প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য গণভোটে যদি ‘হ্যাঁ’ ভোট বিজয়ী হয়, তাহলে বাংলাদেশে একটি মৌলিক রূপান্তর ঘটবে এবং দুঃশাসনের আর কোনো প্রত্যাবর্তন হবে না।
আজ তেজগাঁওয়ে তাঁর কার্যালয়ে জ্যেষ্ঠ সচিব ও সচিবদের সঙ্গে এক বৈঠকে তিনি এসব কথা বলেন। পরে বিকেলে ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে বৈঠক নিয়ে সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম।
ড. ইউনূস বলেন, ‘গণভোটে “হ্যাঁ” ভোট জয়ী হলে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ আরও ইতিবাচক ও টেকসই পথে নির্মিত হবে।’ তিনি আসন্ন জাতীয় নির্বাচন নিয়েও দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, নির্বাচন হবে অবাধ, সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর।
আগের নির্বাচনগুলোর প্রসঙ্গ টেনে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, অতীতের নির্বাচনগুলোকে প্রকৃত অর্থে নির্বাচন বলা কঠিন; সেগুলো ছিল ‘মক এক্সারসাইজ’ এবং ‘ভুয়া নির্বাচন’। এর বিপরীতে আসন্ন নির্বাচন হবে সম্পূর্ণ ভিন্ন—স্বচ্ছ, গ্রহণযোগ্য ও বিশ্বাসযোগ্য। তিনি বলেন, ‘আর মাত্র দুই দিন বাকি। দেশ প্রায় তার গন্তব্যে পৌঁছে গেছে।’
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, এই নির্বাচন ও গণভোট একসঙ্গে বাংলাদেশের রাজনৈতিক কাঠামোয় এক নজিরবিহীন পরিবর্তন আনবে। একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতির কথা তুলে ধরে তিনি জানান, প্রবাসী বাংলাদেশিদের প্রথমবারের মতো আনুষ্ঠানিকভাবে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। অতীতে রাজনৈতিক আন্দোলন ও গণঅভ্যুত্থানে তাঁদের ভূমিকার স্বীকৃতি দিয়ে ভবিষ্যতে জাতীয় জীবনে আরও কার্যকর ও অর্থবহ অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি করা হয়েছে।
নির্বাচনে প্রযুক্তির ব্যাপক ব্যবহারের ওপর গুরুত্বারোপ করে ড. ইউনূস বলেন, প্রযুক্তি পুরো নির্বাচন প্রক্রিয়াকে সহজ এবং আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক করেছে। ভোটারদের ভোটদানের নির্দেশনা দিতে একটি মোবাইল অ্যাপ তৈরি করা হয়েছে। একই সঙ্গে প্রায় ৪৩ হাজার ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণে বিভিন্ন নির্বাচন-সম্পর্কিত অ্যাপ ব্যবহার করা হচ্ছে।
তিনি জানান, ‘ইলেকশন বন্ধু’ উদ্যোগ চালু করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রায় ২৫ হাজার ৭০০ সদস্যকে বডি-ক্যাম সরবরাহ করা হয়েছে এবং ভোটকেন্দ্রগুলোতে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হচ্ছে।
প্রধান উপদেষ্টা আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, এই নির্বাচন বাংলাদেশের ইতিহাসে আগের যেকোনো নির্বাচনের চেয়ে ভালো হবে। বিভিন্ন দেশ থেকে বিপুলসংখ্যক আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকের আগমন বাংলাদেশের গণতন্ত্রের প্রতি নতুন করে বৈশ্বিক আস্থার প্রতিফলন এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় যে এই নির্বাচনকে গুরুত্ব দিচ্ছে, তার স্পষ্ট প্রমাণ।
তিনি বলেন, সাবেক হাসিনা সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত আগের তিনটি নির্বাচন ছিল গ্রহণযোগ্যতাহীন এবং সেসব নির্বাচনে বিশ্বাসযোগ্য আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের উপস্থিতি ছিল না।
নির্বাচন ঘিরে সার্বিক পরিস্থিতি প্রসঙ্গে ড. ইউনূস বলেন, এখন পর্যন্ত কোনো উল্লেখযোগ্য উত্তেজনা নেই। সারা দেশে শান্তিপূর্ণভাবে নির্বাচনী প্রচারণা চলছে, রাজনৈতিক দলগুলো দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করছে এবং বড় বড় জনসভা অনুষ্ঠিত হচ্ছে কোনো সহিংসতা বা বিশৃঙ্খলা ছাড়াই।
গত ১৮ মাসে সরকারের কার্যক্রমে সহযোগিতার জন্য সচিবদের ধন্যবাদ জানিয়ে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, এই সময়ে জারি করা প্রায় ১৩০টি অধ্যাদেশ দ্রুত বাস্তবায়নে তাঁদের সমর্থন ও দক্ষতা সরকারের কাজে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
ভবিষ্যতের পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে ড. ইউনূস বলেন, বাংলাদেশ সামনে এগিয়ে যাবে এবং বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করে দেশে নতুন নতুন শিল্পকারখানা স্থাপন করবে। তিনি দেশের তরুণ জনগোষ্ঠীকে একটি বিশাল ও শক্তিশালী সম্পদ হিসেবে উল্লেখ করেন।
জাপান-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বাংলাদেশে বিনিয়োগের মাধ্যমে শুল্কমুক্ত ও অগ্রাধিকারমূলক বাজার সুবিধা পাওয়া গেলে অনেক বিদেশি প্রতিষ্ঠান এখানে উৎপাদন স্থাপনে আগ্রহী হবে। এ ধরনের চুক্তি অর্থনীতির জন্য নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে এবং বাংলাদেশের পণ্যের জন্য আরও বিস্তৃত সুযোগ সৃষ্টি করবে।
পূর্বের পোস্ট :