চার বছর ধরে নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকা মূল্যস্ফীতির চাপ নিয়ে নতুন অর্থবছর শুরু করতে যাচ্ছে বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকার। সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়া, নিত্যপণ্যের লাগামহীন দাম বৃদ্ধি এবং উচ্চ সুদহারের মধ্যে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এখন সরকারের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।

১১ জুন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট ঘোষণা করতে যাচ্ছে সরকার। তবে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কী ধরনের কার্যকর কৌশল নেওয়া হবে, সে বিষয়ে এখনো সুস্পষ্ট রূপরেখা আসেনি। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, শুধু সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি বা বাজারে অভিযান চালিয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়; প্রয়োজন সমন্বিত নীতি ও সরবরাহব্যবস্থার উন্নয়ন।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ তথ্যে দেখা গেছে, মে মাসে সার্বিক মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৯ দশমিক ৪২ শতাংশে পৌঁছেছে, যা গত ১৬ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ। এর আগের মাস এপ্রিলে এই হার ছিল ৯ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশ। টানা দুই মাস ধরে মূল্যস্ফীতি ঊর্ধ্বমুখী রয়েছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, করোনা মহামারী ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ধাক্কায় শুরু হওয়া মূল্যস্ফীতির চাপ এখনো কাটিয়ে উঠতে পারেনি বাংলাদেশ। পাশাপাশি জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি, বিদ্যুতের সম্ভাব্য মূল্যবৃদ্ধি, সরবরাহব্যবস্থার দুর্বলতা, চাঁদাবাজি ও বাজার ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, উচ্চ সুদের হার মূল্যস্ফীতি আরও বাড়া ঠেকাতে কিছুটা ভূমিকা রাখলেও বর্তমান সংকট মূলত সরবরাহঘাটতিনির্ভর। তাই শুধু সুদের হার বাড়িয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব নয়।

তিনি বলেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ভর্তুকি সমন্বয়ের কারণে আগামী দিনে মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন চাপ তৈরি হতে পারে। বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হলে তা সরাসরি উৎপাদন ব্যয় ও বাজারদরে প্রভাব ফেলবে।

বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২৪ সালের অক্টোবর থেকে নীতি সুদহার ১০ শতাংশে অপরিবর্তিত রেখেছে। এর ফলে ব্যাংকঋণের সুদহার বেড়ে ১৬ শতাংশ পর্যন্ত উঠেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এতে বিনিয়োগেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক এবং সানেমের নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক সেলিম রায়হান বলেন, বর্তমান মূল্যস্ফীতিকে শুধু মুদ্রানীতির বিষয় হিসেবে দেখলে হবে না। খাদ্য সরবরাহ, আমদানি ব্যয়, জ্বালানি খরচ, বিনিময় হার ও বাজার ব্যবস্থাপনার সমন্বিত সংস্কার প্রয়োজন।

তিনি বলেন, নিম্নআয়ের মানুষ, নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবার এবং অনানুষ্ঠানিক শ্রমজীবীরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। তাদের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি আরও কার্যকর ও লক্ষ্যভিত্তিক করতে হবে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নতুন বাজেটে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতে ১৩টি কর্মসূচিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতা বাড়ানোর পরিকল্পনাও রয়েছে। এসব খাতে প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের চিন্তা করা হচ্ছে, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকা বেশি।

তবে বিশ্লেষকদের সতর্কতা, কার্যকর বাস্তবায়ন ও সুশাসন নিশ্চিত না হলে এসব কর্মসূচির সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাবে না।