আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ব্যবসা ও শিল্পবান্ধব বাজেট প্রত্যাশা করছেন এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি মীর নাসির হোসেন। একইসঙ্গে তিনি শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও জ্বালানি খাতে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
জাতীয় বাজেট সামনে রেখে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের ‘ইনসাইড আউট’ আলোচনা অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে তিনি বলেন, “আমাদের প্রধান প্রত্যাশা হচ্ছে ব্যবসাবান্ধব, শিল্পবান্ধব একটা বাজেট হতে হবে। যাতে আমরা যারা এখন শিল্প-বাণিজ্যে রয়েছি, তারা বেঁচে থাকতে পারি।”
মীর গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, বর্তমান সংকট কাটিয়ে নতুন বিনিয়োগের পরিবেশ তৈরি করতে বাজেটে স্পষ্ট দিকনির্দেশনা থাকতে হবে।
তার ভাষায়, “শিক্ষাতে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে, তারপর স্বাস্থ্য, তারপর জ্বালানি, এরপর শিল্প-বাণিজ্যে।”
‘সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ জ্বালানি নিরাপত্তা’
বর্তমান অর্থনীতির সবচেয়ে বড় সংকট হিসেবে জ্বালানি নিরাপত্তার বিষয়টি সামনে আনেন মীর নাসির। তিনি বলেন, আগের সরকারের রেখে যাওয়া বিপুল ঋণের বোঝার কারণে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত মারাত্মক চাপের মধ্যে রয়েছে।
“পাওয়ার সেক্টরে প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকা বকেয়া রয়েছে। এর কারণে দেশের এনার্জি সিকিউরিটি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।”
তিনি অভিযোগ করেন, গত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
তার মতে, স্থলভাগ ও বঙ্গোপসাগরের অফশোর ব্লকগুলোতে গ্যাস অনুসন্ধানে ব্যর্থতার কারণেই বর্তমানে দেশের শিল্প খাতকে এলএনজির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
তিনি বলেন, “দেশীয় গ্যাস উৎপাদন চাহিদা পূরণ করতে পারছে না। প্রায় ৩৫ শতাংশ ঘাটতি এলএনজি আমদানি করে পূরণ করতে হচ্ছে।”
শিল্পের জন্য নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস জরুরি
শিল্প ও বাণিজ্যের জন্য নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উল্লেখ করে মীর নাসির বলেন, গ্যাস ছাড়া শিল্প টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়।
তিনি বলেন, “সরকার ইতোমধ্যে বাপেক্সের মাধ্যমে কিছু ড্রিলিং শুরু করেছে। বাপেক্সকে আরও শক্তিশালী করতে হবে। অফশোরে উৎপাদন বাড়াতে উদ্যোগ নিতে হবে।”
‘ঘনঘন রাজস্ব নীতি পরিবর্তন নয়’
ব্যবসা-বাণিজ্যে অনিশ্চয়তা তৈরির জন্য রাজস্ব নীতির ঘনঘন পরিবর্তনের সমালোচনা করেন মীর নাসির।
তিনি বলেন, “আজ করপোরেট ট্যাক্স ২০ শতাংশ করা হলো, কাল আবার ২২ শতাংশ করা হলো—এতে উদ্যোক্তারা স্বস্তি পান না।”
বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে কম উল্লেখ করে তিনি বলেন, করদাতার সংখ্যা বাড়ানো ছাড়া রাজস্ব আয় বাড়ানো সম্ভব নয়।
“দেশের এক কোটি টিআইএনধারীর মধ্যে মাত্র প্রায় ৪০ লাখ মানুষ কর দেয়। করজাল বাড়াতে না পারলে ট্যাক্স-জিডিপি রেশিও উন্নত হবে না।”
ব্যাংক খাতে সংস্কারের দাবি
ব্যাংক খাতে দ্রুত সংস্কার আনার আহ্বান জানিয়ে এফবিসিসিআইয়ের সাবেক এই সভাপতি বলেন, বর্তমানে অনেক ব্যাংক মূল ব্যবসা থেকে নয়, সরকারি ট্রেজারি বন্ড থেকে মুনাফা করছে।
“কোনো দেশে যদি ব্যাংকের ৩০ শতাংশের বেশি আয় ট্রেজারি বিল থেকে আসে, সেটি সুস্থ পরিবেশ নয়। আমাদের দেশে ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত আয় আসছে ট্রেজারি বন্ড থেকে।”
তিনি আরও বলেন, দুর্বল ব্যাংকগুলোর একত্রীকরণের বর্তমান পদ্ধতি পুনর্বিবেচনা করা দরকার।
তার মতে, পৃথকভাবে অডিট করে সবল ব্যাংকের মাধ্যমে দুর্বল ব্যাংক টেকওভার করানো হলে ভালো ফল আসতে পারত।
তেল-বিদ্যুতের দাম বাড়ার প্রভাব পড়বে জনজীবনে
সম্প্রতি জ্বালানি তেল ও বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির প্রভাব সাধারণ মানুষের ওপর পড়বে বলে মনে করেন মীর নাসির। তবে তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক বাজার পরিস্থিতির কারণে সরকারের সামনে বিকল্প কম ছিল।
“বিশ্ববাজারে তেলের দাম অনেক বেড়েছে। সরকারকে শেষ পর্যন্ত দাম বাড়াতেই হয়েছে।”
তিনি অভিযোগ করেন, বিদ্যুৎ খাতে আগের সরকারের পরিকল্পনার ঘাটতির কারণে উৎপাদন সক্ষমতা থাকলেও গ্যাস সংকটে সেই বিদ্যুৎ সরবরাহ করা যাচ্ছে না।
‘সুদের হার বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি কমেনি’
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে শুধু সুদের হার বাড়ানো কার্যকর হয়নি বলে মন্তব্য করেন মীর নাসির।
তিনি বলেন, “সুদের হার বাড়ানোয় ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, কিন্তু মূল্যস্ফীতি কমেনি।”
তার মতে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সরবরাহ ব্যবস্থাপনা, বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনা ও বাজার তদারকির মতো বিষয়গুলোতেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
নতুন বিনিয়োগে সংকট
উচ্চ সুদের হার, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি ও মুদ্রার অবমূল্যায়নের কারণে নতুন বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হচ্ছে বলে মনে করেন তিনি।
“অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে পুঁজি হারিয়েছে। বিশেষ করে ডলারের দাম বেড়ে যাওয়ায় যাদের বৈদেশিক ঋণ ছিল, তারা বড় ধাক্কা খেয়েছে।”
‘প্রয়োজন সুশাসন’
অর্থনীতির বড় ঝুঁকি হিসেবে সুশাসনের অভাবের কথা উল্লেখ করেন মীর নাসির।
তার ভাষায়, “সুশাসন না থাকলে অর্থপাচার বাড়ে, খেলাপি ঋণ বাড়ে।”
তবে বাংলাদেশের অর্থনীতির সম্ভাবনা নিয়েও আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি। উদ্যোক্তা শ্রেণি, বিশাল শ্রমশক্তি, রেমিটেন্স ও রপ্তানি আয়কে দেশের বড় শক্তি হিসেবে উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, “পুরো ইকোসিস্টেম যদি ব্যবসাবান্ধব করা যায়, তাহলে বাংলাদেশ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি হবে না—এমন কোনো কারণ নেই।”
পূর্বের পোস্ট :