হঠাৎ করেই বাংলাদেশে দেখা দিয়েছে হাম রোগের প্রাদুর্ভাব যেখানে বেশিরভাগ আক্রান্ত হচ্ছেন শিশুরা, রোগের প্রকোপ বাড়ায় ভিড় বাড়ছে হাসপাতালে, ঘটছে শিশুমৃত্যুর মতো ঘটনা।
ঢাকার মহাখালী সংক্রামক ব্যধি হাসপাতাল; একসময় করোনা রোগীরা এই হাসপাতালে চিকিৎসা নিলেও বর্তমানে হাসপাতালে ভর্তি আছেন হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হওয়া শিশুরা। শুধু মার্চ মাসেই হামে আক্রান্ত হয়ে এই হাসাপাতালে বিশ জনের ওপরে শিশু মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে।
হাসপাতালের চিকিৎসক শ্রিবাস পাল জানান, হামের উপসর্গ নিয়ে প্রতিদিন কোনো না কোনো শিশু হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন। বর্তমানে শতাধিক শিশু এই উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। মার্চ মাসে হামে আক্রান্ত হয়ে এই এক হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৫০০ বেশি শিশু।
ঢাকার বাইরে রাজশাহী বিভাগে দিনকে দিন বাড়ছে হামের প্রকোপ। মার্চ মাসে সংক্রামক এই রোগে রাজশাহী, চাপাইনবাবগঞ্জ ও পাবনা জেলার হাম আক্রান্ত হয়ে প্রায় ৫০ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। প্রতিদিন রাজশাহী মেডিকেলে নতুন করে ৫০ জন শিশু ভর্তি হচ্ছেন হামের উপসর্গ নিয়ে।
রাজশাহীর বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক হাবিবুর রহমান জানান, হামের প্রকোপ বাড়ায় বিভাগের সব হাসপাতালে পৃথক আইসোলেশন সেন্টার স্থাপন করা হচ্ছে। মার্চ মাসে এসে হামের প্রকোপ তীব্র আকার ধারণ করেছে। যেসব শিশু হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে আসছে তাদের নমুনা পরীক্ষা করে দেখা গেছে প্রায় ৩১ শতাংশ শিশু হাম আক্রান্ত।
খোঁজ নিয়ে জানা যায় রাজশাহী মেডিকেল হাসপাতালে হাম আক্রান্ত হয়ে মার্চ মাসে ২৯ জন শিশু মারা গেছে। শুরুতে সীমিত আকারে আইসোলেশন কর্ণার তৈরি করে শিশুদের চিকিৎসা দিলেও রোগীর সংখ্যা বাড়ায় বড় আকারে প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে বলে জানান হাসপাতালের শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ শাহীদা ইয়াসমিন।
এছাড়াও খুলনা, সিলেট বিভাগসহ দেশের বিশের বেশি জেলায় হামের প্রকোপ দিনকে দিন বাড়ছে। এতে করে শিশুদের অভিভাবকদের মধ্যে দেখা দিয়েছে আতঙ্ক। প্রায় হারিয়ে যেতে বসা এই রোগ আবার কেন প্রকট আকার ধারণ করলো সেটিই তাদের প্রশ্ন।
জুনাইরা রহমান, বয়স ৩, ঢাকার মুগদার বাসিন্দা। ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহে তীব্র জ্বর ও কাশি শুরু হয়। জুনাইরার বাবা ওয়াসিম রহমান ভেবেছিলেন এটি সাধারণ কোনো সংক্রামক রোগ। কিন্তু দিন কয়েক বাদে জুনাইরার পুরো শরীর জুড়ে লাল রঙের র্যাশ দেখা যায়, সঙ্গে শ্বাসকষ্ট।
ওয়াসিম বলেন, “আমরা ঘুণাক্ষরেও কল্পনা করতে পারিনি জুনাইরার হাম হয়েছে। জ্বরের ওষুধ খাওয়ানোর পরেও অবস্থা দিন দিন খারাপ হতে থাকে। পরে হাসপাতালে নিয়ে গেলে ডাক্তার পরীক্ষা নীরিক্ষা করে জানায় ওর হাম হয়েছে। ডাক্তার নিজেও অবাক হয়েছিলেন হঠাৎ করে হাম কেন হলো ওর।”
জুনাইরা প্রায় দেড় সপ্তাহ চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে ঘরে ফিরলেও অনেক শিশুই ফিরতে পারেনি ঘরে, বরণ করতে হয়েছে অকাল মৃত্যু। অনেকের আবার হাম থেকে নিউমোনিয়া ও ডাইরিয়ার মতো মারাত্মক অবস্থা তৈরি হওয়ায় চিকিৎসা দেয়া হয়ে উঠেছে সংকটসংকুল।
শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ রাওয়াতুন নবী বলেন, “রুবেলা ভাইরাসের কারণে হাম রোগ হয়। হাম রোগে শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ে। রুবেলা শ্বাসনালীতে সংক্রমিত হওয়ায় হাম থেকে নিউমোনিয়া হতে পারে। অনেক সময় শিশুদের ডাইরিয়া পর্যন্ত হয়। শিশুর শরীরে ভিটামিন-এ এর ঘাটতি আরও প্রকোপ হয়। এতে করে শিশু ধীরে ধীরে নিস্তেজ হয়ে পড়ে।”
চিকিৎসকরা জানান, অনেক সময় বাবা-মা রোগ বুঝতে না পেরে শিশুকে হাসপাতালে আনতে দেরি করে ফেলেন। অনেক শিশুর হাম থেকে নিউমোনিয়া হওয়ার পরে হাসপাতালে আনা হয়। তখন চিকিৎসা দিয়ে শিশুকে সারিয়ে তোলা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।
এর বাইরে হাম হলে শিশুদের ভিটামিন-এ অভাবে চোখের মণি ঘোলা হতে শুরু করে। অনেক সময় শিশুর দৃষ্টিশক্তি ঝাপসা হয়ে আসে। শিশু বেঁচে গেলেও সঠিক চিকিৎসা না হলে দৃষ্টিশক্তিতে বড় সমস্যা দেখা দিতে পারে বলে শঙ্কা চিকিৎসকদের।
বিগত কয়েক দশকে হামের প্রকোপ দেখা না দিলেও হঠাৎ করে হাম সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ছে। ইউনিসেফের বাংলাদেশ শাখার তথ্য বলছে, ২০১৯-২০২০ সালে করোনা মহামারির কারণে হামের টিকাদান কর্মসূচি বাধাপ্রাপ্ত হলেও ২০২০ সালের জুন মাস থেকে সরকারি উদ্যোগে হামের টিকা দেয়া শুরু হয়, যা ২০২১ সালের জানুয়ারি মাস পর্যন্ত চলেছিল। এরপর ২০২৪ সাল পর্যন্ত রুটিন টিকাদান কর্মসূচি অব্যাহত ছিল।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, প্রতিবছর ৮০ শতাংশের ওপরে শিশু হামের টিকার আওতায় এসেছে। তবে যেসব শিশু হামের টিকা নেয়নি এবং যারা দুই ডোজের জায়গায় এক ডোজ টিকা নিয়ে আর নেয়নি এবং যারা দুই ডোজ টিকা নেয়ার পরেও শরীরে যথেষ্ট পরিমাণে এন্টিবডি তৈরি হয়নি তারা এখন এসে হামে আক্রান্ত হচ্ছেন।
যদিও স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন জানিয়েছেন, গত আট বছরে হামের টিকাদান কর্মসূচির বড় কোনো ক্যাম্পেইন দেশে হয়নি। এজন্যই নতুন করে হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে।
সোমবার স্বাস্থ্যমন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেন, “হামের সংকট মোকাবেলায় সরকার টিকা ক্রয়ে ৬০৪ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে। ইউনিসেফ থেকে টিকা সংগ্রহ করে আগামী এপ্রিলের মধ্যে হাসপাতালগুলোতে টিকা সরবরাহ করা হবে।”
এছাড়া হাম প্রতিরোধে জরুরি ভিত্তিতে হাসপাতালগুলোতে আইসিইউ চালু, ভেন্টিলটের সরবরাহ ও বিশেষায়িত ওয়ার্ড স্থাপনের কাজ দ্রুতগতিতে চলছে বলে জানান মন্ত্রী।
মন্ত্রী বলেন, “জরুরি ভিত্তিতে সকল পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার। মাঠ পর্যায়ে টিকা সরবরাহে কিছুটা ঘাটতি থাকলেও আদতে দেশে টিকার সংকট নেই। জুন মাসে টিকা ক্যাম্পেইন করে ২ কোটি শিশুকে টিকার আওতায় আনা হবে। পাশপাশি চলবে রুটিন টিকাদান কর্মসূচি। অভিভাবকদের বলবো, আপনারা আতঙ্কিত না হয়ে সতর্ক থাকবেন। কোনোভাবেই যাতে শিশুরা টিকার বাইরে না থাকে সেটি খেয়াল রাখবেন।”
স্বাস্থ্য সচিব কামরুজ্জামান চৌধুরী জানিয়েছে, মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে টিকা কেনার টাকা ইউনিসেফকে দিয়েছে। আপাতত টিকা ক্রয়ের ক্রয়সংক্রান্ত অনুমোদনের জন্য অপেক্ষা করা হচ্ছে। অনুমোদন মেলা মাত্র এপ্রিলের মধ্যে দ্রুত সময়ে হামের টিকা দেশে আনা হবে।
সাধারণত শিশুর বয়স নয় মাস হলে হামের টিকার প্রথম ডোজ দেয়া হয় এবং ১৫ মাস বয়সে দেয়া হয় দ্বিতীয় ডোজ। টিকা ক্যাম্পেইনের সময় ৯ মাস থেকে ১০ বছরের সব শিশুকে টিকা দেয়া হয়। দেশে হামের প্রাদুর্ভাব কমাতে শিশুদের টিকাদানের বয়সসীমা আরও কমিয়ে আনার চিন্তাভাবনা করছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়।
পূর্বের পোস্ট :