জাতীয় নাগরিক পার্টির সাবেক নেত্রী ও ঢাকা-৯ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী তাসনিম জারা শনিবার তার নির্বাচনী ইশতেহার প্রকাশ করে লিখেছেন, সংসদে গেলে তার প্রথম কাজ হবে গ্যাস না দিয়েও ঢাকাবাসীর থেকে যে বিল আদায় করা হয় সেটি বন্ধ করা; পাশাপাশি এলাকাবাসীর সব সমস্যা সমাধানে ওপেন ড্যাশবোর্ড খোলার প্রতিশ্রুতি দেন তিনি।

নিজের ভেরিফাইড ফেসবুকে পেইজে নিজের নির্বাচনী ইশতেহার পোস্ট করে জারা লিখেন, প্রতি মাসে গ্যাসের বিল নেয়া হচ্ছে, কিন্তু চুলা থেকে বের হচ্ছে গ্যাসের বদলে বাতাস। এটি জনগণের সঙ্গে প্রতারণা।

সংসদে গেলে সবার আগে এই প্রতারণা বন্ধ করার আশ্বাস দিয়ে জারা লিখেন, "সংসদে আমার প্রথম কাজ হবে "সেবা না দিলে বিল নেই"  নীতির জন্য খসড়া আইন প্রস্তাব করা এবং চাপ সৃষ্টি করা। তিতাস যদি গ্যাস দিতে না পারে, তারা টাকা নিতে পারবে না। গ্যাস না থাকলে মাসিক বিল মওকুফ করার প্রস্তাব থাকবে এই বিলে।"

জনগণের সঙ্গে এই প্রতারণার সুযোগ নিয়ে কিছু অসাধু এলপিজি ব্যবসায়ী সিলিন্ডারের দাম বাড়িয়ে জনগণকে জিম্মি করে ফেলে উল্লেখ করে জারা সিন্ডিকেট ভাঙার প্রতিশ্রুতি দিয়ে লেখেন, "পাইপলাইন গ্যাসের ব্যর্থতার দায় নিয়ে সরকারকে এই এলাকায় ভর্তুকি মূল্যে বা ন্যায্যদামে এলপিজি সিলিন্ডার সরবরাহ নিশ্চিত করতে বাধ্য করব। সিন্ডিকেট করে দাম বাড়ালে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য প্রশাসনকে চাপ দেব।"

ঢাকা-৯ এলাকার বাসিন্দাদের সঙ্গে বৈষম্যমূলক আচারণের অভিযোগ করেন জারা। জানান, গুলশান-বনানীর সমান ট্যাক্স ও বিল দেয়ার পরেও এই এলাকার বাসিন্দাদের দেয়া হয় তৃতীয় শ্রেণীর নাগরিক সেবা। "ভোটের সময় নেতারা আসেন, ভোট নেন, তারপর উধাও হয়ে যান। রাষ্ট্র আমাদের কেবল 'রাজস্ব আদায়ের উৎস' মনে করে। টাকা নেওয়ার সময় আছেন, কিন্তু সেবা দেওয়ার সময় নেই।"

এছাড়া ঢাকা-৯ আসনের বাসিন্দাদের জলবদ্ধতা নিরসনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে জারা লেখেন, ড্রেনেজ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং বর্ষার আগেই খাল ও নর্দমা পরিষ্কার নিশ্চিত করতে ওয়াসা ও সিটি কর্পোরেশনের ওপর কঠোর নজরদারি রাখা হবে।

এলাকায় রাস্তা খুঁড়ে ফেলে রাখা চলবে না উল্লেখ করে ইশতেহারে জারা ওয়াসা বা সিটি কর্পোরেশন, যে-ই রাস্তা কাটবে, কাজ শেষ করার নির্দিষ্ট 'ডেডলাইন' থাকবে। ডেডলাইন মিস করলে ঠিকাদারকে জরিমানা করা হবে বলে প্রতিশ্রুতি দেন।

নিজ নির্বাচনী এলাকার স্বাস্থ্যসেবার করুণ দশার কথা উল্লেখ করে জারা লেখেন,  "ঢাকা-৯ এলাকায় আমরা ৭-৮  লাখ মানুষ বাস করি, অথচ আমাদের জন্য বড় হাসপাতাল মাত্র একটি, মুগদা মেডিক্যাল। এটা একটা নিষ্ঠুর কৌতুক। ৫০০ বেডের এই হাসপাতালে তিল ধারণের ঠাঁই নেই। ডাক্তার-নার্সরা অমানবিক চাপে কাজ করছেন, আর রোগীরা সেবা না পেয়ে ধুঁকছেন। সবচেয়ে ভয়ের ব্যাপার হলো ডেঙ্গু। প্রতি বছর বর্ষা এলেই লোক দেখানো মশার ওষুধ ছিটানো হয়, অথচ আমাদের প্রিয়জনরা মারা যায়।"

এই সমস্যা সমাধানে নির্বাচিত হলে মুগদা হাসপাতালে পর্যাপ্ত জনবল নিয়োগ এবং আধুনিক যন্ত্রপাতি সচল রাখতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সাথে প্রতিনিয়ত যোগাযোগ রক্ষা এবং হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে জবাবদিহিতার আনার প্রতিশ্রুতি দেন যারা।

এছাড়া কমিউনিটি ক্লিনিককে মিনি হাসপাতাল এবং ডেঙ্গু দমনে "মশা নিধন স্কোয়াড" গঠনের আশ্বাস দেন তিনি। পাশাপাশি গর্ভবতী নারীদের নিয়মিত ও সাশ্রয়ী চিকিৎসা নিশ্চিত করতে এবং হাসপাতাল ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে নারী-বান্ধব টয়লেট ও ব্রেস্টফিডিং নিশ্চিত করতে কাজ করা হবে বলে জানান জারা।

এলাকার নিরাপত্তা ব্যবস্থার বেহাল দশা উল্লেখ করে জারা জানান, ঢাকার খিলগাঁও-বাসাবো এলাকা মাদক সিন্ডিকেটের দখলে। সন্ধ্যার পর এই এলাকার অলগলি দিয়ে হাঁটতে নারীরা ভয় পান। ট্যাক্সের টাকা দিয়ে ল্যাম্পপোস্ট বসানোর কথা থাকলেও রাস্তা অন্ধকার রেখে অপরাধের রাজত্ব কায়েম করা হয়েছে এ এলাকায়।

এ সমস্যা সমাধানে নিরাপদ করিডোরের প্রস্তাব দিয়ে জারা লেখেন,   "স্কুল, কলেজ এবং গার্মেন্টসের রাস্তায় আমি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সিসি ক্যামেরা এবং উচ্চ-ক্ষমতার ল্যাম্পপোস্ট বসাব। অন্ধকার রাস্তা মানেই অপরাধের আখড়া। আমরা ঢাকা-৯ এর কোনো রাস্তা অন্ধকার থাকতে দেব না।"

নির্বাচিত হলে এলাকা মাদকমুক্ত করতে ও মাদকাসক্তদের চিকিৎসা নিশ্চিত করতে মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করবেন বলে জানান জারা।

শিক্ষা ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনতে ঢাকা-৯ এলাকায় ভর্তি বাণিজ্য বন্ধ করার আশ্বাস দিয়ে জারা জানান, টাকা বা সুপারিশ ছাড়া ভালো স্কুলে ভর্তি হওয়া যায় না। এই দুর্নীতি  মেধাবী সন্তানদের ভবিষ্যৎ নষ্ট করে দিচ্ছে। ভর্তি বাণিজ্য বন্ধ করতে শুরুতেই এমপি কোটা বন্ধ করা হবে। "আমি কথা দিচ্ছি, স্কুল ভর্তিতে এমপির কোনো সুপারিশ বা কোটা থাকবে না। ভর্তি বাণিজ্য আমি কঠোর হাতে দমন করব। মেধা ও স্বচ্ছতাই হবে একমাত্র যোগ্যতা।"

এছাড়া এলাকার বিদ্যালয়কে আধুনিক ল্যাবরেটরিতে পরিণত করা হবে আশ্বাস দিয়ে যারা লেখেন,

"আমার বরাদ্দের টাকা দিয়ে আমি স্কুলগুলোতে আধুনিক সায়েন্স ল্যাব, ল্যাঙ্গুয়েজ ক্লাব এবং কোডিং শেখানোর ব্যবস্থা করব। এতে আমাদের ছেলেমেয়েরা ফ্রিল্যান্সিং বা উচ্চশিক্ষার জন্য প্রস্তুত হতে পারবে। প্রত্যেকটি স্কুলে লাইব্রেরি গড়ে তোলা হবে যাতে আমাদের শিশু কিশোরদের মানসিক বিকাশ যথাযথভাবে ঘটে।"

এলাকার বেকারত্ব সমস্যার কথা উল্লেখ করে জারা জানান, অনেক তরুণ-তরুণীরা বেকার, কারণ সিস্টেম তাদের পক্ষে নেই। তাদের মেধা আছে, কিন্তু পুঁজি নেই। রাষ্ট্র কেবল বড় শিল্পপতিদের ঋণ মওকুফ করে, কিন্তু ছোট ব্যবসায়ী বা নতুন উদ্যোক্তারা ব্যাংকের বারান্দায় ঘুরতে ঘুরতে ক্লান্ত হয়ে যায়। এলাকার নারীরা কাজ করতে চান, কিন্তু ডে-কেয়ার সেন্টার না থাকায় সন্তানকে ঘরে রেখে তারা কাজে যেতে পারেন না।

এই সমস্যা সমাধানে ‘স্টার্ট-আপ ঢাকা-৯’ ফান্ড গঠন করা হবে উল্লেখ করে জারা লেখেন, "আমি এমপি হলে আমার বিশেষ বরাদ্দ থেকে তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য 'সিডিং ফান্ড' বা প্রাথমিক পুঁজির ব্যবস্থা করব। জামানত ছাড়া সহজ শর্তে ঋণ পাওয়ার জন্য আমি ব্যাংকের সাথে লড়াই করব। প্রতিটি ওয়ার্ডে সরকারি খরচে বা ভর্তুকি দিয়ে ‘কমিউনিটি ডে-কেয়ার সেন্টার’ চালু করব। যাতে মায়েরা নিশ্চিন্তে কাজে যেতে পারেন। গৃহকর্মী থেকে শুরু করে অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিক, সবার জন্য ‘ন্যায্য মজুরি’ ও আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করতে আমি সংসদে কথা বলব। কেউ যেন তাদের দুর্বলতার সুযোগ না নিতে পারে। স্থানীয় উদ্যোক্তাদের জন্য ই-কমার্স প্রশিক্ষণ ও অনলাইন মার্কেট অ্যাক্সেস নিশ্চিত করবো। যেন তারা শুধু দোকানে নয়, মোবাইলেও ব্যবসা করতে পারেন। আরও বেশী কাস্টোমারকে আকৃষ্ট করতে পারেন।" 

"আমি 'অতিথি পাখি' নই, আমি আপনাদের ঘরের মেয়ে" উল্লেখ করে জারা জানান তিনি এমপি নির্বাচিত হলে এক মাসের মধ্যে ঢাকা-৯ এর প্রাণকেন্দ্রে স্থায়ী অফিস চালু করবেন। কর্মজীবীদের সুবিধার্থে এই অফিস সন্ধ্যার পরেও খোলা থাকবে যেখানে জারা নিজে ও অফিস স্টাফদের থেকে সেবা পাওয়া যাবে বলে প্রতিশ্রুতি দেন।

এছাড়া এলাকাবাসীর অভিযোগ দ্রুত নিষ্পত্তি করতে ওপেন ড্যাশবোর্ড চালুর ঘোষণা দেন জারা। "আপনার অভিযোগ কোনো ফাইলে চাপা পড়ে থাকবে না। আমরা ডিজিটাল ড্যাশবোর্ড করব, যেখানে আপনারা দেখতে পাবেন আপনার অভিযোগের বর্তমান অবস্থা কী।"

ঢাকা-৯ বাসিন্দাদের উদ্দেশ্যে জারা লেখেন,  "আপনাদেরকে একটা কথা বিশেষভাবে বলতে চাই- আমি কোনো পেশাদার রাজনীতিবিদ নই। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর স্বচ্ছভাবে রাজনীতি করার ও দেশ গড়ার একটা সুযোগ এসেছে তাই রাজনীতিতে এসেছি। আমার এই ইশতেহার কোনো গতানুগতিক 'ফাঁকা বুলি' নয়। এটি আপনাদের সাথে আমার চুক্তি। আমি যা লিখেছি, তা কীভাবে বাস্তবায়ন করব, সেই পরিকল্পনা করেই মাঠে নেমেছি।"

ফুটবল মার্কায় ভোট চেয়ে জারা বলেন,  "এবার একজন ডাক্তারকে সুযোগ দিন, যে ডাক্তার জানে রোগ কোথায় আর ওষুধ কোনটা, যে ডাক্তার কথা রাখে, যে ডাক্তার বিপদে পাশে এসে দাঁড়ায়। এমন একজন শিক্ষিত সন্তানকে সুযোগ দিন, যে আপনাদের মাথা নত হতে দেবে না।"