ইরান যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানি তেলের দাম, বিশেষ করে ডিজেলের দাম লিটারে ১৫ টাকা বাড়ানোর পর পণ্যমূল্য, ব্যবসা-বাণিজ্য ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় এর প্রভাব কতটা পড়বে—তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে পণ্য ও সেবার দাম যাতে হঠাৎ বেড়ে না যায়, সে জন্য সরকারের কঠোর নজরদারির তাগিদ দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
ব্যবসায়ী ও জ্বালানি খাতের বিশ্লেষকদের মতে, তেলের দাম বাড়ায় উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয় বাড়বে। এর প্রভাব পড়বে গণপরিবহনেও। সব মিলিয়ে মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বাড়তে পারে, যা ইতোমধ্যে অর্থনীতিকে চাপে রেখেছে এবং সীমিত আয়ের মানুষকে ভোগাচ্ছে।
বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, ডিজেলের দাম বাড়লে পরিবহন ব্যয় বাড়বে, যা সরাসরি পণ্যমূল্য বাড়াবে। তবে অন্যদের মতে, যুদ্ধের আগেই নানা কারণে অনেক পণ্যের দাম বেড়ে গেছে, তাই নতুন করে দাম বাড়ানোর যৌক্তিকতা সব ক্ষেত্রে নেই।
আরেক অংশের মতে, বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে সরকার ‘নিরুপায়’ হয়ে দাম বাড়িয়েছে। তবে এই সুযোগে যেন অযৌক্তিকভাবে পণ্য ও সেবার দাম না বাড়ে, সে জন্য কঠোর তদারকি জরুরি।
ভোক্তাদের সংগঠন কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) মনে করছে, সংকটের মধ্যে তেলের দাম বাড়ানো মজুতদারদের উৎসাহিত করবে এবং একবারে বড় পরিমাণে দাম বাড়ানো সিদ্ধান্তটি ‘আত্মঘাতী’।
অন্যদিকে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলও এ সিদ্ধান্তে উদ্বেগ জানিয়ে দ্রুত পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছে। কেউ কেউ জ্বালানির বিকল্প উৎস খোঁজার পরামর্শ দিয়েছেন।
সাধারণ মানুষের উদ্বেগ
রাজধানীর মিরপুরে নিরাপত্তাকর্মী আব্দুল জলিল বলেন, ১২ হাজার টাকা বেতনে সংসার চালানোই কঠিন, তার ওপর তেলের দাম বাড়লে সবকিছুর দাম বাড়বে—এতে সংসার চালানো আরও কঠিন হয়ে পড়বে।
ফল ব্যবসায়ী মনির হোসেনও আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, বিক্রি কমে গেলে সংসার চালানোই দায় হয়ে যাবে।
সরকারের অবস্থান
জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বৃদ্ধির কারণে আমদানি ব্যয় বেড়েছে, তাই মূল্য সমন্বয় করা হয়েছে। সরকার বলছে, সরবরাহ স্থিতিশীল রাখতে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
অর্থমন্ত্রীও জানিয়েছেন, তেলের দাম একা মূল্যস্ফীতি বাড়ায় না; অন্যান্য খাতও এতে জড়িত।
মূল্যস্ফীতিতে প্রভাব
জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, ডিজেলের দাম বাড়লে তা সরাসরি মূল্যস্ফীতিতে প্রভাব ফেলে। কারণ কৃষি, পরিবহন, শিল্প—সব ক্ষেত্রেই এর ব্যবহার রয়েছে।
তবে অর্থনীতিবিদদের কেউ কেউ মনে করেন, আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়ার প্রভাব আগেই পড়ে গেছে, তাই নতুন মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব তুলনামূলক কমও হতে পারে।
ব্যবসায়-বাণিজ্যে প্রভাব
রপ্তানি খাতসহ বিভিন্ন শিল্পে উৎপাদন ব্যয় বাড়বে বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীরা। কোল্ড স্টোরেজ, পরিবহন, কৃষি—সব ক্ষেত্রেই জ্বালানির ওপর নির্ভরতা থাকায় খরচ বাড়বে।
পাইকারি ব্যবসায়ীরা বলছেন, চালসহ অনেক পণ্যের উৎপাদন ডিজেলনির্ভর হওয়ায় দাম বাড়া অবশ্যম্ভাবী। খুচরা বিক্রেতারাও পরিবহন খরচ বাড়ার কারণে পণ্যমূল্য বাড়ানোর ইঙ্গিত দিয়েছেন।
করণীয় কী
নীতিনির্ধারক ও গবেষকদের মতে, এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো—কঠোর মনিটরিং। যাতে জ্বালানির দাম বৃদ্ধির তুলনায় অতিরিক্ত হারে পণ্য ও সেবার দাম না বাড়ে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি সরকার কার্যকরভাবে বাজার তদারকি না করে, তাহলে মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বেড়ে সাধারণ মানুষের ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।
পূর্বের পোস্ট :