বাংলাদেশের জনগণ কাকে ভোট দিবেন তা ইতোমধ্যে গোপনে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন এবং বৃহস্পতিবার ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে সেই মহান কাজটি করবেন বলে রোববার আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক ও ঢাকা-১১ আসনের জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটের প্রার্থী নাহিদ ইসলাম।
সোমবার বাংলাদেশ টেলিভিশনে জাতির উদ্দেশ্যে দেয়া এক ভাষণে নাহিদ বলেন, "আমি মনে করি, জনগণ তুলনামূলকভাবে ভালো একটি পক্ষ খুঁজে তাকে ভোট দেওয়ার গোপনে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে। বাংলাদেশের বুদ্ধিদীপ্ত, সতাকাঙ্ক্ষী ও স্বপ্নবান মানুষ আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি বৃহস্পতিবার সঙ্গোপনে এই মহান কর্মটি সম্পাদন করে ফেলবেন, ইনশাআল্লাহ।"
বক্তব্যের শেষাংশে একটি রাজনৈতিক দলকে দোষারোপ করে নাহিদ জানান, শেখ হাসিনার পতনের পর সরকার গঠন করে প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রী হয়নি কোনো রাজনৈতিক দলের নেতারা। গণঅভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারী সকল দলই রাষ্ট্রক্ষমতার বাইরেই থেকেছে।
কিন্তু দুর্বৃত্তপরায়ণ একটি দলের নেতা, কর্মী ও সংগঠকরা, পুরো রাষ্ট্রযন্ত্রকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে তা চাঁদাবাজি, দখল, নিয়োগ ও বদলি, পদায়ন ও পদোন্নতি, মিথ্যা মামলা, বিচারের রায় কেনাবেচাসহ বিভিন্ন ধরনের দুর্নীতি ও নির্যাতনের মাধ্যম হিসাবে ব্যবহার করে ব্যাপক অর্থ লোপাট করেছে বলে অভিযোগ তোলেন তিনি।
"এই দুর্বৃত্তদের ওপর কোথাও কার কোনো নিয়ন্ত্রণ না থাকায় দলটি বিজয়ী হলে, তা দেশবাসীর জন্য ভয়ংকর পরিণতি বয়ে নিয়ে আসবে," এ বিষয়টি এতদিনের অভিজ্ঞতা থেকে ভোটাররা বুঝে গেছেন বলে জানান নাহিদ।
নাহিদ তার বক্তব্যে বিজয়ী হলে জনগণকে দেয়া ১৭ অঙ্গীকার বাস্তবায়নের আশ্বাস দিয়েছেন। এরমধ্যে প্রথম অঙ্গীকারেই আছে আওয়ামী লীগের সময়ে সংঘটিত গুম-খুন, নির্যাতন, মিথ্যা মামলা ও হামলার বিচার করা।
অন্তবর্তীকালীন সরকারের সময়ে সেনাবাহিনীকে মেজিস্ট্রেসি ক্ষমতা দেয়া হলেও তারা সফল হোননি বলে দাবি করেছেন নাহিদ। "সকল অপরাধীকে গ্রেফতার ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের জন্য মেজিস্ট্রেসি ক্ষমতা দিয়ে সারাদেশে সশস্ত্র বাহিনীকে নামানো হয়েছে। কিন্তু সুপিরিয়র কামান্ডের অনাগ্রহের কারণে তারা কোনো কার্যকর ভূমিকা পালন করেনি। ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট’ শুরু হলেও অপরাধীদের শনাক্ত করা, অস্ত্র উদ্ধার, গ্রেফতারের মতো কোনো উল্লেখযোগ্য কাজ হয়নি।"
এছাড়া ক্ষমতা আসলে আওয়ামী লীগের সময়ে ব্যাংক ও উন্নয়ন প্রকল্পে লোপাট হওয়া অর্থ উদ্ধার ও অর্থ পাচারকারীদের বিচার করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন নাহিদ। "আমাদের লক্ষ্য খুবই স্পষ্ট— ঘুষ, দুর্নীতি ও রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুটপাটের সংস্কৃতির অবসান ঘটিয়ে অর্থনৈতিক বৈষম্য বিলোপের মাধ্যমে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা এবং রাষ্ট্রের সম্পদ জনগণের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া।"
১১ দলীয় জোট ক্ষমতায় আসলে পররাষ্ট্রনীতিতে আমূল পরিবর্তন আনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন নাহিদ। নতজানু কূটনীতি থেকে স্বাধীন ও ভারসাম্যপূর্ণ বৈশ্বিক অবস্থান তৈরির আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন তিনি। "সবার সাথে বন্ধুত্ব, কারো সাথে শত্রুতা নয়— এই স্লোগান আওড়ালেও বাস্তবে হাসিনার পররাষ্ট্রনীতি ছিল ইন্ডিয়ার নির্দেশ পালন করা। সে কারণে পাকিস্তানের প্রতি সর্বক্ষেত্রে বৈরি আচরণ করা হতো। বাস্তবে বাংলাদেশকে বৈশ্বিক পরিসরে ইন্ডিয়ার পুতুল রাষ্ট্রে পরিণত করেছিল তারা। তখন ঢাকার এই ফ্যাসিস্ট শাসকরা মনে করত দিল্লি তাদের ঔপনেবেশিক শাসনের কেন্দ্র। সে সময় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের অবস্থান খুবই দুর্বল হয়ে পড়েছিল তাতে আমাদের জাতীয় স্বার্থ ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।"
নাহিদ দেশের সশস্ত্র বাহিনীকে ঢেলে সাজানোর প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন তার বক্তব্যে। জানিয়েছেন, বর্তমান কাঠামোতে ডিফেন্স বাজেটের প্রায় ৭০ শতাংশই কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতায় ব্যয় হয়, যা দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রের জন্য একটি অকার্যকর ও অস্থিতিশীল ব্যবস্থা হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিরক্ষা খাতকে কার্যকর ও ভবিষ্যৎমুখী করতে হলে এই কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা দূর করা জরুরি।
"দেশের সকল ১৮ ঊর্ধ্ব সক্ষম তরুণ-তরুণীর জন্য বাধ্যতামূলক মিলেটারি ট্রেনিং চালু করা হবে, এতে দেশব্যাপী জনভিত্তি সম্পন্ন এক গণপ্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে উঠবে। ফলে আধিপত্যবাদী শক্তির বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় প্রতিরোধ সক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে এবং দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রের বিনিয়োগকৃত অর্থের অপচয় কমবে," বলেন নাহিদ।
ক্ষমতায় আসলে পুলিশ বাহিনীতে ব্যাপক পরিবর্তন আনার কথা বলেছেন নাহিদ। আওয়ামী লীগের আমলে ১৫ বছর ধরে যেসব পুলিশ কর্মকর্তা ও সদস্য হত্যা, নির্যাতন, জুলুম, মিথ্যা মামলা, দস্যুবৃত্তি করে অর্থ লোপাট ও ঘুষ দুর্নীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিল— তাদের প্রত্যেককেই বিচারের আওতায় আনা হবে বলে জানিয়েছেন তিনি।
পুলিশ বাহিনীর নাম বদলানো ও কাঠামো পরিবর্তন করা হবে জানিয়ে নাহিদ বলেন, "পুলিশ বাহিনীর বিদ্যমান কেন্দ্রীয় কাঠামো ভেঙে একে স্থানীয় সরকার পর্যায়ে পুনর্গঠন করা হবে। উপজেলা পর্যায় থেকে নিয়োগ এবং সেখানেই পদায়ন করা হবে। এ ক্ষেত্রে সমান সংখ্যক নারী-পুরুষ নিয়োগ পাবে। পুলিশ বাহিনীর নাম পরিবর্তন করে ‘জনসেবক বাহনী’ বা অন্যকিছু রাখা হবে।"
নিম্ন আদালত থেকে সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত সকল স্তরে ন্যায়পরায়ণ, দক্ষ ও শিক্ষিত বিচারক নিয়োগ করে পুরো বিচার ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে হবে উল্লেখ করে নাহিদ বলেন, "বিচারকের সংখ্যা বহুগুণে বাড়াতে হবে, পুরোপুরি ডিজিটাল ব্যবস্থাপনার আওতায় আনতে হবে, ঘুষ দুর্নীতি নির্ভর রায় বেচা-কেনার চলমান আয়োজন ভেঙে ফেলতে হবে। রাষ্ট্রে ও সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হলে এদেশ এগিয়ে যাবে। এটাই এনসিপির অঙ্গীকার।"
এছাড়াও ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণ, দ্রব্যমূল্যের দাম কমানো, ভেজাল রোধ, নারীর সমতা, সংখ্যালঘুর অধিকার, স্বাস্থ্য ও চিকিৎসার উন্নয়নের নানামুখী প্রতিশ্রুতি দিয়ে নাহিদ ১১ দলীয় জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটের পক্ষে ভোট চেয়ে বক্তব্য শেষ করেছেন।
পূর্বের পোস্ট :