১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক ও গ্রহণযোগ্য হবে এমন আশাবাদ ব্যক্ত করে অর্থনীতিবিদ মাহবুব উল্লাহ বুধবার জানিয়েছেন, সবকিছু ঠিক থাকলে ৬০ শতাংশের কম ভোট পড়ার কোনো কারণ নেই।

"আমি মনে করি এবারের নির্বাচনে ৬০ শতাংশের কম ভোট পড়বে না, এরচেয়ে বেশি ভোট পড়ার সম্ভাবনা আছে। যদিও বলা হয় ২০০৮ সালের ৮৭ শতাংশ ভোট বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। তবে সেই নির্বাচন ছিল প্রশ্নবিদ্ধ। আশা করি এবারের নির্বাচন হয়ে এমন কোনো সমালোচনা হবে না," বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচন নিয়ে রাজধানীর একটি হোটেলে ফাউন্ডেশন ফর স্ট্রাটেজিক অ্যান্ড ডেভলপমেন্ট স্টাডিজ (এফএসডিএস) আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে বলেন তিনি।

মাহবুব জানান, আওয়ামী লীগ ভোটের মাঠে নেই সে কারণে ভোট কম পড়তে পারে তা নিয়ে অনেকের মধ্যেই এক ধরণের দুশ্চিন্তা বিরাজ করছে। তবে যে হারে লাখ লাখ মানুষ ভোট দিতে ঢাকা ছেড়েছে তাতে করে মনে হচ্ছে না এবারের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ না থাকায় ভোটারদের ওপরে নেতিবাচক কোনো প্রভাব পড়বে।

পুরো দেশের মানুষ একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে উল্লেখ করে মাহবুব বলেন, "একটি সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনের পাশাপাশি নির্বাচনের ফলাফল দেয়ার পর রাজনৈতিক দলগুলোর বড় দায়িত্ব নির্বাচনের ফলাফল মেনে নেয়া। এই নির্বাচন নিয়ে দেশের মানুষের অনেক প্রত্যাশা। কোনোভাবে যেন আগামী সরকার দেশের মানুষের প্রত্যাশার ব্যত্যয় না ঘটায় সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে।"

আওয়ামী লীগের দীর্ঘ দেড় দশকের শাসনামলে দেশের অর্থনীতি, বিচার বিভাগ, প্রশাসনিক বিভাগ ধ্বংস হয়ে গেছে উল্লেখ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক এ অধ্যাপক বলেন, "নতুন সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে ধ্বংসপ্রাপ্ত এসব রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে পুনরুজ্জীবীত করা।"

কোনোভাবেই যেন নতুন সরকারের হাতে বাংলাদেশের স্বার্থ ক্ষুন্ন না হয় সেদিকে সর্বোচ্চ নজর দেয়ার আহ্বান জানিয়ে মাহবুব বলেন, "বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ক্ষুন্ন না করে আগামীর শুভ সূচনার লক্ষ্য নিয়ে নতুন সরকারকে কাজ করতে হবে।"

অনুষ্ঠানে বক্তারা বাংলাদেশের আগামীর অর্থনীতি নিয়ে নানামুখী শঙ্কা প্রকাশ করেন, যা নতুন সরকার দায়িত্ব নেয়ার পরপরই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। এ অবস্থায় সবার আগে অর্থনৈতিক কর্মপরিকল্পনা নির্ধারণের ওপরে জোর দেন তারা।

গ্রামীণ ব্যাংকের চেয়ারম্যান আব্দুল হান্নান চৌধুরী বলেন, "১৭ বছর ধরে বাংলাদেশে অর্থনৈতিক লুণ্ঠন চলায় এদেশের অর্থনীতি এখন ভঙ্গুর ও বিপর্যস্ত। প্রতিটি দল রাজনৈতিক ইশতেহারে বড় বড় পরিকল্পনার কথা বলেছে। কিন্তু সবার আগে অর্থনৈতিক সংযম পালন করতে হবে।"

ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন বাংলাদেশের চেয়ারম্যান আবু আহমেদ জানান, যদিও প্রচুর অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ আছে, কিন্তু নতুন সরকার সঠিক নীতি নিলে দেশের অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াতে সময় লাগবে না।

অনুষ্ঠানে নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা নির্বাচনের দিন এবং নির্বাচন পরবর্তী নিরাপত্তা জোরদারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তার পাশাপাশি সমগ্র দেশে নিরাপত্তাজনিত কোনো ঘটনা ঘটলে তা সামাল দেয়ার সক্ষমতা যাচাইয়ের ওপর জোর দেন তারা।

পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মাজহারুল হক বলেন, "নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে বড় ধরণের প্রস্তুতি থাকা জরুরি। যদি এ ধরণের প্রস্তুতি না থাকে নির্বাচনের সময় আইনশৃঙ্খলা সামাল দেয়া গেলেও ফলাফলের সময় অরাজক পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।"

শহরের পাশাপাশি গ্রামঞ্জলের নিরাপত্তার ওপরে জোর দিয়ে সাবেক রাষ্ট্রদূত মেজর জেনারেল (অব.) এম শাহেদুল হক বলেন, "৫ আগস্ট ২০২৪ সালে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর গ্রামে বড় রকমের মাফিয়াতন্ত্র তৈরি হয়েছে। গ্রামে সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজির পরিমাণ অনেক বেড়ে গেছে। সেদিকে নজর দিয়ে সুষ্ঠু নির্বাচন পরিচালনা করতে হবে।"

নির্বাচনের ফলাফলের পর পর সংখ্যালঘুদের ওপরে আঘাত আসতে পারে শঙ্কা করে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি হিসাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পালি ও বুদ্ধিষ্ট স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক সুকোমল বড়ুয়া বলেন, "সংখ্যালঘুদের ওপরে একটি আঘাত আসার শঙ্কা করছি আমরা। সরকার এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে যেকোনো মূল্যে এই আঘাত ঠেকাতে হবে।

অনুষ্ঠানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক  উপ-উপাচার্য অধ্যাপক আনোয়ারুল্লাহ চৌধুরী এবং এফএসডিএসের চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) ফজলে এলাহী আকবর একটি সুষ্ঠু, প্রতিযোগিতাপূর্ণ  ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের প্রত্যাশা করেন।