চট্টগ্রামের বিএনপি ও জামায়াতের বেশির ভাগ প্রার্থী আসন্ন ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে ব্যক্তিগত আয়ের বাইরে স্বজন ও শুভানুধ্যায়ীদের কাছ থেকে নেওয়া ‘ধার’ ও ‘দানের’ টাকায় নির্বাচনি ব্যয় নির্বাহ করবেন বলে নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া হলফনামা ও ব্যয়ের উৎস বিবরণীতে উল্লেখ করেছেন।

চট্টগ্রাম জেলার সংসদীয় ১৬টি আসনে বিএনপির ১৭ প্রার্থীর মধ্যে সাতজন ছাড়া বাকিরা জানিয়েছেন, নিজেদের অর্থের পাশাপাশি স্বজনদের কাছ থেকে নেওয়া ‘ধার’ ও ‘দানের’ অর্থেই তাদের নির্বাচনি ব্যয় মেটানো হবে। অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামীর ১৪ প্রার্থীর অধিকাংশই স্বজন ছাড়াও ‘শুভানুধ্যায়ীদের দানের’ টাকায় ভোটের খরচ চালানোর তথ্য দিয়েছেন।

তফসিল অনুযায়ী, ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের ভোটগ্রহণ হবে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি। একই দিন গণভোটও অনুষ্ঠিত হবে। বর্তমানে মনোনয়নপত্র যাচাই–বাছাই শেষে আপিল আবেদন গ্রহণ চলছে।

তফসিল ঘোষণার পর মনোনয়নপত্র সংগ্রহ থেকে ভোটগ্রহণ পর্যন্ত সম্ভাব্য সব ব্যয়ের হিসাব রিটার্নিং অফিসারের কাছে জমা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। নির্ধারিত ব্যয়সীমার মধ্যেই এসব খরচ দেখাতে হয়। নির্বাচনি আইনে রাজনৈতিক দলগুলোর জন্যও ব্যয়সীমা নির্ধারিত আছে।

গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ সংশোধনের মাধ্যমে এবার সংসদ নির্বাচনে ভোটারপ্রতি ১০ টাকা ব্যয় নির্ধারণ করে প্রার্থীর ব্যয়সীমা বাড়ানো হয়েছে। ৩০০ আসনের মধ্যে সর্বনিম্ন ভোটার ঝালকাঠি–১ আসনে ২ লাখ ২৮ হাজার ৪৩১ জন এবং সর্বোচ্চ ভোটার গাজীপুর–২ আসনে ৮ লাখ ৪ হাজারের বেশি।

মনোনয়নপত্রের সঙ্গে জমা দেওয়া প্রার্থীদের হলফনামা ও সম্ভাব্য ব্যয়ের উৎস নির্বাচন কমিশন তাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করেছে। সেসব তথ্য পর্যালোচনায় দেখা গেছে, দুই দলের অধিকাংশ প্রার্থী স্ত্রী, সন্তান ও নিকটাত্মীয়দের কাছ থেকে ‘ধার’ বা ‘অনুদান’ নিয়ে নির্বাচনি ব্যয় নির্বাহ করবেন।

চট্টগ্রামের আসনগুলোর মধ্যে লোহাগাড়া উপজেলা ও সাতকানিয়া উপজেলার আংশিক এলাকা নিয়ে গঠিত চট্টগ্রাম–১৫ আসনে বিএনপি ও জামায়াতের প্রার্থীরা সবচেয়ে বেশি ব্যয়ের হিসাব দিয়েছেন। এ আসনে মোট ভোটার ৫ লাখ ৬ হাজার ২৫৯ জন।

এখানে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী সাবেক সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরী সম্ভাব্য ব্যয় দেখিয়েছেন ৫০ লাখ ৬২ হাজার টাকা। বিএনপি প্রার্থী নাজমুল মোস্তফা আমীন ব্যয় ধরেছেন ৫০ লাখ ৫৮ হাজার ৪৩০ টাকা।

শাহজাহান চৌধুরী ব্যয়ের উৎস হিসেবে নিজের আয় থেকে ১০ লাখ ৬২ হাজার ৫৯০ টাকা, প্রবাসী দুই ভাইয়ের কাছ থেকে ১৮ লাখ, ভায়রার কাছ থেকে ৬ লাখ এবং তিন ‘শুভানুধ্যায়ী’র কাছ থেকে মোট ১৬ লাখ টাকা ‘দান’ পাওয়ার তথ্য দিয়েছেন।

অন্যদিকে নাজমুল মোস্তফা আমীন জানিয়েছেন, তার ব্যয়ের ১৫ লাখ টাকা আসবে ব্যবসার আয় থেকে, স্ত্রীর স্বর্ণ বিক্রি করে ২০ লাখ এবং ব্যবসায়ী ছেলের কাছ থেকে ১৫ লাখ ৫৮ হাজার ৪৩০ টাকা পাওয়া যাবে।

চট্টগ্রাম–১ (মিরসরাই) আসনে বিএনপি প্রার্থী নুরুল আমিন ৩০ লাখ টাকা ব্যয়ের কথা বলেছেন। এর মধ্যে ১০ লাখ নিজের এবং ২০ লাখ টাকা জামাতার কাছ থেকে ‘ধার’ নেওয়া হবে। এ আসনে জামায়াত প্রার্থী ছাইফুর রহমান সম্ভাব্য ব্যয় ধরেছেন ১৫ লাখ টাকা, যার বড় অংশই আত্মীয় ও শুভানুধ্যায়ীদের কাছ থেকে ‘দান’ ও ‘ধার’।

চট্টগ্রাম–২ (ফটিকছড়ি) আসনে বিএনপি প্রার্থী সরোয়ার আলম নিজের ব্যাংক জমা ও প্রতিষ্ঠান থেকে ৪৮ লাখ টাকা ব্যয়ের কথা জানিয়েছেন। জামায়াত প্রার্থী মোহাম্মদ নুরুল আমিন জমানো টাকা, স্ত্রী–সন্তান ও শুভানুধ্যায়ীদের কাছ থেকে পাওয়া অর্থে ব্যয় নির্বাহের তথ্য দিয়েছেন।

চট্টগ্রাম–৩ (সন্দ্বীপ) আসনে জামায়াত প্রার্থী মুহাম্মদ আলাউদ্দীন সিকদার ২৪ লাখ টাকা এবং বিএনপি প্রার্থী মোস্তফা কামাল পাশা ১৫ লাখ টাকা ব্যয়ের হিসাব দিয়েছেন।

চট্টগ্রাম–৪ (সীতাকুণ্ড ও নগরীর আংশিক এলাকা) আসনে বিএনপি প্রার্থী আসলাম চৌধুরী নিজের ব্যবসার আয় ও স্ত্রীর কাছ থেকে নেওয়া ‘ধার’সহ ব্যয়ের তথ্য দিয়েছেন। জামায়াত প্রার্থী মো. আনোয়ার ছিদ্দিক আত্মীয় ও শুভানুধ্যায়ীদের কাছ থেকে অর্থ পাওয়ার কথা জানিয়েছেন।

এভাবে চট্টগ্রামের প্রায় সব আসনেই বিএনপি ও জামায়াতের প্রার্থীদের ব্যয়ের বড় অংশ আসছে স্বজন, আত্মীয় ও শুভানুধ্যায়ীদের কাছ থেকে নেওয়া ‘ধার’ ও ‘দানের’ টাকা থেকে—যা নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া ব্যয়ের উৎস বিবরণীতেই উঠে এসেছে।