জুলাই আন্দোলন চলাকালে রাজধানীর মোহাম্মদপুরে ট্রাকচালক হোসেন হত্যার ঘটনায় দায়ের করা মামলায় সম্প্রতি অভিযোগপত্র দাখিল করেছে পুলিশ। অভিযোগপত্রে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ৩৪ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে।
বিচার প্রক্রিয়া চলার মধ্যে মামলার বাদী ও নিহত হোসেনের মা রীনা বেগম অভিযোগ করেছেন, ছেলের মৃত্যুর পর স্থানীয় সাংসদ জাহাঙ্গীর কবির নানক, সাবেক কাউন্সিলর রাজীবসহ কয়েকজনের কাছে সাহায্য চেয়েও কোনো সহযোগিতা পাননি। শেখ হাসিনার সঙ্গে দেখা করার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন তিনি। রীনা বেগমের ভাষ্য, নানক ও রাজীবরা সহযোগিতার হাত বাড়ালে তিনি আর মামলা করতেন না।
জুলাই আন্দোলনের সময় ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই মোহাম্মদপুরে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান হোসেন। ওই ঘটনায় সাজ্জাদ ও শাহিন নামে আরও দুই ব্যক্তি আহত হন। হোসেনের মৃত্যুর এক মাসেরও বেশি সময় পর, ৩১ আগস্ট, শেখ হাসিনাসহ ১৬ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেন তার মা।
মামলাটি তদন্ত শেষে মোহাম্মদপুর থানার এসআই আকরামুজ্জামান গত ২৩ নভেম্বর আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেন। এতে শেখ হাসিনাসহ মোট ৩৪ জনকে অভিযুক্ত করা হয়। গত ২২ ডিসেম্বর ঢাকার মহানগর হাকিম হাসিব উল্লাহ পিয়াস অভিযোগপত্রটি ‘দেখেছেন’ বলে জানান প্রসিকিউশন বিভাগের এসআই মিজানুর রহমান।
অভিযুক্তদের মধ্যে রয়েছেন—আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাছান মাহমুদ, সাবেক মন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানক, সাবেক প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক, সাবেক সাংসদ সাদেক খান, নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ ইনানসহ আরও অনেকে।
অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, তদন্তকালে পাওয়া সাক্ষ্য-প্রমাণ ও জব্দ করা আলামতের ভিত্তিতে স্পষ্ট হয়েছে—আসামিরা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন দমনে নিরস্ত্র ছাত্র-জনতার ওপর হামলা ও হত্যার নির্দেশ দেন। আন্দোলন দমনে তারা গণভবন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বাসভবনসহ বিভিন্ন সরকারি স্থানে ষড়যন্ত্রমূলক বৈঠক করেন এবং সর্বশক্তি প্রয়োগের সিদ্ধান্ত নেন।
অভিযোগপত্র অনুযায়ী, শেখ হাসিনা, ওবায়দুল কাদের, আসাদুজ্জামান খান কামাল, হাছান মাহমুদ, জাহাঙ্গীর কবির নানক, সাদ্দাম হোসেন, আসিফ ইনান ও জুনাইদ আহমেদ পলকসহ কয়েকজন আন্দোলন দমনে জনসম্মুখে উস্কানিমূলক ও আক্রমণাত্মক বক্তব্য দেন। তাদের নির্দেশনায় আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের গুলিতে হোসেন নিহত হন এবং শাহিন ও জিহাদ আহত হন।
আসামিদের মধ্যে সাদেক খান, পলক, শাহজাহান খান ও ফুরকান বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন। পারভেজ, সোহেল, সলু, ইরফান, বদিউল, রাসেল, সাজ্জাদ, সুমন, মিলন ও ফারুক হোসেন জামিনে আছেন। শেখ হাসিনাসহ ২০ জন আসামি পলাতক বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
পলকের আইনজীবী তরিকুল ইসলাম বলেন, ‘যেহেতু অভিযোগপত্র এসেছে, অভিযোগ গঠনের সময় আমরা তার অব্যাহতির আবেদন করব। আদালত অব্যাহতি দিলে মামলার কার্যক্রম শেষ হবে। আর অভিযোগ গঠন হলে আইনি লড়াইয়ের মাধ্যমে তাকে নির্দোষ প্রমাণে সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হবে।’
নিহত হোসেনের মা রীনা বেগম বলেন, তিন ছেলে ও এক মেয়ের মধ্যে হোসেন ছিল মেঝ। মায়ের দেখভাল করতেন তিনিই। ‘ছেলেটা চলে যাওয়ার পর অনেক কষ্টে আছি। বড় ছেলে দিনমজুর, ছোটো ছেলে প্রতিবন্ধী, মেয়েটা পড়াশোনা করছে। আমি অসুস্থ, কাজ করতে পারি না। সংসার চালানো কঠিন হয়ে গেছে।’
বিচার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘বিচার ছাড়া আর কী চাইব? যারা আমার ছেলেকে আমার কাছ থেকে কেড়ে নিয়েছে, তাদের সর্বোচ্চ সাজা হোক।’
হোসেনের সাত ও পাঁচ বছর বয়সী দুটি কন্যাসন্তান রয়েছে। তারা বর্তমানে মায়ের সঙ্গে গাজীপুরে তার বাবা-মায়ের বাড়িতে থাকছে। হোসেনের মৃত্যুর পর পরিবারটি এখন পর্যন্ত ১৫ লাখ টাকা সহায়তা পেয়েছে। এর মধ্যে সাড়ে তিন লাখ টাকা রীনা বেগম পেয়েছেন, বাকি টাকা পেয়েছেন হোসেনের স্ত্রী।
পূর্বের পোস্ট :