দেশের ব্যাংকিং খাত নিয়ে মানুষের উদ্বেগ পুরোপুরি কাটেনি বলে স্বীকার করেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর। তবে তিনি বলেছেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিভিন্ন উদ্যোগের ফলে আস্থার আরও বড় ধস নামা ঠেকানো সম্ভব হয়েছে।

মঙ্গলবার পুরানা পল্টনে ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ইআরএফ) কার্যালয়ে আয়োজিত ‘ব্যাংকিং সেক্টর রিফর্ম: চ্যালেঞ্জেস অ্যান্ড ওয়ে ফরওয়ার্ড’ শীর্ষক এক সেমিনারে তিনি এসব কথা বলেন।

গভর্নর বলেন, “ব্যাংকিং খাতে আস্থা এখনো পুরোপুরি ফিরে আসেনি। কিন্তু সরকার দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা আনতে অনেকটাই সফল হয়েছে।”

ড. মনসুর বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে উল্লেখযোগ্য উন্নতির কথা তুলে ধরেন। তিনি জোর দিয়ে বলেন, বিদেশি ঋণের ওপর নির্ভর না করে দেশের নিজস্ব অর্থনৈতিক সক্ষমতা দিয়েই রিজার্ভ শক্তিশালী করা উচিত।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, গত বছর দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৮ বিলিয়ন ডলারের বেশি বেড়েছে। চলতি বছরেও ইতোমধ্যে আরও ১.৫ থেকে ২ বিলিয়ন ডলার যোগ হয়েছে।

বাজারে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হস্তক্ষেপ প্রসঙ্গে গভর্নর জানান, খোলা বাজার থেকে বাংলাদেশ ব্যাংক ২.৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি কিনেছে এবং প্রয়োজন হলে এ কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে। চলতি বছরের শেষ নাগাদ রিজার্ভ ৩৪ থেকে ৩৫ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে।

তিনি বলেন, “আমাদের নীতি পরিষ্কার—নিজেদের শক্তিতেই রিজার্ভ বাড়াতে হবে। আইএমএফ বা বিশ্বব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে রিজার্ভ গড়া সম্ভবও নয়, গ্রহণযোগ্যও নয়। দেশের অর্থনীতি থেকেই এই অর্থ আসবে।”

খেলাপি ঋণ (এনপিএল) প্রসঙ্গে গভর্নর বলেন, বর্তমানে তা ৩৬ শতাংশ হিসেবে প্রকাশ করা হয়েছে। এত বেশি হার প্রকাশ না করার পরামর্শ এলেও কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রকৃত চিত্র তুলে ধরতেই প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, ডিসেম্বরের শেষে খেলাপি ঋণের হার কিছুটা কমতে পারে। একই সঙ্গে তিনি স্বীকার করেন, ব্যাংকিং খাতে সুশাসনের উন্নতি খুবই সীমিত হয়েছে এবং এটি এখনও বড় চ্যালেঞ্জ।

বিভিন্ন ব্যাংকের হালনাগাদ পরিস্থিতি তুলে ধরে ড. মনসুর বলেন, সোম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক এখন স্থিতিশীল অবস্থায় রয়েছে। চূড়ান্ত প্রস্তুতি প্রায় শেষ, এক–দুই দিনের মধ্যেই নামফলক পরিবর্তন করা হবে।

তিনি জানান, বাংলাদেশ ইসলামী ব্যাংক পিএলসি কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে Tk১০,০০০ কোটি তারল্য সহায়তা পাওয়ার পর স্থিতিশীল হয়েছে এবং বর্তমানে অতিরিক্ত সহায়তা ছাড়াই আমানত সংগ্রহ করতে পারছে।

অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন। তিনি বলেন, বর্তমানে দৃশ্যমান সংস্কার কার্যক্রম মূলত আর্থিক ও ব্যাংকিং খাতেই সীমাবদ্ধ।

তিনি বলেন, “২০২৪ সালের মাঝামাঝিতে খেলাপি ঋণ ছিল ১১ থেকে ১২ শতাংশ। এখন তা বেড়ে ৩৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা মোট বাজেটের প্রায় ৮০ শতাংশের সমান।” একই সঙ্গে তিনি অভিযোগ করেন, ঋণ বিতরণে পেশাদারিত্বের চেয়ে রাজনৈতিক প্রভাব অনেক সময় বেশি কার্যকর ভূমিকা রাখে।

সেমিনারে ব্যাংকিং খাতের ভবিষ্যৎ করণীয় নিয়ে মতামত দেন মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের (এমটিবি) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সৈয়দ মাহবুবুর রহমান।

ইআরএফ সভাপতি দৌলত আক্তার মালার সভাপতিত্বে আয়োজিত এই সেমিনার সঞ্চালনা করেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক আবুল কাশেম।