দীর্ঘ ৫৪ বছরের প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে আবারও চাঁদের কক্ষপথের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেছে মানুষ। নাসার ঐতিহাসিক ‘আর্টেমিস টু’ মিশনে চার নভোচারী এখন মহাকাশে, যারা রেকর্ড পরিমাণ দূরত্ব অতিক্রম করে চাঁদের চারপাশ ঘুরে পৃথিবীতে ফিরবেন।

বাংলাদেশ সময় বৃহস্পতিবার ভোর ৪টা ৩৫ মিনিটে যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় নাসার কেনেডি স্পেস সেন্টার থেকে ‘স্পেস লঞ্চ সিস্টেম’ (এসএলএস) রকেটের মাধ্যমে ওরিয়ন মহাকাশযানটি উৎক্ষেপণ করা হয়। উৎক্ষেপণের ঐতিহাসিক মুহূর্ত প্রত্যক্ষ করতে হাজার হাজার মানুষ সেখানে ভিড় করেন।

প্রায় ১০ দিনের এই অভিযানে অংশ নিয়েছেন নাসার নভোচারী রিড ওয়াইজম্যান, ভিক্টর গ্লোভার, ক্রিস্টিনা কোচ এবং কানাডিয়ান স্পেস এজেন্সির জেরেমি হ্যানসেন। তারা চাঁদের কক্ষপথে গিয়ে ঘুরে আবার পৃথিবীতে ফিরে আসবেন।

তবে এই মিশনে নভোচারীরা চাঁদে অবতরণ করবেন না। বরং ভবিষ্যৎ চন্দ্রাভিযান ও মঙ্গল মিশনের প্রস্তুতি হিসেবে ওরিয়ন মহাকাশযানের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সিস্টেমের কার্যকারিতা পরীক্ষা করা হবে।

একুশ শতকের প্রথম মানববাহী চন্দ্রাভিযান

আর্টেমিস টু মিশনটি একাধিক ‘প্রথম’-এর সাক্ষী। এবারই প্রথম এসএলএস রকেট ও ওরিয়ন মহাকাশযান নভোচারী নিয়ে যাত্রা করল। এর আগে ২০২২ সালে ‘আর্টেমিস ১’ মিশনে কোনো মানুষ ছাড়াই চাঁদ প্রদক্ষিণ করা হয়েছিল।

এ মিশনে প্রথমবারের মতো কোনো নারী, কোনো কৃষ্ণাঙ্গ নভোচারী এবং কোনো অ-মার্কিন নাগরিক চাঁদের কক্ষপথে যাচ্ছেন। পাশাপাশি, এই প্রথম কোনো মহাকাশযানে পূর্ণাঙ্গ শৌচাগার ব্যবস্থাসহ চাঁদের চারপাশে ভ্রমণ করা হচ্ছে।

নভোচারী ক্রিস্টিনা কোচ বলেন, এই মিশনের গুরুত্ব শুধু ‘প্রথম’ অর্জনে নয়, বরং নতুন প্রজন্মের জন্য সমান সুযোগ তৈরিতে।

রেকর্ড গড়ার পথে

এই মিশনে নভোচারীরা পৃথিবী থেকে সর্বোচ্চ দূরত্বে যাওয়ার নতুন রেকর্ড গড়তে যাচ্ছেন। চাঁদের ‘ফার সাইড’ বা উল্টো পিঠ ঘুরে আসার সময় তারা পৃথিবী থেকে প্রায় ৪ লাখ ৬ হাজার ৮৪১ কিলোমিটার দূরে অবস্থান করবেন।

এটি ১৯৭০ সালের ‘অ্যাপোলো ১৩’ মিশনের রেকর্ড ছাড়িয়ে যাবে প্রায় ৬ হাজার ৪০০ কিলোমিটার।

তবে নাসা বলছে, দূরত্বের রেকর্ডের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো এই যাত্রায় অর্জিত অভিজ্ঞতা ও প্রযুক্তিগত সাফল্য।

ভবিষ্যৎ লক্ষ্য: চাঁদে ফেরা ও মঙ্গল অভিযান

আর্টেমিস কর্মসূচির মূল লক্ষ্য ২০২৮ সালের মধ্যে আবারও মানুষের পা চাঁদে ফেলা এবং ২০৩২ সালের মধ্যে সেখানে স্থায়ী ঘাঁটি গড়ে তোলা। এই মিশনের সাফল্যের ওপরই নির্ভর করছে সেই পরিকল্পনার বাস্তবায়ন।

নাসা ইতোমধ্যে ২০২৭ সালে ‘আর্টেমিস ৩’ মিশনের পরিকল্পনা করেছে, যেখানে মহাকাশযান ডকিংয়ের মহড়া দেওয়া হবে। পরবর্তী মিশনগুলোতে চাঁদে মানুষের অবতরণ এবং নিয়মিত চন্দ্রাভিযান শুরু করার লক্ষ্য রয়েছে।

মহাকাশে নতুন প্রতিযোগিতা

এই কর্মসূচির পেছনে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। চীন ২০৩০ সালের মধ্যে চাঁদে নভোচারী পাঠানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। ফলে মহাকাশে আধিপত্য প্রতিষ্ঠায় নতুন করে প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে।

নাসার কর্মকর্তারা বলছেন, চাঁদই হবে ভবিষ্যৎ মঙ্গল অভিযানের প্রধান সোপান।

মিশনের বর্তমান অবস্থা

নভোচারীরা ইতোমধ্যে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের সীমানা ‘কারমান লাইন’ অতিক্রম করে কক্ষপথে প্রবেশ করেছেন। আগামী দিনগুলোতে তারা ওরিয়ন মহাকাশযানের লাইফ সাপোর্ট, নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তির পরীক্ষা চালাবেন।

এই মিশনটি ‘ফ্রি-রিটার্ন ট্র্যাজেক্টরি’ অনুসরণ করছে, যার মাধ্যমে মহাকাশযানটি চাঁদের চারপাশ ঘুরে স্বয়ংক্রিয়ভাবে পৃথিবীতে ফিরে আসবে।

সব কিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে, দীর্ঘ পাঁচ দশক পর মানুষের চাঁদে ফেরার পথ আরও একধাপ এগিয়ে যাবে।