দেশের অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র খ্যাত চট্টগ্রাম বন্দর শ্রমিক-কর্মচারীদের লাগাতার ধর্মঘটের কারণে কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। বিদেশি অপারেটরের কাছে নিউমুরিং কন্টেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে গত চার দিন ধরে বন্দরে চলা ধর্মঘটের ফলে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

তৈরি পোশাক খাতসহ বিভিন্ন ভোগ্যপণ্য আমদানি ও রপ্তানিতে বাধার সৃষ্টি হওয়ায় শিপিং লাইনগুলো কয়েক শ কোটি টাকার ক্ষতির মুখে পড়েছে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক নৌ-বাণিজ্যে চট্টগ্রাম বন্দরের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হওয়ার আশঙ্কাও প্রকাশ করেছেন ব্যবসায়ীরা।

গত কয়েক দিন শ্রমিকরা প্রতিদিন আট ঘণ্টা করে কর্মবিরতি পালন করলেও বুধবার (৪ ফেব্রুয়ারি) সকাল থেকে তারা অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘট শুরু করেছেন।

ধর্মঘট নিরসনের উদ্দেশ্যে বন্দর-সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী নেতারা আজ বেলা ২টায় নগরীর আগ্রাবাদ হোটেলে শ্রমিক নেতাদের সঙ্গে জরুরি বৈঠক শুরু করেছেন। বৈঠক চলমান রয়েছে।

শ্রমিক নেতারা জানান, চট্টগ্রাম বন্দরের নিজস্ব অর্থায়নে তৈরি ও সম্পূর্ণ পরিচালনাযোগ্য এনসিটি টার্মিনাল একটি লাভজনক প্রকল্প হওয়া সত্ত্বেও বিদেশি কোম্পানিকে দেওয়া হচ্ছে। এতে দেশের সার্বভৌমত্ব ও বহু শ্রমিক-কর্মচারীর চাকরির নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়বে বলে তারা আশঙ্কা প্রকাশ করেন। এজন্য বন্দর কর্তৃপক্ষকে এই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসার দাবি জানিয়েছেন শ্রমিকরা।

অপরদিকে বন্দর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বন্দরের আধুনিকীকরণ ও গতিশীলতা বাড়াতে এনসিটি পরিচালনায় বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি প্রক্রিয়াধীন। বিষয়টি এখনো চূড়ান্ত হয়নি। হাইকোর্ট ইতোমধ্যে চুক্তির বিরুদ্ধে করা রিট খারিজ করেছেন। বন্দর কর্তৃপক্ষের নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও শ্রমিকরা কর্মবিরতি প্রত্যাহার করেননি। ১৬ জন শ্রমিক-কর্মচারীকে শাস্তিমূলক বদলি করে ঢাকায় পাঠানো হয়েছে।

চট্টগ্রাম বন্দর দেশের আমদানি-রপ্তানির ৯৯ শতাংশ কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত। ধর্মঘটের কারণে বন্দরে জমে গেছে একাধিক কন্টেইনার, অপেক্ষমাণ জাহাজের সারি দীর্ঘ হয়েছে।

পোশাক মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ’র পরিচালক রাকিবুল আলম চৌধুরী বলেন, ‘দুবাইভিত্তিক ডিপি ওয়ার্ল্ডকে এনসিটি পরিচালনার বৈধতা নিয়ে গত চার দিন ধরে বন্দরে অস্থিরতা বিরাজ করছে। মিছিল, সমাবেশ ও গণবদলির কারণে বন্দরে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম প্রায় স্থবির।’

এমএসসি শিপিংয়ের হেড অব অপারেশন আজমীর হোসাইন চৌধুরী বলেন, ‘ধর্মঘটের কারণে প্রতিদিন জাহাজগুলোকে গড়ে ১৫ হাজার মার্কিন ডলার ডেমারেজ দিতে হচ্ছে। দীর্ঘায়িত হলে ক্ষতির অঙ্ক কয়েক গুণ বৃদ্ধি পাবে।’

বেসরকারি কন্টেইনার ডিপো মালিকদের সংগঠন বিকডার মহাসচিব রুহুল আমিন সিকদার বিপ্লব জানান, ‘বন্দর এলাকায় ২১টি বেসরকারি কন্টেইনার ডিপো আছে। প্রতিদিন প্রায় সাড়ে ৬ হাজার কন্টেইনার ওঠানামা হয়। অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘটে তা কমে মাত্র দেড় হাজার কন্টেইনারে নেমেছে।’

ব্যবসায়ীরা আশঙ্কা প্রকাশ করছেন, এই ধর্মঘট দীর্ঘায়িত হলে দেশের অর্থনীতি মারাত্মকভাবে প্রভাবিত হবে। তাই বন্দরের কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখতে দ্রুত সমাধান প্রয়োজন।