প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা বিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর রোববার জানিয়েছেন, আগামীতে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে সক্ষমতা অর্জনের পাশাপাশি বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতে পাঁচটি মাইলফলক অর্জনে কাজ করছে সরকার।
"অতীতে বাংলাদেশের পুরো জ্বালানি খাতকে আমদানি নির্ভর করে অলিগার্কদের হাতে তুলে দেয়া হয়েছে। শিল্পায়নের বদলে জ্বালানি খাতে যেসব নীতি নেয়া হয়েছে তা বাংলাদেশের অর্থনীতিকে পরনির্ভরশীল করে তুলেছে," বিকালে রাজধানীর একটি হোটেলে সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি) আয়োজিত "রিনিউয়েবল এনার্জি ইন দ্য আপকামিং বাজেট: এক্সপেকটেশনস অ্যান্ড রিয়েলিটি" শীর্ষক এক আলোচনায় বলেন তিতুমীর।
নবয়ানযোগ্য জ্বালানির ক্ষেত্রে সরকারের করণীয় উল্লেখ করে তিতুমীর বলেন, "সরকারের প্রথমত বিদ্যুৎ ও জ্বালানির ক্ষেত্রে আগামী বাজেটে নবায়নযোগ্য জ্বালানির পরিমাণ বাড়াবে। এটিই এই খাতের এক নম্বর মাইলফলক হিসেবে বর্তমানে বিবেচনা করছে সরকার।"
বিদ্যুৎ খাতে সরকারের দ্বিতীয় মাইলফলক ভোক্তার আয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দাম নির্ধারণ করা হবে উল্লেখ করে উপদেষ্টা বলেন, "ভোক্তা দুই শ্রেণীর- একদল হচ্ছে সাধারণ ভোক্তা, আরেকদল শিল্প-কারখানার মালিক, যারা মূলত বিনিয়োগকারী। সাধারণ ভোক্তাদের মধ্যে আবার তিন শ্রেণী রয়েছে- উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত। এদের প্রত্যেকের আয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দাম নির্ধারণ করবে সরকার। তবে অবশ্যই দাম নির্ধারণের ক্ষেত্রে রেগুলেটরি কমিশনের সিদ্ধান্তকে গুরুত্ব দেয়া হবে।"
নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারে উৎসাহ প্রদানে নতুন নীতিকাঠামো গড়ে তোলা হবে উল্লেখ করে তিতুমীর বলেন, "আমাদের জ্বালানি খাতে আমদানি নির্ভরতা কমিয়ে স্বনির্ভরতার দিকে যেতে হবে। এক্ষেত্রে নবায়নযোগ্য বিদ্যুতের ব্যাপারে সর্বোচ্চ উৎসাহ প্রদান করা হবে।"
অতীতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতকে অলিগার্কদের হাতে তুলে দিয়ে আমদানির যে উৎসব করা হয়েছিল, যাতে বাংলাদেশ কোনোদিনও নিজস্ব জ্বালানি নিরাপত্তা অর্জন করতে না পারে সেটি থেকে বেড়িয়ে আসতেই এ সিদ্ধান্ত নেয়া হবে বলে জানান তিতুমীর।
নবায়নযোগ্য জ্বালানির সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত না হলেও জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য দেশীয় সম্পদের ব্যবহার নিশ্চিত করা হবে জানিয়ে তিতুমীর বলেন, "বাংলাদেশে গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধান আবারও শুরু করা হবে। এই সম্পদ স্বনির্ভরতা অর্জনের কাজে লাগানো হবে। গ্যাস অনুসন্ধানে দুটি শর্ত মানতে হবে- শুধু বিদেশি সংস্থা দিয়ে গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধান করা যাবে না। সক্ষমতা বাড়াতে ইতোমধ্যে দেশীয় প্রতিষ্ঠান বাপেক্সকে আরও শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।"
জ্বালনি নিরাপত্তার ক্ষেত্রে সরকার একটি বেঞ্চমার্ক করতে চায় উল্লেখ করে তিতুমীর বলেন, "জ্বালানির প্রতিটি উৎসে একটি নূন্যতম মজুত রক্ষা করা হবে। এতদিন মজুত বলে এই খাতে কিছুই ছিল না। সরকার এখন সেদিকে নজর দিচ্ছেন।
বর্তমানে জ্বালানি নীতি যে দুষ্টচক্রের মধ্যে আছে তা ভেঙে বেড়িয়ে আসা খুব কঠিন উল্লেখ করে তিতুমীর বলেন, " যে পরিমাণ উৎপাদন সক্ষমতা আছে এবং সেটিকে কাজে লাগানোর যে ব্যাপার সেখানে বড় ফারাক আছে। এতে করে জনগণের সম্পদের অপচয় হচ্ছে। বিদ্যুৎ খাতে ক্যাপাসিটির প্রয়োজন রয়েছে। কতটুকু ব্যবহার করা হচ্ছে এবং ভবিষ্যতে কতখানি ব্যবহার করা হবে তার ওপর ভিত্তি করে ক্যাপাসিটি রাখা দরকার থাকলেও কখনই ব্যবহার করা হবে না জেনেও মাত্রাতিরিক্ত ক্যাপাসিটি রাখার কারণে ক্যাপাসিটি চার্জ বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে।"
বিদ্যুৎ খাতে যেসব চুক্তি করা হয়েছে তা নিয়ম-কানুন মেনে করা হয়নি উল্লেখ করে তিতুমীর বলেন, "এসব চুক্তির যে আইনি ভিত্তি দেয়া হয়েছে সেটা দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার স্বার্থে সমীচীন নয়। জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে বের হয়ে বাসযোগ্য ও পরিবেশের জন্য নিরাপদ যে পরিকাঠামো গড়ে তোলা দরকার ছিল সেই কাঠামোগত মানোন্নয়ন করা হয়নি- যা বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতের জন্য গর্হিত কাজ।"
পাশাপাশি যোগ হয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকট যেখানের বাংলাদেশের কোনো দোষ নেই এবং করারও কিছু নেই উল্লেখ করে তিতুমীর বলেন, "কেতাবি অর্থনীতিবিদরা হয়তো বলবেন, বিশ্ববাজারের সঙ্গে দেশীয় বাজারে বিদ্যুতের দামের সমন্বয় করতে। কিন্তু যে সরকার জনগণের কাছে জবাবদিহিতায় বিশ্বাস করে সে চাইলেই দাম বাড়িয়ে দিতে পারে না।"
সাম্প্রতিক সময়ে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর এই উপদেষ্টা বলেন, "জ্বালানি খাতে যে পরিমাণ ভর্তুকি দেয়া হয়েছে তার তুলনায় মূল্য সমন্বয় খুব বেশি হয়নি। এই সামান্য মূল্য সমন্বয়েই মূল্যস্ফীতি বেড়েছে। যদি আরও আগে ডিজেলের দাম বাড়ানো হতো তাহলে এর বিরূপ প্রভাব পড়তো দেশের কৃষিপণ্যের উৎপাদনের ওপরে।"
সব মিলিয়ে বর্তমান সরকার জ্বালানি খাতে যেসব সমস্যা আছে সেখান থেকে বেরিয়ে এসে দেশের স্বার্থে একটি নতুন জ্বালানি নীতির দিকে আগাতে চায় এবং বিদেশ নির্ভরতা কমিয়ে বাংলাদেশের জ্বালানি খাতকে শক্তিশালী করতে চায় বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর এ উপদেষ্টা।
পূর্বের পোস্ট :