ইসলামাবাদে প্রায় ২১ ঘণ্টার ম্যারাথন আলোচনা শেষে কোনো চুক্তি ছাড়াই শেষ হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের ঐতিহাসিক বৈঠক।

গত প্রায় ৫০ বছরের মধ্যে দুই দেশের মধ্যে এটিই ছিল সর্বোচ্চ পর্যায়ের সরাসরি আলোচনা। তবে রোববার সকালে কোনো সমঝোতা ছাড়াই দেশে ফেরার ঘোষণা দেন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স।

বৈঠক শেষে তিনি বলেন, আলোচনা ভেস্তে যাওয়া যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে ইরানের জন্যই বেশি ‘খারাপ খবর’। যুক্তরাষ্ট্র খুবই সরল এবং ‘চূড়ান্ত ও সেরা’ প্রস্তাব দিয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এখন দেখার বিষয় ইরান সেটি গ্রহণ করে কি না।

ভ্যান্স জানান, ২০ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে চলা এই আলোচনায় তারা সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রেখেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প–এর সঙ্গে।

তবে আলোচনার বিষয়ে আগেই কিছুটা উদাসীনতা প্রকাশ করেছিলেন ট্রাম্প। মায়ামিতে এক ক্রীড়া অনুষ্ঠানে যাওয়ার সময় সাংবাদিকদের তিনি বলেন, “ইরানের সঙ্গে চুক্তি হলো কি না, তাতে আমার কিছু যায় আসে না।”

মতবিরোধেই থেমে গেল আলোচনা

আলোচনায় মূলত হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ এবং ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত হস্তান্তর ইস্যুতে বড় ধরনের মতবিরোধ তৈরি হয়। এই দুই বিষয়েই সমঝোতা না হওয়ায় চুক্তির পথে অগ্রগতি থেমে যায়।

একে অপরকে দোষারোপ

আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার জন্য ইরানকে দায়ী করেছে যুক্তরাষ্ট্র। ভ্যান্স বলেন, পারমাণবিক কর্মসূচির বিষয়ে ইরানের কাছ থেকে ‘ইতিবাচক প্রতিশ্রুতি’ পাওয়া যায়নি।

অন্যদিকে, ইরানের প্রতিনিধিরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র তাদের আস্থা অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে। ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাকের কালিবাফ বলেন, এখন যুক্তরাষ্ট্রকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে তারা আস্থা অর্জন করতে চায় কি না।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে তিনি লেখেন, “আমাদের সদিচ্ছা ছিল, কিন্তু প্রতিপক্ষের ওপর বিশ্বাস নেই।”

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেন, কয়েক সপ্তাহের সংঘাত ও গভীর অবিশ্বাসের পর এক দফা আলোচনায় সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে—এমনটি ভাবা বাস্তবসম্মত নয়।

‘কূটনীতি কখনও শেষ হয় না’

ইসমাইল বাঘাই বলেন, আলোচনায় অগ্রগতি নির্ভর করছে যুক্তরাষ্ট্রের আন্তরিকতা ও ইরানের অধিকার স্বীকার করার ওপর। তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন, “কূটনীতি কখনও শেষ হয় না।”

তিনি জানান, পাকিস্তানসহ অন্যান্য দেশের মধ্যস্থতায় আলোচনা অব্যাহত রাখার চেষ্টা চলবে।

আঞ্চলিক ইস্যুতেই জট

আলোচনার আগে থেকেই ইরান কয়েকটি শর্ত সামনে রেখেছিল। এর মধ্যে ছিল বিদেশে জব্দ থাকা সম্পদ ফেরত দেওয়া, হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ, যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ এবং লেবাননসহ পুরো অঞ্চলে যুদ্ধবিরতি।

বিশেষ করে লেবাননে ইসরায়েলের হামলা বন্ধ করার দাবিতে অনড় ছিল তেহরান। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল স্পষ্ট করে জানিয়ে দেয়, লেবাননের বিষয়টি এই আলোচনার অংশ নয়।

আরও আলোচনার আহ্বান

আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পর পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার উভয় পক্ষকে যুদ্ধবিরতি বজায় রেখে সংলাপ চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

তিনি বলেন, আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য আলোচনার বিকল্প নেই এবং পাকিস্তান এ প্রক্রিয়ায় সহযোগিতা অব্যাহত রাখবে।

অনিশ্চয়তায় ভবিষ্যৎ

কোনো চুক্তিতে পৌঁছাতে না পারায় মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে উত্তেজনা বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। হরমুজ প্রণালি নিয়ে অনিশ্চয়তা, লেবানন ইস্যু এবং পারমাণবিক কর্মসূচি—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি জটিলই রয়ে গেছে।

যুদ্ধবিরতি টিকবে কি না, নতুন করে আলোচনা শুরু হবে কি না—এসব প্রশ্ন এখন সামনে। যদিও কূটনৈতিক পথ পুরোপুরি বন্ধ হয়নি, তবু পরবর্তী বৈঠকের তারিখ বা স্থান এখনো নির্ধারিত হয়নি।

সব মিলিয়ে, দীর্ঘ আলোচনার পরও আস্থার ঘাটতি এবং মূল বিরোধের অমীমাংসিত অবস্থাই স্পষ্ট করে দিয়েছে—যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সম্পর্ক এখনো অনিশ্চয়তার দোলাচলেই রয়ে গেছে।