ভারত মহাসাগরীয় সম্মেলনে যোগ দিতে মরিশাস যাওয়ার পথে মঙ্গলবার দিল্লি গেছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান। বিকেলে দিল্লিতে পৌঁছালে তাকে ‘উষ্ণ’ অভ্যর্থনা জানান ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বাংলাদেশ-মিয়ানমার বিভাগের প্রধান বি শ্যাম এবং দিল্লিতে বাংলাদেশের হাই কমিশনার রিয়াজ হামিদুল্লাহ।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ভারতের সঙ্গে ‘থমকে’ যাওয়া সম্পর্ক পুনরুদ্ধার বা ‘মেরামত’ করাই এ সফরের মূল লক্ষ্য। তবে সরকারিভাবে এটিকে ‘শুভেচ্ছা সফর’ হিসেবেই উপস্থাপন করা হচ্ছে।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয় পেয়ে বিএনপি সরকার গঠনের পর এটিই পররাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রথম আনুষ্ঠানিক ভারত সফর। সফরে তার সঙ্গে রয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির।

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল এক্সে পোস্ট করে বলেন, “ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে ঐতিহাসিক বন্ধন রয়েছে, যা জনগণের মধ্যে শক্তিশালী সম্পর্কের ভিত্তিতে গড়ে উঠেছে। এই সফর সেই সম্পর্ক আরও জোরদার করবে।”

গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক

দিল্লিতে অবস্থানকালে বুধবার ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর, বাণিজ্যমন্ত্রী পীযূষ গোয়েল এবং পেট্রোলিয়ামমন্ত্রী হারদীপ সিংহ পুরি-এর সঙ্গে বৈঠক করবেন খলিলুর রহমান। এছাড়া ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল-এর সঙ্গেও সাক্ষাৎ হওয়ার কথা রয়েছে।

এরপর বৃহস্পতিবার সকালে তিনি মরিশাসের রাজধানী পোর্ট লুইস-এ রওনা দেবেন ভারত মহাসাগরীয় সম্মেলনে অংশ নিতে।

সম্পর্কের টানাপোড়েন থেকে ‘রিস্টার্ট’

বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক গত এক দশকে উল্লেখযোগ্য উচ্চতায় পৌঁছালেও ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতে আশ্রয় নেওয়ার পর কূটনৈতিক টানাপোড়েন শুরু হয়।

মুহাম্মদ ইউনূস নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে নানা ইস্যুতে দুই দেশের সম্পর্ক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে। এসবের মধ্যে ছিল সংখ্যালঘু ইস্যু, সীমান্ত পরিস্থিতি, পারস্পরিক অভিযোগ এবং বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা।

২০২৫ সালের মে মাসে ভারত স্থলবন্দর দিয়ে বাংলাদেশি কিছু পণ্য আমদানি বন্ধ করলে সম্পর্ক আরও জটিল হয়ে ওঠে।

আলোচনার এজেন্ডা

দিল্লির বৈঠকগুলোতে গঙ্গা ও তিস্তার পানিবণ্টন, বাণিজ্য, সীমান্ত হত্যা এবং আঞ্চলিক সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হবে বলে জানিয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। ১৯৯৬ সালে স্বাক্ষরিত গঙ্গা পানিবণ্টন চুক্তির মেয়াদ চলতি বছরের ১২ ডিসেম্বর শেষ হওয়ার কথা—এ বিষয়েও আলোচনা হতে পারে।

এছাড়া মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ডপ্রাপ্ত শেখ হাসিনাকে দেশে ফেরত আনার বিষয়টি উত্থাপন করা হতে পারে। কলকাতায় গ্রেপ্তার কিছু আসামির প্রত্যর্পণ নিয়েও অগ্রগতি আশা করছে ঢাকা।

নতুন বাস্তবতায় সম্পর্ক পুনর্গঠন

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, “জুলাই অভ্যুত্থানের পর দুই দেশের সম্পর্ক কার্যত থমকে গিয়েছিল। আমরা সেখান থেকে সম্পর্ককে নতুন করে শুরু করতে চাই।”

বিশ্লেষকদের মতে, এই সফর বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের নতুন অধ্যায় শুরুর একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হতে পারে, যেখানে অতীতের টানাপোড়েন কাটিয়ে বাস্তবভিত্তিক সহযোগিতার দিকে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা থাকবে।