পুঁজিবাজারে ইনিশিয়াল পাবলিক অফারিং (আইপিও) অনুমোদনের দীর্ঘসূত্রতা কমিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে যাতে করে নতুন বিধিমালার আওতায় কোনো কোম্পানি আইপিওর আবেদন করার পর সর্বোচ্চ তিন মাসের মধ্যে অনুমোদন দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি), রোববার বলেন বিএসইসি চেয়ারম্যান মাসুদ খান।

"পুঁজিবাজারে আইপিও-সংকট নিরসনে নতুন প্রক্রিয়ায় আইপিও অনুমোদনের সময় উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা হবে। তিন মাসের মধ্যে আমরা আইপিও অনুমোদন দেবই,” রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশ (কেআইবি) মিলনায়তনে বিশ্ব বিনিয়োগকারী সপ্তাহ ২০২৬-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিএসইসি চেয়ারম্যান এসব কথা বলেন।

মাসুদ খান বলেন, দায়িত্ব নেওয়ার পর আইপিও-সংক্রান্ত নিয়মের জটিলতাগুলো চিহ্নিত করে সেগুলো সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নতুন আইপিও বিধিমালায় আবেদন থেকে অনুমোদন পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করার ব্যবস্থা রাখা হচ্ছে।

এ জন্য ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই), চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (সিএসই) এবং বিএসইসির সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম সমন্বিতভাবে পরিচালনা করা হবে। এতে একটি কোম্পানির আইপিও আবেদনের পর বিভিন্ন ধাপে যে সময় ব্যয় হয়, তা কমিয়ে আনা সম্ভব হবে বলে মনে করছে কমিশন।

বিএসইসি চেয়ারম্যান বলেন, ‘দুই বছরের খরা, আইপিও নিয়ে খরা বেশিদিন চলতে দেওয়া যায় না।’ অর্থাৎ দীর্ঘ সময় ধরে নতুন কোম্পানি পুঁজিবাজারে না আসার যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তা কাটিয়ে উঠতে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর জোর দিচ্ছে কমিশন।

নতুন কোম্পানি পুঁজিবাজারে আনার ক্ষেত্রে সরাসরি তালিকাভুক্তির (ডাইরেক্ট লিস্টিং) সুযোগও রাখা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন বিএসইসি চেয়ারম্যান। তবে এ ক্ষেত্রে যোগ্যতার মানদণ্ড আগের তুলনায় কঠোর করা হবে।

মাসুদ খান বলেন, কেবল অত্যন্ত যোগ্য ও শক্তিশালী কোম্পানিগুলোই সরাসরি তালিকাভুক্তির সুযোগ পাবে। এর মাধ্যমে পুঁজিবাজারে ভালো মানের কোম্পানি আনার পাশাপাশি বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ সুরক্ষার বিষয়টিও গুরুত্ব পাবে।

বহুজাতিক ও বড় স্থানীয় কোম্পানিগুলোকে পুঁজিবাজারে আনতে সরাসরি তালিকাভুক্তির পাশাপাশি একটি নতুন হাইব্রিড পদ্ধতির সুযোগ দেওয়ার কথাও জানান তিনি। এ ব্যবস্থায় একটি অংশের শেয়ার জনগণের কাছে বিক্রি করা হবে, আর অন্য অংশ বিদ্যমান মালিকদের শেয়ার বিক্রির মাধ্যমে বাজারে আসবে।

পুঁজিবাজার সংস্কারে কমিশনের নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপের কথাও তুলে ধরেন বিএসইসি চেয়ারম্যান। তিনি বলেন, দায়িত্ব নেওয়ার পর কমিশনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত ছিল ফ্লোর প্রাইস তুলে দেওয়া।

২০২৩ সালে ফ্লোর প্রাইস চালুর পর আন্তর্জাতিক সূচক প্রদানকারী এমএসসিআইয়ের সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল বলে উল্লেখ করেন তিনি।

ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহারের মাধ্যমে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা হয়েছে বলে জানান বিএসইসি চেয়ারম্যান।

বেক্সিমকো-সংক্রান্ত বিভিন্ন পদক্ষেপের কথাও উল্লেখ করেন তিনি। প্রতিষ্ঠানটির বোর্ড পুনর্গঠনসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে জানান মাসুদ খান। এসব পদক্ষেপের মাধ্যমে পুঁজিবাজারের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনর্গঠনের চেষ্টা চলছে বলে জানান তিনি।

বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা ও পুঁজিবাজারের ওপর আস্থা বাড়াতে ডিজিটাইজেশনের ওপর আরও গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানিয়েছেন বিএসইসি চেয়ারম্যান।

তিনি বলেন, ব্রোকারেজ হাউসগুলোর ব্যাক-অফিস সফটওয়্যারকে একটি সমন্বিত ব্যবস্থার আওতায় এনে রিয়েল টাইমে সংযুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এর ফলে নিয়ন্ত্রক সংস্থা নির্দিষ্ট সময়ে ব্রোকারদের হিসাব এবং ব্যাংক হিসাবে থাকা অর্থের তথ্য দেখতে পারবে।

এ ছাড়া অর্ডার ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম চালু এবং কাগজের স্লিপের পরিবর্তে স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থায় যাওয়ার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। মাসুদ খানের ভাষায়, পুঁজিবাজারে ডিজিটাইজেশন এখন ‘নতুন কারেন্সি’।

বিনিয়োগকারীদের অভিযোগ ও মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির বিষয়েও উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন বিএসইসি চেয়ারম্যান।

তিনি বলেন, সিকিউরিটিজ আইন ও সংশ্লিষ্ট অধ্যাদেশ সমন্বয় করে প্রয়োজনীয় সংশোধনী চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। সংশোধনীগুলো কার্যকর হলে কমিশন নিজস্ব সময়ের মধ্যে সরাসরি মামলা করার সুযোগ পাবে বলে আশা করা হচ্ছে।

পুঁজিবাজারের পাশাপাশি বন্ড মার্কেটের উন্নয়নের ওপরও জোর দিচ্ছে বিএসইসি। মাসুদ খান জানান, দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকার বন্ড অনুমোদন করা হয়েছে। তবে এসব বন্ড ইস্যুকারী প্রতিষ্ঠানকে মূল বোর্ডে তালিকাভুক্ত হওয়ার শর্ত দেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, বন্ড মার্কেটের উন্নয়নের জন্য স্টক মার্কেটের সঙ্গে এর কার্যকর সংযোগ প্রয়োজন। একই সঙ্গে গ্রিন বন্ডসহ বিভিন্ন ধরনের বন্ডের বাজার সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

দেশের পুঁজিবাজারে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ বাড়ানোর যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে বলে মনে করেন বিএসইসি চেয়ারম্যান। এ ক্ষেত্রে পেনশন ফান্ড, গ্র্যাচুইটি ফান্ড এবং বীমা কোম্পানির অর্থের একটি অংশ পুঁজিবাজারের করপোরেট বন্ড ও শেয়ারে বিনিয়োগের সুযোগ তৈরির বিষয়ে ভবিষ্যতে নীতিগত উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে।

বীমা খাতকে পুঁজিবাজারের জন্য সম্ভাবনাময় একটি খাত হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি। দীর্ঘদিন ধরে অনেকটা নিষ্ক্রিয় থাকা এ খাতকে পুঁজিবাজারে আরও সক্রিয় করার প্রয়োজন রয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। একই সঙ্গে মিউচুয়াল ফান্ড খাতের উন্নয়নের ওপরও গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানান।

বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের বাজার মূলধন অনেক দেশের তুলনায় এখনো কম বলে উল্লেখ করেন বিএসইসি চেয়ারম্যান। তাঁর মতে, বাজার মূলধন বাড়াতে পারলে স্বাভাবিকভাবেই লেনদেনের পরিমাণও বাড়বে।

দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারের অংশ হিসেবে ডেরিভেটিভস মার্কেট, ক্রেডিট রেটিং এজেন্সিগুলোর কার্যকারিতা পর্যালোচনা এবং ক্লিয়ারিং ও সেটেলমেন্ট ব্যবস্থার উন্নয়ন নিয়েও কাজ চলছে বলে জানান তিনি।

মাসুদ খান বলেন, বিশ্ব বিনিয়োগকারী সপ্তাহের কর্মসূচি শুধু এক সপ্তাহের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে চায় না বিএসইসি। বিনিয়োগকারীদের সচেতনতা বৃদ্ধি, পুঁজিবাজারের প্রতি আস্থা পুনর্গঠন এবং বাজারের কাঠামোগত উন্নয়নের কাজ অব্যাহত থাকবে।