২০২৪ সালে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সংঘটিত মানবতা বিরোধী অপরাধে এখন পর্যন্ত অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে ৬৬৩ মামলা হয়েছে, যার মধশে ৪৫৩ হত্যা মামলা বলে সোমবার জানিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)।

সকালে ধানমন্ডি টিআইবি কার্যালয়ে প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদনে জুলাই অভ্যুত্থানে সংঘটিত মানবতা বিরোধী অপরাধে করা মামলার অগ্রগতি ও সীমাবদ্ধতার নানা দিক তুলে ধরা হয়।

গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৯ নভেম্বর ২০২৫ সাল পর্যন্ত জুলাই অভ্যুত্থানে মানবতা বিরোধী অপরাধের বিরুদ্ধে ১৭৮৫ মামলা হয়েছে। এসব মামলার মধ্যে শেখ হাসিনা ৬৬৩ মামলার আসামী। মোট হত্যা মামলা হয়েছে ৭৩৬, যেখানে শেখ হাসিনা ৪৫৩ মামলার আসামী।

মামলার অগ্রগতি প্রসঙ্গে টিআইবির গবেষণায় বলা হয়, ১০৬ মামলার চার্জশিট দাখিল হয়েছে। এরমধ্যে হত্যা মামলার চার্জশিট ৩১।

এসব মামলায় আওয়ামী লীগ সরকারের ১২৮ জন সাবেক মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের (এমপি) গ্রেফতার করা হয়েছে।

টিআইবি জানায়, একই ঘটনায় পুলিশের বিরুদ্ধে ৭৬১ মামলা হয়েছে, যেখানে আসামী ১১৬৮ বর্তমান ও সাবেক পুলিশ সদস্য। এদের মধ্যে ৬১ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালে (আইসিটি) ৪৫০ অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে। এসব অভিযোগের মধ্যে আমলে নিয়ে ৪৫ মামলা হয়েছে। আইসিটিতে দায়ের করা মামলার আসামী ২০৯ জন, গ্রেফতার হয়েছে ৮৪ জন।

বর্তমানে আইসিটিতে ১২ মামলা বিচারাধীন আছে, যেখানে মোট অভিযুক্ত ১০৫ জন। মামলার অনেক আসামিই দেশ থেকে পালিয়ে গেছে। এদের পালিয়ে যেতে দিতে সরাসরি সেনাবাহিনী, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও স্থানীয় রাজনীতিবিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে বলে টিআইবির গবেষণায় উঠে এসেছে।

জুলাই অভ্যুত্থানকে কেন্দ্র করে ঢালাওভাবে মামলা দেয়া হয়েছে এবং দেদারসে মামলায় মানুষকে আসামি করা হয়েছে বলে জানায় টিআইবি। দেশের দেড় লাখ মানুষ এসব মামলার আসামি বলে গবেষণায় উঠে এসেছে।

প্রকট মামলা বাণিজ্য, প্রতিশোধপয়াণতা, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে শায়েস্তা করা মামলার ভয় দেখিয়ে বা আসামি করে অব্যাহতি বিনিময়ে চাঁদাবাজির মতো ঘটনার অহরহ অভিযোগ উঠেছে বলে জানিয়েছে টিআইবি।

এছাড়া অনেক ক্ষেত্রেই চাপের মুখে তদন্ত না করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মামলা গ্রহণ করেছেন। পাশাপাশি আইসিটিতে নিয়োগকৃত বিচারক ও কৌসুলিদের দক্ষতা ও রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা নিয়েও প্রশ্নবিদ্ধ অবস্থান আছে বলে জানায় টিআইবি।

বিচারপ্রক্রিয়া শুরু এবং কিছু ক্ষেত্রে অগ্রগতি হলেও ঢালাও মামলা, অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অপরাধের ধরন অনুযায়ী সুনির্দিষ্ট মামলা না দেওয়ার ফলে মামলার ভিত্তি দুর্বল হওয়া; মামলার প্রতিবেদন তৈরিতে চ্যালেঞ্জ-পদ্ধতিগত জটিলতা ও ঘটনার পরিষ্কার চিত্র নেই বলে জানিয়েছে টিআইবি।

কিছু কিছু বিভাগীয় পদক্ষেপের বাইরে বাস্তবে পুলিশের বিরুদ্ধে কোনো কার্যকর জবাবদিহির অগ্রগতি না থাকা-সরকারের সদিচ্ছা ও সক্ষমতার ঘাটতি এবং আইনি প্রক্রিয়া লঙ্ঘন করে গ্রেপ্তার ও রিমান্ডের পুরনো ধারা বিদ্যমান অযৌক্তিক মামলা দায়ের ও বিনা বিচারে আটক, মামলায় জামিনযোগ্য হলেও জামিন না দিয়ে দীর্ঘদিন আটকে রাখা, ক্ষেত্রেবিশেষে সরকারি প্রভাব; সাংবাদিক ও পেশাজীবীদের হত্যা মামলার আসামী করার মতো ঘটনা ঘটেছে বলে গবেষণা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

বিচারের রায় ঘোষণা সরাসরি সম্প্রসারণ করার ইতিবাচক দৃষ্টান্ত দেখা গেলেও পুরোপুরি ন্যায্য ও আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে বিচারকার্য সম্পাদন ও বিচারের রায় দেওয়ার ক্ষেত্রে সমালোচনা হয়েছে এবং বিচার প্রক্রিয়ায় দুর্বলতার কারণে প্রকৃত অপরাধীদের ন্যায়বিচার প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ার ঝুঁকি আছে বলে জানায় টিআইবি।