দেশে ক্লাউড সার্ভিস, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও সফটওয়্যারভিত্তিক প্রতিষ্ঠানের দ্রুত সম্প্রসারণের প্রেক্ষাপটে আগামী এক বছরের মধ্যে বাংলাদেশে একটি বড় ডাটা সেন্টার স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে সামিট গ্রুপ। এ ক্ষেত্রে বিদেশি কোনো বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করার পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানিয়েছেন গ্রুপটির চেয়ারম্যান আজিজ খান।
আজিজ খান জানান, ডাটা সেন্টারের বিদ্যুৎ সরবরাহকারী হিসেবে কাজ করবে সামিট গ্রুপেরই প্রতিষ্ঠান সামিট পাওয়ার ইন্টারন্যাশনাল, যা দেশের সবচেয়ে বড় বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান। গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সক্ষমতা কাজে লাগিয়ে ডাটা সেন্টারটি আধুনিক মানে গড়ে তোলা হবে।
জাপানের সংবাদমাধ্যম নিক্কেই এশিয়াকে দেওয়া এক অনলাইন সাক্ষাৎকারে আজিজ খান বলেন, ‘সামিট গ্রুপের ভবিষ্যৎ মূল লক্ষ্য জ্বালানি ও ডাটা প্রবৃদ্ধি। এর মাধ্যমে দেশের এলএনজি খাত এবং ফাইবার অপটিক অবকাঠামোকে শক্তিশালী করা হবে।’
বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের প্রায় ৭ শতাংশ বিদ্যুৎ সামিট গ্রুপ সরবরাহ করে। প্রতিষ্ঠানটির ১০টি গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ও ৫টি অন্যান্য বিদ্যুৎকেন্দ্রের মাধ্যমে এ চাহিদা পূরণ করা হয়। পাশাপাশি ইন্টারনেট খাতে সামিট গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান সামিট কমিউনিকেশন দেশের মোট ইন্টারনেট ব্যান্ডউইথের অর্ধেকের বেশি সরবরাহ করছে। বিশেষ করে ফাইবার অপটিক ইন্টারনেট সেবায় প্রতিষ্ঠানটি শীর্ষস্থানীয়।
জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সি (জাইকা) জানিয়েছে, বাংলাদেশে ইন্টারনেট ও স্মার্টফোন ব্যবহারকারীর সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। এর ফলে ক্লাউড সার্ভিস, মোবাইল অ্যাপ ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক সেবার চাহিদাও দ্রুত বাড়ছে। এই বাস্তবতায় দেশে একটি পূর্ণাঙ্গ ডাটা সেন্টার স্থাপন সময়ের দাবি।
২০২৪ সালে সরকার পার্সোনাল ডাটা প্রোটেকশন অর্ডিন্যান্স জারি করার পর দেশের সামষ্টিক ও ব্যক্তিগত তথ্য বিদেশে পাঠানোর সুযোগ সীমিত হয়েছে। তবে পর্যাপ্ত ডাটা সেন্টারের অভাবে এখনো অনেক তথ্য বিদেশি করপোরেট প্রতিষ্ঠানের সার্ভারে সংরক্ষিত হচ্ছে। এ কারণে দেশের ভেতর নিজস্ব ডাটা সেন্টার গড়ে তোলা হলে তথ্য সুরক্ষায় তা ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে বলে মনে করে জাইকা।
সংস্থাটি আরও জানিয়েছে, বর্তমান রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে ডাটা সেন্টার খাতে বেসরকারি বিনিয়োগ পাওয়া চ্যালেঞ্জিং হলেও দেশীয় কোনো বড় প্রতিষ্ঠান এগিয়ে এলে বাংলাদেশে ডাটা সেন্টার স্থাপন অসম্ভব নয়।
সামিট গ্রুপ বর্তমানে ডাটা সেন্টার প্রকল্পে একটি নির্ভরযোগ্য বিদেশি ব্যবসায়িক অংশীদার খুঁজছে। যেসব প্রতিষ্ঠানের ডাটা সেন্টার নির্মাণ ও বিপণনে অভিজ্ঞতা রয়েছে, তাদের সঙ্গেই কাজ করতে আগ্রহী বলে জানান আজিজ খান।
তিনি বলেন, ‘টেক দুনিয়ার সাতটি বড় প্রতিষ্ঠান—অ্যালফাবেট, মাইক্রোসফট, টেসলা, এনভিডিয়া, অ্যাপল, অ্যামাজন ও মেটা প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ হয়েছে। এর মধ্যে কয়েকটি প্রতিষ্ঠান যৌথভাবে কাজ করার আগ্রহ দেখিয়েছে। এ বছরের মধ্যেই অংশীদার চূড়ান্ত করা হবে।’
প্রাথমিকভাবে ঢাকার কাছাকাছি সামিটের গ্যাস প্ল্যান্টসংলগ্ন এলাকায় ডাটা সেন্টার স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। গ্রুপের নিজস্ব জমি ও অবকাঠামো ব্যবহার করেই এটি পরিচালনা করা হবে।
আজিজ খান বলেন, ‘একটি ডাটা সেন্টারের জন্য বিদ্যুৎ, ফাইবার অপটিক সংযোগ ও জমি—এই তিনটি বিষয় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এই তিনটিই সামিটের রয়েছে। যদিও পূর্ণাঙ্গ ডাটা সেন্টার গড়ে তুলতে কয়েক বছর সময় লাগবে, তবে দেড় বছরের মধ্যে গ্রাহকদের জন্য সেবা চালু করতে পারব।’
তবে ডাটা সেন্টার পরিচালনায় বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ প্রয়োজন হওয়ায় নবায়নযোগ্য জ্বালানির লক্ষ্য অর্জনে বাংলাদেশ কিছুটা পিছিয়ে পড়তে পারে—এমন আশঙ্কাও রয়েছে। এ বিষয়ে সামিট গ্রুপের বক্তব্য, বৈশ্বিক বাস্তবতা দ্রুত বদলাচ্ছে এবং বাংলাদেশকেও সেই পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নিতে হবে।
আজিজ খান জানান, দুই বছর আগেও ২০৫০ সালের মধ্যে গ্রুপটির সব হাইড্রোকার্বনভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ করার পরিকল্পনা ছিল। তবে দেশীয় ও বৈশ্বিক বাস্তবতা বিবেচনায় আপাতত তা সম্ভব হচ্ছে না।
তিনি আরও বলেন, ‘ভারত, নেপাল ও ভুটানে বিনিয়োগের মাধ্যমে সৌর ও জলবিদ্যুৎ উৎপাদন করে বাংলাদেশে পরিচ্ছন্ন জ্বালানি আমদানির পরিকল্পনা এখনো রয়েছে। তবে বর্তমানে ভারত–বাংলাদেশ সম্পর্কের টানাপোড়েন এই উদ্যোগ বাস্তবায়নে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।’
আগামী জাতীয় নির্বাচনের আগে বিনিয়োগ পরিস্থিতি চ্যালেঞ্জিং হলেও সামিট গ্রুপ যেকোনো অবস্থায় বাংলাদেশে কাজ চালিয়ে যেতে আগ্রহী বলে জানান আজিজ খান। তবে নির্বাচিত সরকারের অধীনে কাজ করতে পারলে দেশের বিনিয়োগ পরিবেশ আরও ইতিবাচক হবে বলেও প্রত্যাশা তাঁর।
পূর্বের পোস্ট :