বাংলাদেশে দারিদ্র্য বিমোচনের লক্ষ্যে অনেক ভালো পরিকল্পনা থাকলেও এসব পরিকল্পনার বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া খুবই খারাপ বলে মন্তব্য করেছেন অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ।

“নানা পরিকল্পনায় দারিদ্র্য বিমোচনে চমৎকার সব ডিজাইন থাকলেও আমাদের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন খুবই খারাপ। অদক্ষতা, দুর্নীতি ও আইনি জটিলতার কারণে ভালো ভালো পরিকল্পনা আলোর মুখ দেখে না,” বুধবার রাজধানীর এক হোটেলে সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশন (এসডিএফ) আয়োজিত এক কর্মশালায় এসব কথা বলেন তিনি।

অর্থ উপদেষ্টা আরও জানান, ২০১০ সাল থেকে দেশে দারিদ্র্যের হার কমতে থাকলেও ২০২২ সালের পর আবার এই হার বাড়তে শুরু করেছে। বিদ্যমান দারিদ্র্য সামলানোর পাশাপাশি প্রতিদিন যারা দরিদ্র হচ্ছেন, তাদের জন্যও পরিকল্পনা নিতে হচ্ছে সরকারকে।

এসডিএফের নেওয়া প্রকল্পের প্রশংসা করে উপদেষ্টা বলেন, “আমাকে দিয়েই এসডিএফের কার্যক্রম শুরু হয়েছিল। এত দিনে এসডিএফের কাজ দৃশ্যমান হয়েছে। গ্রামের নারীরা উপকারভোগী হচ্ছেন।”

শহরের দারিদ্র্য নিরসনের বিষয়ে তিনি বলেন, গ্রামীণ অঞ্চলকে আরও আকর্ষণীয় করা গেলে এবং শহরের ওপর চাপ বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে কমানো সম্ভব হলে ‘ডিসেন্ট্রালাইজড ডেভেলপমেন্ট’ আরও সহজ হবে।

সামাজিক সুরক্ষা খাতে উপকারভোগী নির্বাচন প্রক্রিয়ায় দুর্বলতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, “সিলেকশন এখন যথাযথ ধারায় এলেও আওতা বাড়াতে হবে। এখানে স্টেকহোল্ডারদের অংশগ্রহণ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।”

দেশের এনজিওগুলোর প্রতি আরও কার্যকর ভূমিকা রাখার আহ্বান জানিয়ে অর্থ উপদেষ্টা বলেন, “এনজিওগুলো মধ্যম আয়ের মানুষের কাছে ৪–৫ লাখ টাকা ঋণ দেয়; সুদসহ এই ঋণ ফেরত পাওয়ার নিশ্চয়তা নিয়েই তারা কার্যক্রম চালায়। এতে করে যারা হতদরিদ্র, তারা ঋণ পান না। একেবারে দরিদ্র মানুষদের ঋণের আওতায় আনতে এনজিওগুলোকে কাজ করতে হবে।”

অনুষ্ঠানে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগের সচিব খায়রুজ্জামান মজুমদার বলেন, “আমাদের দারিদ্র্য বেড়েছে—এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই। দারিদ্র্য বিলোপ করা না গেলেও প্রশমনের চেষ্টা অব্যাহত আছে।”

কোভিড-পরবর্তী সময়ে ক্ষণস্থায়ী দারিদ্র্য দূরীকরণে এসডিএফ ভালো করেছে উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, “আমরা কোভিডের সময় তাদের ভালো অঙ্কের গ্রান্ট দিয়েছিলাম। সেটি ভালোভাবে কাজে লাগিয়েছেন তারা। আগামী দিনেও তাদের নিয়ে কাজ করার পরিকল্পনা আছে।”

অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের (এফআইডি) সচিব নাজমা মোবারক বলেন, বাংলাদেশ দারিদ্র্য বিমোচনে একটি সংকটপূর্ণ অবস্থায় আছে। দারিদ্র্যসীমার নিচের অনেক জনগোষ্ঠী সামাজিক সুরক্ষা খাতের সেবা পাচ্ছেন না। এ খাতের পরিকল্পনাগত দুর্বলতা ও লক্ষ্য অনুযায়ী কাজের ঘাটতির কারণে দরিদ্র মানুষ সেবাবঞ্চিত থাকছেন।

জলবায়ু ঝুঁকির প্রসঙ্গ তুলে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) সচিব শাহরিয়ার কবির সিদ্দিকী বলেন, “এসডিএফের প্রকল্পে জলবায়ু–ঝুঁকির বিষয়টি মাথায় রাখতে হবে। জলবায়ুজনিত দুর্যোগে কোনো উপকারভোগী ক্ষতিগ্রস্ত হলে ভবিষ্যতে তার জন্য বীমা সুবিধার ব্যবস্থা রাখতে হবে।”

অনুষ্ঠানে এসডিএফের কার্যক্রম নিয়ে মূল উপস্থাপনা দেন থিঙ্কট্যাংক র‌্যাপিডের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আব্দুর রাজ্জাক। তিনি জানান, দেশের ৩৭ শতাংশ দরিদ্র মানুষ সরকারি সহায়তা পান, আর বাকি ৬৩ শতাংশ মানুষ সুবিধাবঞ্চিত থাকেন।

একইভাবে ২৭ শতাংশ দরিদ্র জনগোষ্ঠী বিভিন্ন এনজিও থেকে সহায়তা পেলেও বড় একটি অংশ এখনও যেকোনো সহায়তার বাইরে রয়ে গেছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।

অনুষ্ঠানের সমাপনী বক্তব্যে এসডিএফের চেয়ারম্যান মুহাম্মদ আব্দুল মজিদ বলেন, বাংলাদেশ বড় একটি পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে দেশ এগিয়ে যাবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।