দেশব্যাপী বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের কারণে মোবাইল সেবা নিরবচ্ছিন্ন রাখতে হিমশিম খাওয়ার কথা জানিয়েছে অপারেটরগুলো।

দেশের মোবাইল অপারেটরগুলোর সংগঠন বাংলাদেশ মোবাইল টেলিযোগাযোগ অপারেটরদের সংগঠন (অ্যামটব) এক চিঠিতে নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে জানিয়েছে, বিদ্যুৎ ও জ্বালানির জন্য জরুরি ভিত্তিতে অগ্রাধিকারমূলক ব্যবস্থা না নিলে দেশব্যাপী মোবাইল টেলিকম সেবা বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

শনিবার বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) চেয়ারম্যান বরাবর লেখা ওই চিঠিতে দেশের তিনটি বেসরকারি মোবাইল অপারেটর—গ্রামীণফোন, রবি ও বাংলালিংক—এর টাওয়ার (বেস ট্রান্সসিভার স্টেশন) ও ডেটা সেন্টার চালু রাখতে প্রতিদিন ৭৯ হাজার ৬২১ লিটার ডিজেল এবং ১৯ হাজার ৮৫৯ লিটার অকটেন প্রয়োজন বলে জানানো হয়।

চিঠিতে বলা হয়েছে, দেশের বিভিন্ন স্থানে জ্বালানি পরিবহনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বাধার মুখে পড়তে হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে মোবাইল সেবা সচল রাখতে জরুরি ভিত্তিতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আর্জি জানিয়েছে সংগঠনটি।

অ্যামটবের মহাসচিব মোহাম্মদ জুলফিকারের স্বাক্ষরিত চিঠিতে দেশের বিভিন্ন স্থানে তিনটি অপারেটরের ২৭টি ডেটা সেন্টারের তালিকাও দেওয়া হয়েছে। সেখানে প্রতিটি কেন্দ্রে বিদ্যুতের চাহিদা এবং বিদ্যুৎ না থাকলে জেনারেটর চালাতে প্রতি ঘণ্টায় ডিজেলের সম্ভাব্য ব্যবহার তুলে ধরা হয়েছে।

তালিকা অনুযায়ী, রবির ১০টি ডেটা সেন্টার চালাতে প্রতি ঘণ্টায় ১ হাজার ৬২২ লিটার ডিজেল লাগে। গ্রামীণফোনের আটটি ডেটা সেন্টারে লাগে ১ হাজার ৮৬৪ লিটার এবং বাংলালিংকের আটটি ডেটা সেন্টারে লাগে ৯৮৫ লিটার। অর্থাৎ, বিদ্যুৎ না থাকলে শুধু ডেটা সেন্টারগুলো চালাতে প্রতি ঘণ্টায় মোট ৪ হাজার ৪৭১ লিটার ডিজেল প্রয়োজন।

চিঠিতে আরও বলা হয়, বিদ্যুৎ সরবরাহে মারাত্মক বিঘ্ন এবং তীব্র জ্বালানি সংকটের কারণে অপারেটরদের সেবা সংকট দ্রুত তীব্র হচ্ছে। অবিলম্বে সরকারি হস্তক্ষেপ ছাড়া টেলিকম সেবা চালু রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে।

সাম্প্রতিক ঝড়বৃষ্টির কারণে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বারবার ও দীর্ঘ সময়ের জন্য বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নতা দেখা দিচ্ছে, ফলে ডিজেলচালিত জেনারেটরের ওপর নির্ভরতা বেড়েছে।

বিদ্যুৎ না থাকায় মোবাইল টাওয়ার চালাতে তিন অপারেটরের প্রতিদিন ৫২ হাজার ৪২৫ লিটার ডিজেল ও ১৯ হাজার ৮৫৯ লিটার অকটেন লাগে। আর ডেটা সেন্টার চালাতে প্রয়োজন হয় ২৭ হাজার ১৯৬ লিটার ডিজেল।

চিঠিতে বলা হয়, অনেক এলাকায় প্রতিদিন ৫ থেকে ৮ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকে না এবং পুনঃস্থাপনেও বিলম্ব হয়। ফলে ডেটা সেন্টার, সুইচিং সুবিধা ও ট্রান্সমিশন হাবসহ গুরুত্বপূর্ণ টেলিযোগাযোগ অবকাঠামো প্রায়ই গ্রিড বিদ্যুৎ ছাড়া পরিচালিত হচ্ছে, যা নেটওয়ার্ক স্থিতিশীলতার জন্য বড় ঝুঁকি।

দীর্ঘ বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে পুরোপুরি ডিজেলচালিত জেনারেটরের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে বলেও উল্লেখ করা হয়। একটি ডেটা সেন্টার প্রতি ঘণ্টায় প্রায় ৫০০ থেকে ৬০০ লিটার ডিজেল ব্যবহার করে, যা দিনে প্রায় ৪ হাজার লিটার পর্যন্ত পৌঁছায়। স্থানীয় পেট্রোল পাম্পগুলো এ পরিমাণ জ্বালানি সরবরাহ করতে পারছে না।

এছাড়া আন্তঃজেলা জ্বালানি পরিবহনের সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বাধায় পরিস্থিতি আরও জটিল হচ্ছে।

অপারেটরদের প্রস্তাব

পরিস্থিতি মোকাবিলায় কয়েকটি প্রস্তাব দিয়েছে অপারেটররা—

১. বিদ্যুৎ বিভাগ, জ্বালানি বিভাগ, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও মোবাইল অপারেটরদের নিয়ে জরুরি উচ্চপর্যায়ের সমন্বয় সভা করা।


২. প্রধান ডেটা সেন্টার ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা।


৩. সংকটকালে মোবাইল বেস স্টেশনগুলোকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিদ্যুৎ সরবরাহের আওতায় আনা।


৪. প্রয়োজনে ডিপো থেকে সরাসরি জরুরি ভিত্তিতে জ্বালানি সরবরাহের ব্যবস্থা করা।


৫. জরুরি টেলিযোগাযোগ কার্যক্রমে জ্বালানি পরিবহন নির্বিঘ্ন রাখতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে লিখিত নির্দেশনা দেওয়া।

এ বিষয়ে গ্রামীণফোনের চিফ করপোরেট অ্যাফেয়ার্স কর্মকর্তা তানভীর মোহাম্মদ বলেন, চলমান বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের কারণে মোবাইল নেটওয়ার্ক অপারেটররা বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রাপ্তির ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।

তিনি বলেন, “সরকারের সহযোগিতার জন্য আমরা কৃতজ্ঞ; তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে দেশব্যাপী নিরবচ্ছিন্ন টেলিযোগাযোগ সেবা বজায় রাখতে সময়োপযোগী ও সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ জরুরি।”

তিনি আরও জানান, ডেটা সেন্টার, সুইচিং সুবিধা ও বেস স্টেশনগুলোতে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা, জ্বালানি সরবরাহ সহজ করা এবং জরুরি জ্বালানি পরিবহনে সহায়তা দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে অপারেটররা।