বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান নির্বাচনের ফলাফলকে ‘ভিত্তি’ হিসেবে অভিহিত করে দলীয় সমর্থকদের হতাশ না হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি ভোট-পরবর্তী সহিংসতার অভিযোগের নিন্দা জানিয়ে আগত সরকারকে সতর্ক করে বলেছেন, জনগণের ম্যান্ডেট কোনো ‘লাইসেন্স’ নয়, বরং একটি শর্তসাপেক্ষ আমানত।
সোমবার গভীর রাতে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, ৭৭টি আসন পাওয়া কোনো পরাজয় নয়; বরং এটি ভবিষ্যতের রাজনীতির শক্ত ভিত।
“আমি জানি, তোমাদের অনেকেই কষ্ট পেয়েছ, গভীরভাবে হতাশ হয়েছ। কিন্তু তোমাদের চেষ্টা বৃথা যায়নি,”—লেখেন তিনি।
তিনি দলীয় কর্মী, স্বেচ্ছাসেবক ও সমর্থকদের গত কয়েক মাসের পরিশ্রমের জন্য কৃতজ্ঞতা জানান। তাঁর ভাষায়, অনেকে গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগ করতে গিয়ে ভয়ভীতি ও হয়রানির শিকার হয়েছেন, যা সত্ত্বেও তাদের সাহস দেশের গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করেছে।
জামায়াত আমির বলেন, ৭৭টি আসনের মাধ্যমে দলটি সংসদে নিজেদের উপস্থিতি প্রায় চার গুণ বাড়িয়েছে এবং আধুনিক বাংলাদেশের রাজনীতিতে অন্যতম শক্তিশালী বিরোধী শক্তি হিসেবে অবস্থান নিয়েছে। “এটি কোনো পশ্চাৎপদতা নয়, এটি একটি ভিত্তি,”—উল্লেখ করেন তিনি।
রাজনীতির পরিবর্তনশীল বাস্তবতার উদাহরণ হিসেবে তিনি বিএনপি’র প্রসঙ্গ টানেন। তিনি বলেন, ২০০৮ সালে দলটি ৩০টি আসনে সীমিত থাকলেও দীর্ঘ ১৮ বছরের পথচলার পর ২০২৬ সালে পুনরায় ক্ষমতায় ফিরেছে। তাঁর মতে, গণতান্ত্রিক রাজনীতি একটি দীর্ঘ যাত্রা, যেখানে ধৈর্য, অধ্যবসায় ও ধারাবাহিক প্রচেষ্টা প্রয়োজন।
তিনি লেখেন, “আমাদের পথ স্পষ্ট—জনআস্থা অর্জন করা, ক্ষমতাকে জবাবদিহির আওতায় রাখা এবং দায়িত্বশীলভাবে ভবিষ্যতের প্রস্তুতি নেওয়া।”
গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নেতৃত্বের প্রকৃত পরীক্ষা কেবল প্রচারণায় নয়, জনগণের রায় মেনে নেওয়ার মধ্যেও নিহিত—এ কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, দল শুরু থেকেই একটি স্থিতিশীল ও কার্যকর গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ ছিল এবং সেই অবস্থান অব্যাহত রয়েছে।
“আমরা সামগ্রিক ফলাফলকে স্বীকৃতি দিচ্ছি এবং আইনের শাসনের প্রতি সম্মান জানাচ্ছি,”—বলেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, তাদের রাজনৈতিক আন্দোলন কোনো একক নির্বাচনে সীমাবদ্ধ নয়; বরং গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি জোরদার, নাগরিক অধিকার সুরক্ষা এবং ন্যায়ভিত্তিক ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র গঠনের লক্ষ্যে পরিচালিত।
অন্য এক পোস্টে শফিকুর রহমান অভিযোগ করেন, নির্বাচনের পর জামায়াত-নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় জোটের সমর্থক, স্বতন্ত্র প্রার্থী এবং এমনকি বিএনপি’র ভিন্নমতাবলম্বীরাও সহিংসতার শিকার হয়েছেন। তিনি এসব ঘটনার তীব্র নিন্দা জানান এবং নিরপরাধ ভুক্তভোগীদের প্রতি সংহতি প্রকাশ করেন।
তিনি লেখেন, “জনগণের ম্যান্ডেট কোনো লাইসেন্স নয়; এটি একটি শর্তসাপেক্ষ আমানত। সেই আমানতের মূল শর্ত হলো আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখা, সবার জন্য সমান সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে প্রতিটি নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।”
তিনি বলেন, সদ্য গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগ করা একটি জাতির জন্য সহিংসতা, ভয়ভীতি বা প্রতিশোধের রাজনীতি গ্রহণযোগ্য নয়। “জুলাই বিপ্লব এখনও জীবিত,”—উল্লেখ করে তিনি বলেন, জনগণ আর ভয় ও দমনের অন্ধকারে ফিরে যাবে না।
জামায়াত আমির আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে অবিলম্বে নিরপেক্ষ তদন্ত পরিচালনা করে দায়ীদের আইনের আওতায় আনার আহ্বান জানান। তাঁর মতে, দ্রুত ও দৃশ্যমান আইনি ব্যবস্থা পরিস্থিতির অবনতি রোধ করতে পারে এবং কোনো নাগরিককে বিকল্প উপায়ে নিরাপত্তা খুঁজতে বাধ্য করবে না।
তিনি দলীয় নির্বাচিত সংসদ সদস্য, প্রার্থী ও স্থানীয় নেতাদের প্রতি আহ্বান জানান, ভোট-পরবর্তী সহিংসতায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়াতে, প্রমাণ সংগ্রহ করতে এবং তা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে জমা দিতে। প্রয়োজনে সেসব তথ্য গণমাধ্যমেও প্রকাশের কথা বলেন তিনি।
আগত সরকারের উদ্দেশে তিনি বলেন, সুশাসনের সূচনা হয় নিজ দলের ভেতরে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। “আমরা শান্তিপূর্ণ ও দায়িত্বশীল রাজনীতিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তবে আমাদের এই অঙ্গীকারকে দুর্বলতা হিসেবে দেখা উচিত নয়,”—বলেন তিনি।
তিনি পুনরায় জোর দিয়ে বলেন, সহিংসতা, দমন-পীড়ন ও সন্ত্রাসের রাজনীতি দেশের কোনো পক্ষ থেকেই যেন আর ফিরে না আসে।
সবশেষে তিনি দেশের শান্তি, স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তা কামনা করে দোয়া করেন।
পূর্বের পোস্ট :