ইরানের সঙ্গে ইসরায়েল–যুক্তরাষ্ট্রের চলমান সংঘাতের জেরে হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ হয়ে পড়ায় বিশ্বজুড়ে জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। গত এক মাসে তেলের দাম বেড়েছে, ব্যাহত হচ্ছে সরবরাহও। এর প্রভাব ধীরে ধীরে বিশ্ব অর্থনীতিতে ছড়িয়ে পড়ছে।
জ্বালানির দাম বাড়লে প্রথমেই বাড়ে পরিবহন ব্যয়। এর প্রভাবে নিত্যপণ্যের দাম বাড়তে শুরু করে। একই সঙ্গে শিল্পকারখানায় উৎপাদন খরচ বাড়ে, কৃষিতে সেচ ও যান্ত্রিক কাজের ব্যয় বৃদ্ধি পায়। ফলে খাদ্যের দামও বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। আমদানিনির্ভর দেশগুলোতে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ তৈরি হচ্ছে, বাড়তে পারে বাজেট ঘাটতিও। এতে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছেন নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষ।
এই প্রেক্ষাপটে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ জ্বালানি সাশ্রয় ও অর্থনীতির ওপর চাপ কমাতে নানা পদক্ষেপ নিয়েছে।
যুক্তরাজ্য
যুক্তরাজ্য-এ পেট্রলের দাম ১৮ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠেছে। সরকার জানিয়েছে, খুচরা বিক্রেতারা অতিরিক্ত মুনাফা করলে তারা হস্তক্ষেপ করবে। নিম্ন আয়ের পরিবারকে সহায়তায় ৫৩ মিলিয়ন পাউন্ডের একটি প্যাকেজ বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
চীন
বিশ্বের বৃহত্তম তেল আমদানিকারক চীন আগে থেকেই বিপুল মজুত গড়ে তুলেছে—প্রায় ৯০ কোটি ব্যারেল। অভ্যন্তরীণ বাজারে দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে তেলজাত পণ্য রপ্তানি সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
ভারত
ভারত জানিয়েছে, আগামী ৬০ দিনের জন্য প্রয়োজনীয় অপরিশোধিত তেলের সরবরাহ নিশ্চিত আছে। জনগণকে আতঙ্কিত হয়ে অতিরিক্ত তেল মজুত না করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
আয়ারল্যান্ড
আয়ারল্যান্ড পেট্রল ও ডিজেলের ওপর কর কমিয়েছে। ২৩৫ মিলিয়ন ইউরোর প্যাকেজের আওতায় জ্বালানি ব্যয় কমানোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
অস্ট্রেলিয়া
অস্ট্রেলিয়া-র কিছু অঙ্গরাজ্যে গণপরিবহন ব্যবহার বাড়াতে ভাড়া মওকুফ করা হয়েছে। একই সঙ্গে পেট্রলের দাম দ্রুত বেড়েছে।
মিসর
মিসর জ্বালানি সাশ্রয়ে দোকান–রেস্তোরাঁ দ্রুত বন্ধ, বিদ্যুৎ ব্যবহার কমানো ও আংশিক ‘ওয়ার্ক ফ্রম হোম’ চালু করেছে। পাশাপাশি জ্বালানির দাম ও পরিবহন ভাড়া বাড়ানো হয়েছে।
ফিলিপাইনস
ফিলিপাইনস জাতীয় জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে। পরিবহন খাতে ভর্তুকি, চার দিনের কর্মসপ্তাহ ও অতিরিক্ত তেল মজুতের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
শ্রীলঙ্কা
শ্রীলঙ্কা জ্বালানি রেশনিং চালু করেছে। ব্যক্তিগত গাড়ির জন্য সাপ্তাহিক জ্বালানি সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে।
থাইল্যান্ড
থাইল্যান্ড শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের ব্যবহার কমাতে তাপমাত্রা নির্দিষ্ট সীমায় রাখার নির্দেশ দিয়েছে এবং কর্মীদের বাসা থেকে কাজ করতে উৎসাহিত করছে।
ইথিওপিয়া
ইথিওপিয়া গুরুত্বপূর্ণ খাতে জ্বালানি সরবরাহে অগ্রাধিকার দিচ্ছে এবং সাশ্রয়ী ব্যবস্থায় বিধিনিষেধ আরোপ করেছে।
মিয়ানমার
মিয়ানমার জোড়–বিজোড় নম্বরের ভিত্তিতে ব্যক্তিগত গাড়ি চলাচল নিয়ন্ত্রণ করছে এবং জ্বালানি কেনাবেচায় কিউআর কোড নজরদারি চালু করেছে।
ভিয়েতনাম
ভিয়েতনাম গণপরিবহন, সাইকেল ও কারপুলিং ব্যবহারে উৎসাহ দিচ্ছে। জ্বালানির ওপর কর সাময়িকভাবে কমানো হয়েছে।
স্লোভেনিয়া
স্লোভেনিয়া ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে প্রথম জ্বালানি রেশনিং চালু করেছে। ব্যক্তিগত ও ব্যবসায়িক ব্যবহারের জন্য জ্বালানি কেনার সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে।
দক্ষিণ সুদান
দক্ষিণ সুদান বিদ্যুৎ সরবরাহে রেশনিং শুরু করেছে। তেলসমৃদ্ধ দেশ হলেও পরিশোধিত জ্বালানির জন্য আমদানির ওপর নির্ভরশীল।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, তেলের সরবরাহে বিঘ্ন দীর্ঘস্থায়ী হলে এর প্রভাব আরও গভীর হতে পারে। তাই অনেক দেশ আগেভাগেই সাশ্রয়ী নীতি ও বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করছে।
পূর্বের পোস্ট :