লালমনিরহাট: ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে লালমনিরহাটে রাজনৈতিক তৎপরতা ক্রমেই জোরালো হয়ে উঠছে। এক সময় জাতীয় পার্টির (জাপা) শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত জেলা হলেও বর্তমানে দলটির সাংগঠনিক উপস্থিতি প্রায় নেই বললেই চলে। ফলে নির্বাচনি সমীকরণে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে উঠছে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে।
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বড় ধরনের পরিবর্তন এলেও জাতীয় পার্টি এখনো মাঠে সক্রিয় হতে পারেনি। এতে জেলার রাজনীতিতে শূন্যতা তৈরি হয়েছে, যার সুযোগ কাজে লাগাতে তৎপর বিএনপি ও জামায়াত। পাশাপাশি ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশসহ কয়েকটি নতুন রাজনৈতিক দলও সভা-সমাবেশ ও গণসংযোগের মাধ্যমে নিজেদের অবস্থান জানান দিতে মাঠে নামছে। এতে করে আসন্ন নির্বাচন ঘিরে লালমনিরহাটের রাজনীতি আরও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হয়ে উঠছে।
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, লালমনিরহাট জেলার তিনটি সংসদীয় আসনে মোট ভোটার ১১ লাখ ৬২ হাজার ৬২৮ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার পাঁচ লাখ ২৪ হাজার ৫২২ জন, নারী ভোটার পাঁচ লাখ ৩৮ হাজার ১০৬ জন এবং হিজড়া ভোটার আটজন। জেলায় ৩৮৫টি ভোটকেন্দ্রের দুই হাজার ১৯৩টি ভোটকক্ষে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
স্থানীয় রাজনীতিকদের ভাষ্য, দীর্ঘদিন ধরে ‘সাংগঠনিক দুর্বলতা’ ও ‘নেতৃত্ব সংকটে’ ভুগছে জাতীয় পার্টি। এক সময় দলটির একাধিক সংসদ সদস্য থাকলেও বর্তমানে নেতাকর্মীদের তেমন কোনো রাজনৈতিক তৎপরতা চোখে পড়ছে না।
লালমনিরহাট-১: ভোটের মাঠে ‘তিস্তা’
পাটগ্রাম ও হাতীবান্ধা উপজেলা নিয়ে গঠিত লালমনিরহাট-১ আসনে ভোটার সংখ্যা তিন লাখ ৯১ হাজার ৬২২ জন। প্রতিবছর বন্যা ও নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত এই এলাকায় ‘তিস্তা মহাপরিকল্পনা’ প্রধান নির্বাচনি ইস্যু হয়ে উঠেছে।
এ আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী শিল্প ও বাণিজ্য বিভাগের ভাইস প্রেসিডেন্ট আনোয়ারুল ইসলাম রাজু নিয়মিত গণসংযোগ চালাচ্ছেন। বিএনপির প্রার্থী কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার হাসান রাজীব বলেন, ‘এই অঞ্চলের মানুষের সবচেয়ে বড় সমস্যা তিস্তা ও বন্যা। স্থায়ী সমাধান ছাড়া উন্নয়ন সম্ভব নয়।’
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ থেকে মুফতি ফজলুল করীম শাহারিয়ার এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী সিহাব আহমেদও মাঠে রয়েছেন।
লালমনিরহাট-২: বিএনপিতে দ্বন্দ্ব
কালীগঞ্জ ও আদিতমারী উপজেলা নিয়ে গঠিত লালমনিরহাট-২ আসনে ভোটার সংখ্যা চার লাখ ২১ হাজার ৯৯১ জন। এ আসনে বিএনপির প্রার্থী ঘোষণা না হওয়ায় দলটির ভেতরে অসন্তোষ ও অভ্যন্তরীণ প্রতিযোগিতা স্পষ্ট।
জেলা বিএনপির জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি রোকন উদ্দিন বাবুল ও উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক জাহাঙ্গীর আলমসহ একাধিক নেতা মনোনয়ন প্রত্যাশা করছেন। জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী জেলা সেক্রেটারি ফিরোজ হায়দার লাভলু জানান, এবার তারা জোটের বাইরে থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
এ ছাড়া ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ও নতুন রাজনৈতিক দল ‘জনতার দল’-এর প্রার্থীরাও আলোচনায় রয়েছেন।
লালমনিরহাট-৩: দুলুর শক্ত অবস্থান
লালমনিরহাট সদর আসনে ভোটার সংখ্যা চার লাখ ৪৯ হাজার ৫৩৬ জন। এখানে বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক ও সাবেক উপমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু একক প্রার্থী হিসেবে মাঠে রয়েছেন। তিস্তা মহাপরিকল্পনা, স্থলবন্দর উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানকে তিনি প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে তুলে ধরছেন।
এই আসনে জামায়াত ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থীরাও নিয়মিত জনসংযোগ চালাচ্ছেন।
ভোটারদের প্রত্যাশা
ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দলীয় পরিচয়ের পাশাপাশি প্রার্থীর কাজ ও গ্রহণযোগ্যতা এবার গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। আদিতমারীর এক কলেজ শিক্ষক বলেন, মানুষ উন্নয়নমুখী ও সৎ নেতৃত্ব চায়। তরুণ ভোটারদের বড় অংশ কর্মসংস্থান ও দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণকে প্রধান ইস্যু হিসেবে দেখছেন।
সব মিলিয়ে জাতীয় পার্টির অনুপস্থিতিতে লালমনিরহাটের তিন আসনেই বিএনপি ও জামায়াতের প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবার নির্বাচনের মূল আকর্ষণ হয়ে উঠছে।
পূর্বের পোস্ট :