দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে চলমান সংকট থেকে উত্তরণে ক্ষমতাসীনদের ‘রাজনৈতিক সদিচ্ছার’ ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন অর্থনীতিবিদ ও গবেষক মাসরুর রিয়াজ। তার মতে, কোনো গোষ্ঠীর কাছে অর্থনীতিকে জিম্মি হতে না দেওয়ার মতো রাজনৈতিক অবস্থান ও সদিচ্ছা থাকলেই কেবল পরিস্থিতির পরিবর্তন সম্ভব।
জাতীয় বাজেট সামনে রেখে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের ‘ইনসাইড আউট’ অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে দেশের অর্থনীতির বিভিন্ন দিক নিয়ে নিজের পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশ’-এর চেয়ারম্যান মাসরুর রিয়াজ।
তিনি বলেন, “বাংলাদেশের অর্থনীতি গত কয়েক বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে সংকটপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় সংকট হলো উচ্চ মূল্যস্ফীতি।”
তার ভাষায়, “আমরা ১২ বলি, ৯ বলি কিংবা সাড়ে ৮ বলি— সবই কিন্তু উচ্চ মূল্যস্ফীতি। এতে সাধারণ মানুষের কষ্ট হচ্ছে।”
তিনি বলেন, নীতি সুদহার বাড়ানোর ফলে কিছু সময় মূল্যস্ফীতি কমলেও এর নেতিবাচক প্রভাবও রয়েছে। বর্তমানে ব্যবসায়ীদের ঋণের সুদ ১৩ থেকে ১৫ শতাংশে পৌঁছেছে, যা অনেক উদ্যোক্তার জন্য টেকসই নয়।
মাসরুর রিয়াজ দেশের দ্বিতীয় বড় সংকট হিসেবে জ্বালানি ও গ্যাস সরবরাহে ঘাটতির কথা উল্লেখ করেন। পাশাপাশি আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর দুর্বলতাকেও বড় সমস্যা হিসেবে দেখেন তিনি। উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, ১৯৮০ সালের বিনিয়োগ আইন বর্তমান বৈশ্বিক বিনিয়োগ ও ডিজিটাল অর্থনীতির বাস্তবতার সঙ্গে আর সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
তবে নানা সংকটের মধ্যেও বাংলাদেশের কিছু শক্তির জায়গা রয়েছে বলে মনে করেন এই অর্থনীতিবিদ। তিনি বলেন, বিশাল কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী বাংলাদেশের অন্যতম বড় শক্তি।
“বাংলাদেশ কোনো মৌলিক কাঁচামাল উৎপাদন না করেও বিশ্বে দ্বিতীয় বৃহত্তম তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক দেশ। আমাদের কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী পৃথিবীর অনেক দেশের জন্য স্বপ্নের মতো।”
তিনি আরও বলেন, ভৌগোলিক অবস্থানের কারণেও বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়া ও আসিয়ান অঞ্চলের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ সংযোগকারী রাষ্ট্র হিসেবে ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে তৈরি পোশাক খাতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতার ঝুঁকির কথাও তুলে ধরেন মাসরুর রিয়াজ। তার মতে, এককভাবে গার্মেন্টস খাত দেশের অর্থনীতিকে দীর্ঘদিন টেনে নিতে পারবে না। অন্যান্য রপ্তানি খাতকেও শক্তিশালী করতে হবে।
কর্মসংস্থান পরিস্থিতি নিয়ে তিনি বলেন, প্রতিবছর ২০ থেকে ২২ লাখ তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করলেও তাদের জন্য পর্যাপ্ত মানসম্মত আনুষ্ঠানিক চাকরি তৈরি হচ্ছে না। অধিকাংশই অনানুষ্ঠানিক খাতে চলে যাচ্ছে।
দেশে বিনিয়োগ কমে যাওয়ার চিত্র তুলে ধরে তিনি বলেন, বেসরকারি বিনিয়োগ জিডিপির ২৪ শতাংশ থেকে ২২ শতাংশে নেমে এসেছে। সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগও জিডিপির শূন্য দশমিক ৫ শতাংশের নিচে নেমে গেছে।
অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় তিনি দীর্ঘমেয়াদি প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের ওপর জোর দেন। তার মতে, বিচ্ছিন্ন কিছু সংস্কার উদ্যোগ দিয়ে অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করা সম্ভব নয়।
“আমাদের সার্বিক বিনিয়োগ ব্যবস্থার জন্য সংস্কারের প্যাকেজ প্রয়োজন ছিল। এক-দুইটি বিচ্ছিন্ন সংস্কার দিয়ে বেশি দূর যাওয়া যাবে না,” বলেন তিনি।
সংস্কারের পথে প্রতিবন্ধকতার কথাও উল্লেখ করেন এই বিশ্লেষক। তার ভাষায়, যাদের স্বার্থ ক্ষুণ্ন হয়, তারা সবসময় সংস্কারের বিরোধিতা করে।
আগামী ১১ জুন জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট উপস্থাপন করবেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। এমন সময়ে বাজেট আসছে, যখন দেশের মূল্যস্ফীতি ১৬ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
এই প্রেক্ষাপটে মাসরুর রিয়াজ বলেন, সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে উন্নয়ন ব্যয় বৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা।
তিনি বলেন, “একদিকে মূল্যস্ফীতি কমানোর চাপ, অন্যদিকে মানুষের প্রত্যাশা ও উন্নয়ন ব্যয়ের প্রয়োজন— এই ভারসাম্য করাটাই হবে নাম্বার ওয়ান চ্যালেঞ্জ।”
এক্ষেত্রে তিনি মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি সম্প্রসারণের পরামর্শ দেন।
বাংলাদেশে কর-জিডিপি অনুপাত এশিয়ার মধ্যে সর্বনিম্ন উল্লেখ করে মাসরুর রিয়াজ বলেন, রাজস্ব বাড়াতে করহার বাড়ানোর পরিবর্তে করের আওতা সম্প্রসারণ করতে হবে।
তার মতে, দেশের বিশাল অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতিকে আনুষ্ঠানিক কাঠামোর আওতায় আনতে না পারলে কর আদায় বাড়ানো সম্ভব নয়। পাশাপাশি টিআইএনধারীদের মধ্যে রিটার্ন জমা নিশ্চিত করা এবং কর ছাড়ের সংস্কৃতি কমানোর পরামর্শ দেন তিনি।
ব্যাংকিং খাতের শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার ওপরও গুরুত্ব দেন মাসরুর রিয়াজ। তিনি বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা, অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট আইন সংস্কার এবং মানি লোন কোর্ট পুনর্গঠন জরুরি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, দেশের খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় ৩৬ শতাংশ। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “ব্যাংকিং খাতের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ সম্পদ অর্থনীতিতে কাজে লাগছে না। এ বিষয়ে যৌক্তিক সমাধানে আসতে হবে।”
পুঁজিবাজার নিয়ে তিনি বলেন, দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের বাজার গড়ে তুলতে না পারায় ব্যাংকিং খাতের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হচ্ছে। তাই বাজারকে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীনির্ভর না রেখে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগনির্ভর করতে হবে।
কালো টাকা সাদা করার সুযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বৈধ কিন্তু অঘোষিত আয়কে জরিমানা ও উচ্চ করের আওতায় এনে বৈধ করার সুযোগ দেওয়া যেতে পারে। তবে ঢালাওভাবে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দেওয়া উচিত নয়।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বিনিয়োগে যে ভাটা তৈরি হয়েছিল, তা এখনো পুরোপুরি কাটেনি বলেও মন্তব্য করেন তিনি। এর জন্য রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও নির্বাচনের সময়সূচি নিয়ে দীর্ঘদিনের অস্পষ্টতাকে দায়ী করেন মাসরুর রিয়াজ।
সবশেষে অর্থনীতিকে গুটিকয়েক গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত করার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “এটা পারবে কি পারবে না, তা পুরোপুরি নির্ভর করবে রাজনৈতিক সদিচ্ছার ওপর।”
পূর্বের পোস্ট :