সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বাজারে চিনি, লিকুইড পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) ও ভোজ্যতেলের দামে অস্বাভাবিক ও ধারাবাহিক বৃদ্ধি সাধারণ ভোক্তাদের মধ্যে চরম হতাশা, উদ্বেগ ও ক্ষোভ সৃষ্টি করে ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) শনিবার সরকারের কাছে সাত দফা দাবি উত্থাপন করেছে।
এক বার্তায় ক্যাব জানায়, আমদানি, মিল পর্যায়ে উৎপাদন ও সরবরাহে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে একটি প্রভাবশালী চক্র সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ ও সিন্ডিকেট করে চিনির বাজারকে অস্থির করে তুলেছে। একইসঙ্গে এলপিজি, সয়াবিন ও পাম তেলের বাজারেও অযৌক্তিকভাবে দাম বাড়ানো হচ্ছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন ব্যয়ের ওপর।
ক্যাব নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধির তীব্র নিন্দা জানিয়েছে ও জড়িতদের বিরুদ্ধে অবিলম্বে ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছে।
ক্যাব জানায়, এক সপ্তাহ আগেও যেখানে চিনির দাম তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল ছিল, বর্তমানে পাইকারি বাজারে হঠাৎ করেই দাম বেড়ে গেছে এবং খুচরা বাজারে প্রতি কেজি চিনির দাম কেজি প্রতি ১০ টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে। সাদা চিনির আমদানি কার্যত বন্ধ থাকা এবং মিল পর্যায়ে উৎপাদন ও সরবরাহে ঘাটতির অজুহাত দেখিয়ে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করাই এই মূল্যবৃদ্ধির মূল কারণ। রমজানের আগে সুকৌশলে চিনির দাম বাড়ানোর প্রতিবছরের রীতিকে অনুসরণ করে ব্যবসায়ীরা এ কারসাজির আশ্রয় নিয়েছে।
অন্যদিকে, সাম্প্রতিক সময়ে সয়াবিন ও পাম তেলের দাম প্রতি লিটারে ৫ থেকে ১০ টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। টিসিবি'র তথ্য অনুযায়ী গত এক বছরে বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম খুচরা পর্যায়ে ১২.৮৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজার পরিস্থিতির অজুহাত দেখিয়ে ভোজ্যতেলের দাম বাড়ানো হলেও দাম কমার ক্ষেত্রে একই ধরনের দ্রুততা বা উদ্যোগ দেখা যায় না। ফলে ভোক্তারা একতরফাভাবে মূল্যবৃদ্ধির চাপ বহন করতে বাধ্য হচ্ছেন বলে অভিযোগ ক্যাবের।
বাজারে এলপিজি সংকট ও দ্বিগুণ দাম নিয়ে ক্যাব জানায়, বিনা কারণে এলপিজির দাম বাড়ানোর কোন যুক্তি নেই। এলপিজির চাহিদা বাড়ার অজুহাতে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে অনেক বেশি দাম নিচ্ছেন। এক্ষেত্রে আমদানিকারক ও তাদের পরিবেশকদের কারসাজি থাকতে পারে। যেহেতু বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) দাম নির্ধারণ করেই ক্ষান্ত, সেকারণে ব্যবসায়ীরা সরকারের নির্ধারিত দামকে উপেক্ষা করে তাদের মতো করেই দাম নেন। এটা যেন রীতিতে পরিণত হয়েছে।
ক্যাব মনে করে, রমজান ও আসন্ন বিভিন্ন উপলক্ষকে সামনে রেখে প্রশাসনিক ব্যস্ততার সুযোগ নিয়ে অসাধু ব্যবসায়ী ও সিন্ডিকেট চক্র পরিকল্পিতভাবে এলপিজি, চিনি ও ভোজ্যতেলের বাজারে কারসাজি করছে। প্রকৃত সরবরাহ পরিস্থিতি ও আন্তর্জাতিক বাজারের দামের সঙ্গে বর্তমান মূল্যবৃদ্ধির কোনো যৌক্তিক সামঞ্জস্য নেই। এটি স্পষ্টভাবে বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা ও কার্যকর নজরদারির অভাবের প্রতিফলন।
ক্যাবের মতে, এলপিজি, চিনি ও ভোজ্যতেলের মতো মৌলিক নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজার যদি এভাবে সিন্ডিকেটের হাতে ছেড়ে দেওয়া হয়, তবে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং বাজার ব্যবস্থার ওপর জনগণের আস্থা আরও দুর্বল হয়ে পড়বে।
এ অবস্থা থেকে উত্তরণে ক্যাব সরকারের কাছে সাত দফা দাবি জানিয়েছে-
১. মিল পর্যায়ে চিনি উৎপাদন, মজুত ও সরবরাহের প্রকৃত তথ্য যাচাই করে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টিকারীদের চিহ্নিত করা।
২. চিনি ও ভোজ্যতেলের বাজারে সিন্ডিকেট ও মজুতদারদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
৩. ভোজ্যতেলের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক বাজারদর, আমদানি ব্যয় ও স্থানীয় বাজারমূল্যের মধ্যে যৌক্তিক সামঞ্জস্য নিশ্চিত করা।
৪. পাইকারি ও খুচরা বাজারের দামের অযৌক্তিক ব্যবধান কমাতে কার্যকর প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ জোরদার করা।
৫. এলপিজি'র দাম নির্ধারিত দামে বিক্রিতে মাঠ পর্যায়ে জেলা প্রশাসন, ভোক্তা অধিদপ্তর ও আইন প্রয়োগকারী কতৃপক্ষের কার্যকর সমন্বয় জোরদারে জ্বালানি মন্ত্রণালয়কে উদ্যোগে নিতে হবে।
৬. এলপিজি'র আমদানিকারক ও তাদের পরিবেশকদের মজুত, সরবরাহ ও খুচরা বিক্রির তদারকি জোরদার করতে হবে।
৭. নিত্যপণ্যের বাজার তদারকি যেন নির্বাচন বা অন্য যে কোন অজুহাতে জেলা-উপজেলা প্রশাসনের অগ্রাধিকার তালিকা থেকে সরে না যায় সে জন্য সরকারের শীর্ষ পর্যয়ের নির্দেশনা থাকা প্রয়োজন।
ক্যাব মনে করে, অবিলম্বে কঠোর ও সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ না করা হলে চিনি, এলপিজি সিলিন্ডারসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় বাজারের চলমান অস্থিরতা আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। ভোক্তাদের ন্যায্যমূল্য ও স্বস্তি নিশ্চিত করতে সরকার দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেবে-এই প্রত্যাশা করছে সংগঠনটি।
পূর্বের পোস্ট :