়া নিয়ে অন্যায় করা হচ্ছে যাত্রীদের সঙ্গে। আমি তাদের বাড়তি ভাড়া ফেরত দেয়ার নির্দেশ দিয়েছি।”
বিআরটিসি চেয়ারম্যানের নির্দেশনায় বাড়তি ভাড়া কয়েকটি বাসে ফেরত দেয়া হলেও বাড়তি যাত্রী পরিবহন নিয়েও হয়নি কোনো সমাধান।
এসবের মধ্যেই ঢাকার বিভিন্ন বাস টার্মিনাল পরিদর্শন করে সড়ক মন্ত্রী জানিয়েছেন, ঈদে ন্যায্য ভাড়া কার্যকর হয়েছে। কোথাও কোথাও নির্ধারিত ভাড়ার কম নেয়া হচ্ছে। মন্ত্রীর এমন মন্তব্যকে হাস্যকর এবং বিগত আমলের মন্ত্রীদের মতোই ফাঁকা বুলি বলে জানিয়েছে যাত্রীরা।
যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক বলেন, “সড়ক মন্ত্রী মাফিয়া বাস মালিকদের নিয়ে টার্মিনালে টার্মিনালে ঘুরছেন। বাস মালিকরা মন্ত্রীকে যা শিখিয়ে দিচ্ছেন তিনি মিডিয়ার সামনে তাই বলছেন। এবারের ঈদে দ্বিগুণ, তিনগুণ করে ভাড়া নেয়া হচ্ছে আর মন্ত্রী বলছেন নির্ধারিত ভাড়ার চেয়েও বাস ভাড়া কম। এটা ফাঁকা বুলি ছাড়া আর কিছুই না।”
মন্ত্রীর সঙ্গে যাত্রী প্রতিনিধিদের কোনো সম্পর্ক নেই উল্লেখ করে মোজাম্মেল জানান, যত বাস টার্মিনাল মন্ত্রী পরিদর্শন করেছেন তার সঙ্গে যাত্রীদের হয়ে কোনো প্রতিনিধি ছিল না। “বাস মালিকদের সুবিধা দিতে আগামীতে যাত্রী কল্যাণ সমিতি বিলুপ্ত করা হতে পারে বলে আমরা শঙ্কা করছি।”
ঈদযাত্রা নিয়ে যাত্রী কল্যাণ সমিতির এক প্রতিবেদনে বলে হয়েছে, ঢাকা থেকে বাসে করে যে অঞ্চলেই যাওয়া হোক না কেন গুণতে হচ্ছে বাড়তি ভাড়া। এতে করে এবারের ঈদে যাত্রীদের ১৪৮ কোটি টাকা বাড়তি ভাড়া গুণতে হবে যা গত দুই দশকের রেকর্ড ছাড়িয়ে যাবে।
তবে যাত্রী কল্যাণের বাড়তি ভাড়া নিয়ে করা প্রতিবেদন সঠিক নয় বলে দাবি করেছেন সড়ক পরিবহন প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ হাবিব।
হাবিব বলেন, “যাত্রীদের কারও থেকে বেশি ভাড়া নেয়া হচ্ছে এমন কোনো অভিযোগ পাওয়া যায়নি। অভিযোগ পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেয়া হবে।”
তবে যাত্রীদের অভিযোগ, মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীরা গণমাধ্যমে যেসব বক্তব্য দিচ্ছেন তা মোটেই যাত্রীবান্ধব না। ঢাকা থেকে পটুয়াখালীর একটি প্রাইভেট কোম্পানির বাসের টিকেট কেটেছেন মেহেদী হাসান সবুজ। তিনি বলেন, “আগে পটুয়াখালীর আগে বাস রাজাখালী বা লেবুখালী নেমে গেলে কম ভাড়া দিতে হতো। এবার মন্ত্রী রবিউল নিজেই বলেছেন গন্তব্য যেখানেই হোক ফুল ভাড়া দিতে হবে। একে বাড়তি ভাড়া, এরপরে মন্ত্রীর এ ধরণের কথা জনমনে বিরক্তির সৃষ্টি করছে।”
আরেক বাসযাত্রী মারদিয়া মারিয়া বলেন, “মনিটরিং বলে কিছুই নেই। মন্ত্রীরা সরকারি লোকজন নিয়ে যা করছেন তা শোডাউন ছাড়া কিছুই না। এতে করে শৃঙ্খলা তো আসছেই না, হীতে বিপরীত হচ্ছে।”
সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে সবার আগে সমস্যা স্বীকার করে সমাধান এবং তদনুযায়ী কাজ করার আহ্বান জানান সাধারণ যাত্রীরা। মনিটরিং এর নামে শোডাউন এবং পুরোনো ধাচের কথাবার্তা থেকে বিরত থেকে কার্যকরী পদক্ষেপ নেয়ার আহ্বান জানান তারা।
পূর্বের পোস্ট :