ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে বিএনপির ভূমিধস বিজয়ের পর প্রথমবারের মতো করা সংবাদসম্মেলনে শনিবার বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান দেশের জনগণের উদ্দেশ্যে বলেন, "বাংলাদেশের জনগণকে অভিনন্দন, আজ থেকে আমরা স্বাধীন; এ বিজয় বাংলাদেশের, গণতন্ত্রের এবং গণতন্ত্রকামী মানুষের।"

রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে দুপুরে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনের প্রারম্ভিক বক্তব্যে তারেক রহমান বলেন, "এ বিজয় বাংলাদেশের। এ বিজয় গণতন্ত্রের।  এই বিজয় গণতন্ত্রকামী জনগণের।  আজ থেকে আমরা সবাই স্বাধীন।আমি দেশের জনগণকে অভিনন্দন জানাই।

সকল প্রতিবন্ধকতা মোকাবেলা করে আপনারা দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পথ সুগম করেছেন।"

বাংলাদেশে যাতে কার কোনোদিন ফ্যাসিবাদ কায়েম না হয় সেজন্য সবার প্রতি আহ্বান জানিয়ে তারেক বলেন, "আপনাদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে দীর্ঘ দেড় দশকের বেশি সময় পর দেশে পুনরায় জনগণের সরাসরি ভোটে জনগণের কাছে জবাবদিহিমূলক সংসদ এবং সরকার প্রতিষ্ঠিত হতে চলেছে। আর কোনো অপশক্তি যাতে দেশে ফ্যাসিবাদ কায়েম করতে না পারে দেশকে তাবেদার রাষ্ট্রে পরিণত করতে না পারে এ জন্য আমাদের সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে।"   

নির্বাচনে অংশ নেয়া ৫১ দলকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানিয়ে তারেক বলেন, "গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র এবং রাজনীতিতে রাজনৈতিক দলগুলোই মূলত: গণতন্ত্রের বাতিঘর। সরকার এবং বিরোধী দল যে যার অবস্থান থেকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করলে অবশ্যই দেশে গণতন্ত্র প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পাবে।

নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী প্রতিটি গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি আহবান জানাই, দেশ গঠনে আপনাদের চিন্তাভাবনাও আমাদের কাছে গুরুত্ত্বপূর্ণ।  আমাদের পথ এবং মত ভিন্ন থাকতে পারে কিন্তু দেশের স্বার্থে আমরা সবাই এক। আমি বিশ্বাস করি, জাতীয় ঐক্য আমাদের শক্তি, বিভাজন আমাদের দুর্বলতা।"

রাষ্ট্র পরিচালনায় তারেক জানান, সকল রাজনৈতিক দলের গঠনমূলক ও গণতান্ত্রিক মতামত বিএনপির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। একটি দুর্বল অর্থনৈতিক কাঠামো, দুর্বল সাংবিধানিক কাঠামো ও ভেঙেপড়ার আইনশৃঙ্খলা আবারও গড়ে তুলতে সকলের সহযোগিতা কামনা করেন তিনি।

জুলাই সনদ বাস্তবায়নের অঙ্গীকার ব্যক্ত করে তারেক বলেন, "জনগণের রায় পেলে বিএনপি রাষ্ট্র মেরামতের রূপরেখা উপস্থাপন করেছিল। অন্যান্য গণতান্ত্রিক দল এবং সারাদেশে জনগণের সঙ্গে মত বিনিময়ের মাধ্যমে ৩১ দফা প্রণয়ন করেছিল। ৩১ দফার আলোকে ঘোষণা করা হয়েছিল দলীয় ইশতেহার। একইসঙ্গে কয়েকটি বিষয়ে 'নোট অফ ডিসেন্ট' দিয়ে বিএনপি জুলাই সনদেও স্বাক্ষর করেছিল। আমরা জনগণের কাছে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ প্রত্যাশিত প্রতিটি অঙ্গীকার পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করবো"

বিএনপি কর্মীদের এত বছরের ত্যাগ-তিতিক্ষার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে তারেক বলেন, "আপনারা গণতন্ত্রের জন্য বছরের পর বছর অনেক ত্যাগ করেছেন। এখন আপনাদের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হচ্ছে দেশ গড়া। এখন প্রতিটি কর্মীকে দায়িত্বশীল আচারণ করতে হবে।"

আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার ওপর জোর দিয়ে তারেক বলেন, "আমার বক্তব্য স্পষ্ট,  যে কোনো মূল্যে শান্তি শৃঙ্খলা বজায় রাখতে হবে। কোনো রকমের অন্যায় কিংবা বেআইনি কর্মকান্ড বরদাস্ত করা হবেনা।  দলমত ধর্ম বর্ণ কিংবা ভিন্নমত যাই হোক, কোনো অজুহাতেই দুর্বলের উপর সবলের আক্রমণ মেনে নেয়া হবেনা। ন্যায়পরায়ণতাই' হবে আদর্শ। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা না গেলে আমাদের সকল প্রচেষ্টা বৃথা যেতে বাধ্য। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় সরকারি দল কিংবা বিরোধী দল, অন্য মত কিংবা ভিন্নমত প্রতিটি বাংলাদেশী নাগরিকের জন্যই আইন সমান। আইনের প্রয়োগ হবে বিধিবদ্ধ নিয়মে।"

নির্বাচনের সময়ে অনেকের সঙ্গে মতানৈক্য দেখা দিলেও সেটি যেন প্রতিহিংসা বা প্রতিশোধে রূপ না নেয় সেদিকে নজর দেয়ার আহ্বান জানান তারেক। "নির্বাচনে একে অপরের বিরুদ্ধে কিংবা একদল আরেক দলের বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে গিয়ে নির্বাচনের মাঠে হয়তো কোথাও কোথাও নিজেদের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি হয়ে থাকতে পারে। তবে এ ধরণের বিরোধ যেন প্রতিশোধ প্রতিহিংসায় রূপ না নেয় সে ব্যাপারে সবাইকে সতর্ক থাকার আহবান জানাই।"

একটি সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনের জন্য তারেক অন্তবর্তীকালীন সরকার, নির্বাচন কমিশন, জনপ্রশাসনের কর্মকর্তা-কর্মচারী, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, সশস্ত্র বাহিনী, রিটার্নিং কর্মকর্তা, সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা, প্রিজাইডিং কর্মকর্তা, সহকারী প্রিজাইডিং কর্মকর্তা, পোলিং এজেন্ট, সহকারী পোলিং এজেন্ট সবার প্রতি ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানান তারেক।

অনুষ্ঠানে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির সাবেক চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেন তারেক রহমান। বলেন, "সারাদেশে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপির সর্বস্তরের নেতাকর্মী সমর্থক ছাড়াও দেশের গণতন্ত্রকামি জনগণের সামনে আজকের এই সময়টি ভীষণ আনন্দের। এমন এক আনন্দঘন পরিবেশে আপোষহীন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার অনুপস্থিতি  আমাদেরকে ভারাক্রান্ত করে। রাষ্ট্র ও রাজনীতিতে জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার এমন একটি গণতান্ত্রিক সময়ের প্রত্যাশায় তিনি ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে আপোষহীন লড়েছিলেন।  স্বৈরাচার কিংবা ফ্যাসিবাদের সঙ্গে কখনোই আপোষ করেননি। দেশ এবং জনগণের স্বার্থের প্রশ্নে বরাবরই তিনি ছিলেন অটল অবিচল।"

তারেক ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে যারা জীবন দিয়েছেন তাদের সকলের রূহের মাগফিরাত কামনা করেন এবং ২০২৪ সালে জুলাই অভ্যুত্থাণে যারা আহত হয়েছেন তাদের সুস্থতা কামনা করেন।

পুরো বক্তব্যে দল-মত নির্বিশেষে ঐক্যবদ্ধ থেকে বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তারেক। "একটি নিরাপদ মানবিক গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার যাত্রাপথে আমি ভিন্ন দল কিংবা ভিন্নমতের সকলের সহযোগিতা আশা করছি। বিশ্বের সকল গণতান্ত্রিক শক্তি, সকল প্রবাসী বাংলাদেশী এবং দেশের স্বাধীনতাপ্রিয় জনগণের প্রতি আবারো বিজয়ের অভিনন্দন এবং ধন্যবাদ জানিয়ে বক্তব্য শেষ করছি।"

অনুষ্ঠানে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্যসহ শীর্ষ পর্যায়ের নেতা এবং দেশি বিদেশি সাংবাদিকরা উপস্থিত ছিলেন।