ছয় সপ্তাহের যুদ্ধের পর অবশেষে আলোচনার টেবিলে বসেছে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র। পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে শুরু হওয়া এই বৈঠক দুই দেশের দীর্ঘদিনের বৈরিতার প্রেক্ষাপটে গুরুত্বপূর্ণ হলেও সমঝোতার পথ সহজ নয় বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

১৯৭৯ সালের ইরানের ইসলামি বিপ্লব–এর পর এই প্রথম দুই দেশ সরাসরি এমন উচ্চপর্যায়ের আলোচনায় বসল। তবে এই সংলাপ শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে ঠেকবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালি ও লেবাননের যুদ্ধবিরতি নিয়ে মতবিরোধ, পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি ইরানের অনাস্থা—এসবই আলোচনার বড় বাধা হয়ে আছে। ফলে আলোচনা ভেস্তে গেলে নতুন করে সংঘাতের ঝুঁকিও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

মধ্যস্থতাকারী পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ সেই আশঙ্কার কথা জানিয়ে বলেছেন, “আলোচনা সফল হতে পারে, ব্যর্থও হতে পারে। ব্যর্থ হলে আরেক দফা সংঘাতের ঝুঁকি রয়েছে।”

অভিজ্ঞ প্রতিনিধিদল, একাধিক দফায় বৈঠক

ইরানের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্বে আছেন দেশটির পার্লামেন্ট স্পিকার বাকের কালিবাফ। তাঁর সঙ্গে রয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচিসহ জ্যেষ্ঠ কূটনীতিকেরা।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্বে রয়েছেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স। তাঁর সঙ্গে আছেন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প–এর বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং উপদেষ্টা জ্যারেড কুশনার।

শনিবার সন্ধ্যায় ইসলামাবাদের একটি পাঁচতারকা হোটেলে প্রথম দফার বৈঠক শুরু হয়, যা রাত পর্যন্ত চলে। পরে দ্বিতীয় দফায় লিখিত বার্তা আদান–প্রদান করে দুই পক্ষ। একাধিক সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, আলোচনার তৃতীয় দফাও হতে পারে এবং তা রোববার পর্যন্ত গড়াতে পারে।

আস্থার সংকট কাটেনি

ইরান শুরু থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি অনাস্থার কথা জানিয়ে আসছে। দেশটির সরকারের মুখপাত্র ফাতেমেহ মোহাজেরানি বলেছেন, “আমরা সংলাপে বিশ্বাস করি এবং যুক্তিসংগত আচরণ করি, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রকে বিশ্বাস করি না।”

পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচিও বলেছেন, ‘সম্পূর্ণ অবিশ্বাস’ নিয়েই তারা আলোচনায় বসেছেন।

বিশ্লেষকদের মতে, এই আস্থার সংকটই আলোচনার সবচেয়ে বড় অন্তরায় হয়ে উঠতে পারে।

যেসব ইস্যুতে মতবিরোধ

আলোচনায় কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু সামনে এসেছে—

লেবাননের যুদ্ধবিরতি অন্তর্ভুক্ত করা নিয়ে মতবিরোধ

ইরানের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবি

পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করার প্রশ্ন

ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে বিরোধ

হরমুজ প্রণালি–তে নিয়ন্ত্রণ ও টোল আদায়

এ ছাড়া উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি নিয়েও দুই পক্ষের অবস্থান ভিন্ন।

‘চূড়ান্ত সমাধান নয়’

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সেন্টার ফর মিডল ইস্ট স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ–এর বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, এই আলোচনা কোনো চূড়ান্ত সমাধান নয়; বরং একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়ার সূচনা।

তাদের মতে, “সমঝোতার পথ বন্ধ নয়, তবে তা বন্ধুর।”

ট্রাম্পের ছায়া

আলোচনায় সরাসরি উপস্থিত না থাকলেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া বক্তব্যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ইরানের অবস্থানের সমালোচনা করেছেন। তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন, সমঝোতার জন্য চাপ অব্যাহত থাকবে।

অনিশ্চয়তার মধ্যেই নজর বিশ্ববাসীর

দীর্ঘ এই সংঘাতে প্রাণহানি ও অবকাঠামোগত ক্ষতির পাশাপাশি বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। হরমুজ প্রণালিতে নৌচলাচল ব্যাহত হওয়ায় বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহেও প্রভাব পড়েছে।

এই প্রেক্ষাপটে ইসলামাবাদের আলোচনার দিকে নজর রাখছে বিশ্ব। তবে আলোচনার টেবিলে বসেও দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি অবস্থান ইঙ্গিত দিচ্ছে—সমঝোতার পথ এখনো অনেকটাই অনিশ্চিত।