মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতার ফলে সারাবিশ্বে সৃষ্ট জ্বালানি সংকট যার প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশেও তা সমাধানে সৌরবিদ্যুৎ বড় সুযোগ হতে পারে বলে শনিবার জানিয়েছেন পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) নির্বাহী চেয়ারম্যান হোসেন জিল্লুর রহমান।

"আপাতত জ্বালানি সংকট কিছুটা প্রশমিত হলেও এটি কোনো সাময়িক সংকট নয়, বরং বাংলাদেশের জন্য মধ্যমেয়াদি চ্যালেঞ্জ। এই সংকটের সমাধান করা না গেলে সামনে আবারও সংকট সৃষ্টি হতে পারে,"  (পিপিআরসি) আয়োজিত ফ্ল্যাগশিপ ওয়েবিনার ‘আজকের অ্যাজেন্ডা: জ্বালানির ফাঁদে বন্দি অর্থনীতি’ অনুষ্ঠানে বলেন জিল্লুর।

তিনি বলেন, "বর্তমান জ্বালানির সংকট সমাধানে ম্যানেজমেন্ট প্রক্রিয়া, আমদানি ব্যবস্থাপনা ও মধ্যমেয়াদি কার্যক্রম আরও জোরালোভাবে বাস্তবায়ন করতে না পারলে এ সংকট আরও গভীর হবে, কিছুটা প্রশমিত হলেও আগামীতে বারবার ফিরে আসতে পারে।"

সরকার সংশ্লিষ্টরা বিভিন্ন পদক্ষেপ নিলেও অনেক ক্ষেত্রে সেগুলো একমাত্রিকভাবে চাহিদা নিয়ন্ত্রণের ওপর কেন্দ্রীভূত ছিল জানিয়ে জিল্লুর বলেন, "নীতিগত সিদ্ধান্তের সুদূরপ্রসারী প্রভাব বিবেচনার পাশাপাশি আমলাতান্ত্রিক সীমাবদ্ধতা সময়মতো কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। এই সমস্যাও দূর করতে হবে। সংকটের সময় অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা না করে একতরফা সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে তা আমাদের মূল উদ্দেশ্য থেকে দূরে নিয়ে যেতে পারে।"

ওয়েবিনারে জ্বালানি ও অর্থনীতির পারস্পরিক সম্পর্কের পরিবর্তনশীল বাস্তবতা এবং তা প্রবৃদ্ধি ও সামষ্টিক স্থিতিশীলতার ওপর কী ধরনের প্রভাব ফেলছে—সে বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়। এতে অংশ নেন সেক্টর বিশেষজ্ঞ, বেসরকারি খাতের প্রতিনিধি, এনজিও কর্মী ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্বরা। তারা চলমান জ্বালানি সংকটের স্বল্পমেয়াদি ধাক্কা এবং মধ্যমেয়াদি কাঠামোগত ঝুঁকি তুলে ধরেন।

আলোচকরা জানান, বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা এবং অভ্যন্তরীণ কাঠামোগত সীমাবদ্ধতার দ্বৈত চাপে রয়েছে। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, দীর্ঘস্থায়ী ডলার সংকট এবং আমদানিনির্ভর অর্থনৈতিক কাঠামো উৎপাদন খাত, কৃষি, পরিবহনসহ সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে। প্রশ্ন উঠেছে—এটি কি কেবল সাময়িক চাপ, নাকি অর্থনীতি ধীরে ধীরে একটি ‘এনার্জি ট্র্যাপ’-এ আটকে পড়ছে?

সরবরাহ সীমাবদ্ধতা, চাহিদানির্ভর প্রতিক্রিয়া এবং যোগাযোগ ঘাটতির সমন্বয়ে সংকটের তীব্রতা বেড়েছে যা প্যানিক বায়িং সৃষ্টি করেছে বলে জানান আলোচকরা।

সরকার রেশনিংয়ের মতো প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ নেওয়া নিলেও অনিশ্চয়তার কারণে সাধারণ ভোক্তা ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা জ্বালানি মজুত করতে শুরু করে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে বলে জানান আলোচকরা।

প্যানেলিস্টরা বলেন, সরবরাহ পরিস্থিতিতে বড় ধরনের উন্নতি না হলেও চাহিদা ব্যবস্থাপনা ও নজরদারি জোরদারের মাধ্যমে ধীরে ধীরে পরিস্থিতি স্থিতিশীল হয়। তবে বিভিন্ন পাম্পে জ্বালানির অসম বণ্টন এবং গণমাধ্যমে স্থানীয় সংকটের অতিরিক্ত প্রচার জনমনে উদ্বেগ বাড়ায়, যা সংকটের ধারণাকে আরও তীব্র করে তোলে। এমন পরিস্থিতিতে শুধু সরবরাহ নয়, জনসংযোগ ব্যবস্থাপনাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

আলোচনায় ভারসাম্যপূর্ণ ও দূরদর্শী নীতির প্রয়োজনীয়তার বিষয়টিও গুরুত্ব পায়। সংকটকালে ভোক্তার আচরণ নিয়ে সমালোচনা থাকলেও নীতিনির্ধারণ, সমন্বয়ের ঘাটতি এবং প্রস্তুতির দুর্বলতাও সমানভাবে পর্যালোচনার প্রয়োজন রয়েছে বলে মত দেন বক্তারা।

ভবিষ্যতে এ ধরনের সংকট এড়াতে জ্বালানি সংরক্ষণ সক্ষমতা বৃদ্ধি, চাহিদা পূর্বাভাস উন্নয়ন, সমন্বিত যোগাযোগ এবং জ্বালানি ব্যবস্থার স্থিতিস্থাপকতা বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হয়।

সার্বিকভাবে আলোচনায় একটি অভিন্ন উপলব্ধি উঠে আসে— বাংলাদেশের জ্বালানি সংকট কেবল সাময়িক নয়, বরং গভীর কাঠামোগত দুর্বলতার প্রতিফলন। এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রয়োজন সমন্বিত নীতি, শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় এবং দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি বৈচিত্র্য ও দক্ষতার প্রতি প্রতিশ্রুতি।

ওয়েবিনারটি সঞ্চালনা করেন পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান হোসেন জিল্লুর রহমান। আলোচনায় অংশ নেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য এ. সত্তার মন্ডল, ট্রেড সার্ভিসেস ইন্টারন্যাশনাল (টিএসআই)-এর চেয়ারম্যান সৈয়দ মাহমুদুল হক, পদ্মা অয়েল কোম্পানি লিমিটেডের চেয়ারম্যান ও সাবেক জ্বালানি সচিব এ কে এম জাফর উল্লাহ খান, বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজ (বিসিআই) এর চেয়ারম্যান আনোয়ার-উল আলম পারভেজ এবং বাংলাদেশ পেট্রোল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোহাম্মদ নাজমুল হক।