রাজধানীর ধানমন্ডির ৭ নম্বর সড়কে বসবাস করেন জাকিয়া রায়হানা। বাসায় তিতাসের গ্যাস–সংযোগ থাকলেও প্রয়োজনের সময় চুলায় আগুন জ্বলে না। রমজানে ভোগান্তি চরমে উঠেছে।
তিনি বলেন, চার দিন ধরে বাসার কোনো ফ্ল্যাটে গ্যাস নেই। আশপাশের বাসাতেও একই অবস্থা। ‘মানুষের খুব কষ্ট হচ্ছে। এভাবে চলা যায় না।’
এই সংকট নতুন নয়। দেড় দশকের বেশি সময় ধরে গ্যাসের ঘাটতি চলছে। এর মধ্যে একাধিকবার দাম বাড়ানো হয়েছে। আমদানি বাড়িয়ে সংকট কাটানোর চেষ্টা হয়েছে, তাতে বেড়েছে বৈদেশিক মুদ্রার চাপ। বড় অঙ্কের দেনার মুখে পড়েছে দেশ। তবু সংকট কাটেনি।
দিনে ঘাটতি ১১৫ কোটি ঘনফুট
জ্বালানি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রতিদিন গ্যাসের চাহিদা ৩৮০ কোটি ঘনফুট। দেশীয় উৎপাদন ও আমদানি মিলিয়ে সরবরাহ হয় ২৬৫ কোটি ঘনফুট। ফলে ঘাটতি ১১৫ কোটি ঘনফুট।
পেট্রোবাংলা বলছে, মোট গ্যাসের ৪১ শতাংশ যায় বিদ্যুৎ খাতে, ৩৬ শতাংশ শিল্পে, ১১ শতাংশ গৃহস্থালি রান্নায়। বাকি অংশ সার, সিএনজি ও চা খাতে ব্যবহৃত হয়। চাহিদা অনুযায়ী এক খাত থেকে অন্য খাতে সরবরাহ সমন্বয় করা হয়।
এলএনজি টার্মিনাল রক্ষণাবেক্ষণের কারণে ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি তীব্র সংকট দেখা দেয়। পাইপলাইনে পানি ঢুকে ধানমন্ডি, মোহাম্মদপুর ও লালমাটিয়ায় সমস্যা বাড়ে। তিতাসের কর্মীরা লাইনে জমা পানি পরিষ্কার করছেন।
তিতাস সূত্র জানায়, তাদের দৈনিক চাহিদা ১৯০ কোটি ঘনফুট। সরবরাহ হচ্ছে ১৫০ কোটি ঘনফুট। দ্রুত উন্নতির সম্ভাবনা নেই।
দেশীয় উৎপাদন কমছে
২০১৭ সালে দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র থেকে দিনে ২৭০ কোটি ঘনফুট গ্যাস উৎপাদন হতো। এখন তা নেমে এসেছে ১৭০ কোটিতে। দেশে মোট ২৯টি গ্যাসক্ষেত্র রয়েছে। উত্তোলনযোগ্য মজুত ২৯ দশমিক ৭৪ টিসিএফ। এর মধ্যে ২১ দশমিক ৭৮ টিসিএফ উত্তোলন হয়েছে। অবশিষ্ট ৭ দশমিক ৯৬ টিসিএফ।
বর্তমান হারে উৎপাদন চললে সাত থেকে আট বছর মজুত টিকে থাকতে পারে। তবে শেষ পর্যায়ে উৎপাদন কমে আসে।
হবিগঞ্জের বিবিয়ানা গ্যাসক্ষেত্রে উৎপাদন কমছে। ভোলার গ্যাস জেলা–সীমার বাইরে নিতে অবকাঠামো নেই। ফলে সম্ভাবনা থাকলেও পূর্ণ ব্যবহার সম্ভব হচ্ছে না।
আমদানি নির্ভরতা ও মূল্যবৃদ্ধি
২০১৮ সালে এলএনজি আমদানি শুরু হয়। ২০২২ সালে রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধের পর বিশ্ববাজারে দাম বেড়ে যায়। এতে বৈদেশিক মুদ্রার মজুত কমে। ডলারের দাম বেড়ে আমদানি ব্যয় আরও বাড়ে।
২০০৯ সালে দুই চুলার মাসিক বিল ছিল ৪৫০ টাকা। পরে তা বাড়িয়ে ১ হাজার ৮০ টাকা করা হয়। শিল্পে গ্যাসের ইউনিট মূল্য ৫ টাকা ৮৬ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৩০ টাকা করা হয়েছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের পর সরকার পরিবর্তন হয়। অন্তর্বর্তী সরকার শিল্পে নতুন সংযোগে দাম বাড়ালেও বাসাবাড়িতে বাড়ায়নি। নতুন কূপ খননে জোর দেওয়া হয়েছে।
সামনে চার চ্যালেঞ্জ
বিশ্লেষকেরা বলছেন, নতুন সরকারের সামনে চারটি প্রধান চ্যালেঞ্জ—দেশীয় উৎপাদন বাড়ানো, এলএনজি অবকাঠামো সম্প্রসারণ, দুর্নীতি ও চুরি রোধ এবং দাম নিয়ন্ত্রণ।
বিশেষজ্ঞ ম তামিম বলেন, ‘এ মুহূর্তে বড় সমাধান নেই। রেশনিং করেই চালাতে হবে।’ তাঁর মতে, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদে অনুসন্ধান, কূপ খনন, মজুত ব্যবস্থাপনা ও বিকল্প জ্বালানিতে জোর দিতে হবে।
গ্যাস–সংকট না কাটলে গৃহস্থালি ভোগান্তি কমবে না। শিল্পে সরবরাহ না বাড়লে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাধাগ্রস্ত হবে। ফলে অর্থনৈতিক লক্ষ্য অর্জন কঠিন হয়ে পড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
পূর্বের পোস্ট :