বাংলাদেশে আওয়ামী লীগকে রাজনীতিতে সক্রিয় হতে হলে প্রথমে জুলাই অভ্যুত্থানে সংঘটিত গণহত্যার চলমান বিচার প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হবে এবং অনুশোচনা প্রকাশ করতে হবে—এমন মন্তব্য করেছেন প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী অধ্যাপক আলী রিয়াজ।
বৃহস্পতিবার ঢাকার মহাখালীতে ব্র্যাক সেন্টারে ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (বিআইজিডি) আয়োজিত “Rapture, Reform and Reimagining Democracy: Navigating the Agony of Transition” শীর্ষক এক সেমিনারে তিনি এসব কথা বলেন।
আলী রিয়াজ বলেন, “শেখ হাসিনা এখনো মনে করেন, জুলাই অভ্যুত্থান ছিল পশ্চিমা সমর্থনে এবং অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের সুপরিকল্পিত নকশায় সংঘটিত একটি তথাকথিত ইসলামী জঙ্গি আন্দোলন। আওয়ামী লীগ এখনো কোনো অনুশোচনা প্রকাশ করেনি, জুলাইকে স্বীকৃতিও দেয়নি। এই ধরনের ধ্যানধারণা নিয়ে তাদের রাজনীতিতে প্রাসঙ্গিক হওয়ার কোনো সুযোগ নেই।”
আওয়ামী লীগের সমর্থকসংখ্যা নিয়ে প্রচলিত ধারণাকে ‘ভুল ও অবান্তর’ উল্লেখ করে তিনি বলেন, “অনেকে দাবি করেন দেশে ৪০ শতাংশ মানুষ আওয়ামী লীগের সমর্থক। এই হিসাবের ভিত্তি কী? যদি ২০২৪ সালের পাতানো নির্বাচনে ঘোষিত ৪২ শতাংশ ভোটের হিসাব ধরে এই কথা বলা হয়, তাহলে বলার কিছু নেই। আবার কেউ কেউ বলেন ২০ শতাংশ সমর্থক—এই হিসাবেরও কোনো যুক্তি তারা দিতে পারেননি।”
দেশে বড় একটি জনগোষ্ঠীকে সংস্কার প্রক্রিয়ার বাইরে রাখা হয়েছে—এমন বক্তব্যকে ‘খোঁড়া যুক্তি’ আখ্যা দিয়ে আলী রিয়াজ বলেন, “সংস্কার প্রশ্নে আমাদের ওয়েবসাইটে ৫৬ হাজার মানুষ মতামত দিয়েছেন। আমরা ৪৬ হাজার বাড়িতে গিয়ে সংস্কার নিয়ে জরিপ করেছি। এরা সবাই সাধারণ মানুষ। কে আওয়ামী লীগ, কে বিএনপি—এই বিবেচনায় কোনো কাজ করা হয়নি।”
ঐকমত্য কমিশনে আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতি আলোচনাকে কম গণতান্ত্রিক করেছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “আমাকে কি কেউ শেখ হাসিনার ঠিকানা দিতে পারবেন, যেখানে আমি তাকে কমিশনের আলোচনায় অংশ নেওয়ার আমন্ত্রণ জানিয়ে চিঠি পাঠাতে পারতাম? যারা বাকি ছিলেন, তারা কেউ পাচারের টাকা নিয়ে পালিয়েছেন, কেউ আত্মগোপনে, আর কেউ কারাগারে। এই অবস্থায় আওয়ামী লীগকে নিয়ে আলোচনায় বসার সুযোগ কোথায়?”
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সীমাবদ্ধতার কথা তুলে ধরে আলী রিয়াজ বলেন, আগের তুলনায় দেশের আমলাতন্ত্র আরও শক্তিশালী হয়েছে, কিন্তু সরকার এখানে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি। “আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে আমলাতন্ত্রের ওপর যে ধরনের নিয়ন্ত্রণ ছিল, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সেই নিয়ন্ত্রণ নেই। এই সুযোগটাই আমলারা নিয়েছেন।”
সংস্কার কমিশনের বহু সুপারিশ বাস্তবায়ন না হওয়ার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “দুই ধরনের সমস্যা ছিল। কোথাও সরকারের প্রয়োজনীয় ইচ্ছাশক্তির ঘাটতি ছিল, আবার কোথাও প্রয়োজনীয় ক্ষমতাই সরকারের হাতে ছিল না। সব মিলিয়ে অনেক সংস্কার আলোর মুখ দেখেনি।”
সিভিল সোসাইটির ভূমিকা নিয়েও কঠোর সমালোচনা করেন আলী রিয়াজ। তিনি বলেন, “অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পাশে দাঁড়িয়ে কাজ করতে সিভিল সোসাইটি পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে। তারা সবাই কোনো না কোনো রাজনৈতিক দলে ভিড়েছে, সরকারের পাশে এক মুহূর্তের জন্যও দাঁড়ায়নি। আমি ভবিষ্যদ্বাণী করতে পারি—আগামী সরকারের সময়েও সিভিল সোসাইটি দেশের সংস্কার প্রক্রিয়ায় কার্যকর ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হবে।”
জুলাই আন্দোলনকে ‘বিপ্লব’ নয়, বরং ‘অভ্যুত্থান’ হিসেবে উল্লেখ করে আলী রিয়াজ বলেন, এই অভ্যুত্থান রাষ্ট্রকে কাঙ্ক্ষিত সংস্কারের পথে যথেষ্টভাবে নাড়াতে না পারলেও এখনো গণভোটের মাধ্যমে অনেক পরিবর্তন আনার সুযোগ রয়েছে।
পূর্বের পোস্ট :