ঢাকায় রমজান শুরুর আগেই অস্থিরতা দেখা দিয়েছে কাঁচাবাজারে; দুই দিনের ব্যবধানে দাম বেড়েছে মুরগি, ছোলা ও ফলের বাজারে।

বুধবার সরেজমিনে রাজধানীর বিভিন্ন পাইকারি ও খুচরা কাঁচাবাজার ঘুরে দেখা যায়, পাইকারিতে কারওয়ান বাজারে ভালো মানের ছোলা বিক্রি হচ্ছে ৯০-১০০ টাকা। শান্তিনগর, রামপুরা ও বাড্ডার মতো খুচরা বাজারে এই একই ছোলার দাম উঠেছে ১১০-১১৫ টাকা যেখানে এক সপ্তাহ আগে ঢাকার খুচরা বাজারে ছোলা বিক্রি হতো ৮০-৮৫ টাকায়।

অন্যদিকে ৫০ টাকা কেজিতে বিক্রি হওয়া অ্যাংকর ডাল রমজানের আগে বিক্রি হচ্ছে ৮০ টাকায়।  পেঁয়াজু তৈরিতে ব্যবহৃত বড় দানার মসুর ডাল ৯০-১০০ টাকায় বিক্রি হলেও এখন দাম বেড়ে হয়েছে ১২০ টাকা।

ছোলা বিক্রেতারা বলছেন, বাজারে সরবরাহ যথেষ্ট থাকলেও হঠাৎ করে চাহিদা বাড়ায় বেড়ে গেছে ছোলার দাম।

অন্যদিকে এক সপ্তাহের ব্যবধানে আকাশচুম্বী মুরগির বাজার; প্রতিকেজি ব্রয়লার মুরগি বিক্রি হচ্ছে ২০০-২২০g টাকায়, যা দুই দিন আগে ছিল ১৯০-২০০ টাকা এবং এক সপ্তাহ আগেও ব্রয়লার মুরগির দাম ছিল ১৬০-১৭০ টাকা। একদিনের ব্যবধানে ব্রয়লার মুরগির দাম বেড়েছে কেজিতে ২০-৩০ টাকা।

দাম বেড়েছে সোনালি মুরগির; বাজারভেদে প্রতিকেজি সোনালি মুরগি বিক্রি হচ্ছে ৩৪০-৩৬০ টাকায়। দুই দিন আগে সোনালি মুরগির দাম ছিল ৩২০-৩৪০ টাকা এবং এক সপ্তাহ আগে এই মুরগি বিক্রি হয়েছে ২৮০-৩০০ টাকায়।

উত্তর বাড্ডার মুরগি ব্যবসায়ী লতিফ বলেন, "মঙ্গলবার সন্ধ্যা থেকে পাইকারি বাজারে বেড়ে গেছে মুরগির দাম। এতে করে বাধ্য হয়ে বেশি দামে মুরগি বিক্রি করতে হচ্ছে।"

দেশি মুরগির দাম বাজারভেদে কেজিতে বেড়েছে ৫০-৬০ টাকা। ৬৫০ টাকা কেজিতে বিক্রি হওয়া দেশি মুরগি বিক্রি হচ্ছে ৭০০-৭২০ টাকায়।

দাম বেড়েছে গরুর মাংসের। যেসব বাজারে ৭৫০ টাকা কেজিতে গরুর মাংস পাওয়া যেত রমজানের আগে আগে দাম বাড়িয়ে প্রতিকেজি গরুর মাংস ৮০০ টাকা নির্ধারণ করেছে তারা। খাসীর মাংস বিক্রি হচ্ছে প্রায় একই দামে। বাজারভেদে ১০০০-১২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে প্রতিকেজি খাসী।

রোজার আগে কাঁচাবাজারে এসে হতাশা ব্যক্ত করছেন সাধারণ ক্রেতারা। রামপুরা বাজারে মাংস কিনতে এসে এমনই একজন ক্রেতা আফসানা আক্তার বলেন, "প্রতি রমজানে যা হয়, এই রমজানেও তাই হলো। রোজা শুরু হওয়ার আগেই বাজারে প্রতিটি পণ্যের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে ব্যবসায়ীরা। রমজানে পণ্য কিনতে বাড়তি দামের কারণে অতিরিক্ত দুই তিন হাজার টাকা খরচ করতে হচ্ছে। 

আরেক ক্রেতা এহসানুর রহমান বলেন, "রমজান সিয়াম-সাধনার মাস হলেও বাজার দেখে মনে হচ্ছে না আমাদের এতটুকু পরিবর্তন হয়েছে। যদি সরবরাহ ঘাটতি থাকতো তাহলে কয়েক সপ্তাহ আগেই দাম বাড়ার কথা। আগমুহূর্তে প্রতিটি পণ্যের দাম এভাবে বেড়ে যাওয়া ব্যবসায়ীদের কারসাজি ছাড়া কিছুই না।"

এদিকে ফলের বাজারে খেঁজুর বাদে প্রতিটি ফলের দাম বেড়েছে। জাতিভেদে খেঁজুরে কেজিতে ৫০-১০০ টাকা কমলেও অন্যান্য ফলের দাম কেজিতে বেড়েছে ৮০-১২০ টাকা পর্যন্ত।

রমজানে চাহিদার উর্ধ্বে থাকা মাল্টার দাম এতদিন ২৫০-২৬০ টাকা কেজি হলেও বর্তমানে বিক্রি হচ্ছে ৩০০-৩৫০ টাকা কেজিতে। আপেল কেজিপ্রতি ২৮০-৩২০ টাকায় বিক্রি হলেও বর্তমানে বিক্রি হচ্ছে ৩৫০-৩৮০ টাকায়। বড়ই ১২০-১৮০ টাকা থেকে কেজিতে বেড়ে হয়েছে ২০০-২৫০ টাকা। ৪৫০-৪৮০ টাকায় বিক্রি হওয়া কেজিপ্রতি ডালিমের দাম এখন ৫২০-৫৮০ টাকা। প্রতি পিস আনারস ৬০ টাকায় বিক্রি হলেও রমজানের আগে দাম বেড়ে হয়েছে ৮০-১০০ টাকা।

মতিঝিলের ফল ব্যবসায়ী সুমন দামবৃদ্ধির কারণ উল্লেখ করে বলেন, "ঢাকার বাদামতলী আড়ৎ থেকেই সিংহভাগ আমদানি করা ফল ঢাকার খুচরা বাজারে আসে। প্রতি রমজানে বাদামতলী আড়তের সিন্ডিকেটের কারণে দাম বাড়ে ফলের।"

এ প্রসঙ্গে বাদামতলী আড়তের ফল আমদানিকারক সমিতির সভাপতি সিরাজুল ইসলাম বলেন, "সরকার নির্দিষ্ট ব্যবসায়ীদের ফল আমদানির সুযোগ দেয়। এতে করে হাতেগোণা কয়েকজনই ফল আমদানি করে, যা সিন্ডিকেট হওয়ার মূল কারণ।"

আমদানিকৃত ফলের ব্যবসা ও সুযোগ আরও বিস্তৃত করা গেলে ফলের বাজারে সিন্ডিকেট ভাঙা যাবে বলে প্রত্যাশা করেন এ ব্যবসায়ী।

সবজির বাজারে শিম, লাউ, শালগম, মূলা, করল্লা প্রায় আগের দামে বিক্রি হলেও দাম বেড়েছে শসা, গাজর ও টমেটোর। গত সপ্তাহেও শসা, গাজর ও টমেটো ৫০-৬০ টাকা কেজিতে বিক্রি হলেও চলতি সপ্তাহে দাম বেড়ে হয়েছে ৮০-১০০ টাকা।

উচ্চমূল্যে বিক্রি হচ্ছে লেবু। খুচরা বাজারে লেবুর হালি দাঁড়িয়েছে ১২০ টাকা, আর পাইকারি বাজারে জাতভেদে হালিপ্রতি লেবু বিক্রি হচ্ছে ৯০-১০০ টাকায়।

বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে দেশের প্রশাসন ব্যস্ত থাকায় এবার রমজানে সেভাবে বাজার মনিটরিং দেখা যায়নি। এই সুযোগে একদল ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট করে রমজানের গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের দাম বাড়িয়েছে।

কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সহসভাপতি এস এম নাজের হোসাইন বলেন, "দায়িত্বপ্রাপ্ত নতুন সরকারের কাছে মানুষের প্রথম প্রত্যাশা হচ্ছে রমজানে বাজার স্বাভাবিক রাখা। সরকারকে যেকোনো মূল্যে বাজারে দ্রব্যমূল্যের দামে লাগাম টানতে হবে।"

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকেও আশ্বাস দেয়া হয়েছে, দ্রুত সময়ের মধ্যে বাজার স্বাভাবিক পর্যায়ে ফিরিয়ে আনা হবে।

এ প্রসঙ্গে নতুন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদীর বলেন, "রমজানের বাজার নিয়ে উদ্বেগের বিষয়ে প্রশ্নের জবাবে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, পণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক থাকলে বাজারও স্থিতিশীল থাকবে। রমজান মাস এবং এর পরবর্তী সময়ের জন্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের পর্যাপ্ত মজুদ সরকারের হাতে রয়েছে এবং পাইপলাইনেও পর্যাপ্ত পণ্য আছে। রমজানে বাজার নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই।"

রমজানের শুরুতে কিছু পণ্যের দাম বাড়ার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, "এটি অনেক ক্ষেত্রে এককালীন চাহিদা বৃদ্ধির ফল। মানুষ সাধারণত পুরো মাসের বাজার একসঙ্গে করে, ফলে হঠাৎ করে ভোগ বাড়ে এবং এর প্রভাব খুচরা বাজারে পড়ে। তবে এ প্রভাব খুব বেশি সময় স্থায়ী হয় না।"

রমজান মাস সামাল দেওয়াটাই এখন সরকারের জন্য বড় পরীক্ষা উল্লেখ করে মন্ত্রী জানান, রমজানে বাজার নিয়ন্ত্রণে মানুষের প্রত্যাশা পূরণ করতে সরকারকে সফল হতেই হবে, এর কোনো বিকল্প নেই।