যে আকাঙ্ক্ষার ওপর ভিত্তি করে ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধ হয়েছে, একই আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে ১৯৯০ এ স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন ও অধিকার বাস্তবায়নে ২০২৪ এ ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান হয়েছে—বাংলাদেশের এই তিন বৃহৎ ঘটনা একই সূত্রে গাঁথা এবং এর মধ্যে কোনো বৈপরীত্য নেই বলে মঙ্গলবার উল্লেখ করেছেন নাগরিক প্ল্যাটফর্মের আহ্বায়ক দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য।
“১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিলের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে বলা হয়েছে সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচার নিশ্চিতকারী একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র গঠনের কথা। এই রাষ্ট্র গঠনের প্রধান উপাদান ছিল মুক্তিযুদ্ধ। আর মুক্তিযুদ্ধের পরে বাকি দুই আন্দোলন হয়েছে এই একই প্রত্যাশা পূরণের আকাঙ্ক্ষা থেকে,” নাগরিক প্ল্যাটফর্ম আয়োজিত ‘জাতীয় নির্বাচন ২০২৬ ও নাগরিক প্রত্যাশা’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে বলেন দেবপ্রিয়।
দেবপ্রিয় জানান, মুক্তিযুদ্ধের পর পুরনো কাঠামো ভেঙে নতুন বাংলাদেশ গড়ার যে একটি প্রত্যাশা মানুষের ছিল সেটি পূরণ হয়নি। তার প্রেক্ষিতে মানুষ এক হয়ে স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে নেমেছে। পরবর্তীতে গত দেড় দশকে মত প্রকাশের স্বাধীনতা সংকুচিত হয়ে যাওয়া, ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হওয়া, দুর্নীতি ও দুঃশাসনের বিরোধে সাম্য ও ন্যায্যতাভিত্তিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় ছাত্র-জনতা আবার রাস্তায় নামে ও ২০২৪ এর গণঅভ্যুত্থান হয়।
“আমরা মনে করি এই তিনের মধ্যে কোনো বৈপরীত্য নেই। ১৯৭১, ১৯৯০ ও ২০২৪ এর মধ্যে কোনো দ্বন্দ্ব নেই। তিন সময়েই মানুষ নিজের অধিকারের জন্য, মর্যাদার জন্য সোচ্চার হয়েছে,” বলেন দেবপ্রিয়।
বর্তমান সময়ে একটি সুষ্ঠু নির্বাচন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন উল্লেখ করে দেবপ্রিয় জানান, বাংলাদেশের উত্তরণের জন্য একটি সুষ্ঠু নির্বাচন এখন সবচেয়ে প্রয়োজন। নির্বাচন এবং নির্বাচন পরবর্তী সরকার ব্যবস্থা নিয়ে মানুষের মনে অনেক প্রশ্ন, শঙ্কা ও সংশয় আছে।
“মানুষের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন নির্বাচন কী সুষ্ঠু হবে? এই প্রশ্ন ছাপিয়ে এখন আরেকটি বড় প্রশ্ন তাদের মনে জেগেছে নির্বাচন সুষ্ঠু হলেও সেটি কী আদৌ অর্থবহ হবে কিনা। নাকি বাংলাদেশ আবারও সেই আগের স্রোতে গা ভাসাবে,” বলেন দেবপ্রিয়।
দেবপ্রিয় জানান, নাগরিক প্ল্যাটফর্ম আট বিভাগীয় শহরে মানুষের দ্বারপ্রান্তে গিয়েছে, তাদের নিয়ে সংলাপ করেছে, তাদের আশাআকাঙ্ক্ষা তুলে এনেছে। পাশাপাশি ১৫ বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মশালা করেছে, বাংলাদেশ নিয়ে তরুণদের ভাবনা ও ভাষ্য তুলে এনেছে। প্রান্তিক ও বঞ্চিত মানুষের ভাবনা ও বাংলাদেশ নিয়ে সামষ্টিক আকাঙ্ক্ষা যুক্ত করে একটি ইশতেহার তৈরি করেছে নাগরিক প্ল্যাটফর্ম।
“এই ইশতেহার কোনো নমনীয় ইশতেহার না। আমরা শুধু ইশতেহার প্রণয়ন করে থেমে যাবো না। ইতোমধ্যে আমরা রিফর্ম ট্র্যাকার উদ্বোধন করেছি। এই ট্রাকারের সঙ্গে যুক্ত হয়ে একজন নাগরিক দেখতে পারবেন যেই সরকারই ক্ষমতায় আসুক তারা নাগরিকদের জন্য কতটা সংস্কার করেছে, নাগরিকদের প্রত্যাশা কতটুকু পূরণ করেছে,” বলেন দেবপ্রিয়।
দেবপ্রিয় জানান, ১৫০ জাতীয় প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে নাগরিক প্ল্যাটফর্ম কাজ করে এই ইশতেহার প্রণয়ন করেছে। ইশতেহারে সাধারণ নাগরিক ও তরুণ প্রজন্মের রাষ্ট্রভাবনা ফুটে উঠেছে।
“১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিলের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের নৈতিকতাকে কাঠামো ধরে এই ইশতেহার তৈরি করা হয়েছে। আমাদের মূল আকাঙ্ক্ষা প্রান্তিক মানুষ, নারী ও সুবিধাবঞ্চিত—যাদের কণ্ঠস্বর রাষ্ট্রের ওপর তলা অর্থাৎ সরকার ও আমলাদের কাছে পৌঁছায় না তাদের কাছে পৌঁছে দেয়া,” বলেন দেবপ্রিয়।
দেবপ্রিয় জানান, নাগরিক প্ল্যাটফর্ম এই ইশতেহারে নীতি মুখ্য নয় কর্মসূচিকে মুখ্য ধরে আগামীতে কাজ করে যাবে। ইশতেহার পূরণে একটি অন্তর্ভুক্তমূলক রাষ্ট্র গড়াই মূল লক্ষ্য বলে জানান তিনি।
পূর্বের পোস্ট :