অ্যাপোলো যুগের পর আবারও চাঁদে মানুষ পাঠানোর লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা হাতে নিয়েছে উচ্চাভিলাষী ‘আর্টেমিস’ কর্মসূচি। শুধু চাঁদে অবতরণ নয়, সেখানে মানুষের দীর্ঘমেয়াদি উপস্থিতি নিশ্চিত করা এবং ভবিষ্যতে মঙ্গল গ্রহে যাওয়ার প্রস্তুতির অংশ হিসেবেও এই প্রকল্পকে দেখা হচ্ছে।

বিশ্বের আরেক শক্তিধর দেশ চীন-এর সঙ্গে মহাকাশ প্রতিযোগিতার প্রেক্ষাপটে নিজেদের নেতৃত্ব ধরে রাখার কৌশল হিসেবেও এই কর্মসূচিকে গুরুত্ব দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র।

কর্মসূচির শুরু ও লক্ষ্য নির্ধারণ

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প-এর প্রথম মেয়াদে নাসাকে চাঁদে ফেরার নির্দেশ দেওয়া হয়। এর মাধ্যমে মঙ্গল গ্রহের বদলে আবার চাঁদে মানুষের উপস্থিতি নিশ্চিত করার দিকে জোর দেওয়া হয়।

এই কর্মসূচির মূল ভরকেন্দ্র ‘স্পেস লঞ্চ সিস্টেম’ রকেট ও ‘ওরিয়ন’ মহাকাশযান, যা আগে বাতিল হওয়া ‘কনস্টেলেশন’ কর্মসূচির অংশ ছিল। এসব প্রকল্পে যুক্ত রয়েছে বোয়িং, নরথ্রপ গ্রুম্যান এবং লকহিড মার্টিন।

২০১৯ সালে হোয়াইট হাউস ২০২৪ সালের মধ্যে চাঁদে নভোচারী পাঠানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করে এবং তখনই ‘মুন টু মার্স’ কর্মসূচির নতুন নাম দেওয়া হয় ‘আর্টেমিস’।

দেরি, প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ ও নতুন অংশীদার

প্রযুক্তিগত জটিলতা, অতিরিক্ত ব্যয় এবং মহামারির কারণে কর্মসূচির সময়সূচি পিছিয়ে যায়। এই সময়ে নাসা প্রথম লুনার ল্যান্ডার হিসেবে স্পেসএক্স-এর স্টারশিপকে বেছে নেয়, যার প্রতিষ্ঠাতা ইলন মাস্ক।

পরে প্রতিযোগিতায় যোগ দেয় ব্লু অরিজিন, যা জেফ বেজোস-এর মালিকানাধীন।

২০২২: প্রথম বড় সাফল্য

২০২২ সালের নভেম্বরে ‘আর্টেমিস ১’ সফলভাবে উৎক্ষেপণ করে নাসা। এতে চালকবিহীন ওরিয়ন মহাকাশযান ২৫ দিন চাঁদের কক্ষপথে ঘুরে পৃথিবীতে ফিরে আসে। এই মিশনের মাধ্যমে ন্যাভিগেশন, যোগাযোগ ও তাপ সুরক্ষা ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা সম্পন্ন হয়।

সময়সূচি পুনর্নির্ধারণ

প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন-এর প্রশাসনের সময় চাঁদে মানুষ পাঠানোর সময়সীমা পিছিয়ে ২০২৭ সাল করা হয়। একই সময়ে চাঁদে যাওয়ার ক্ষেত্রে চীনের অগ্রগতিও বিবেচনায় আনা হয়।

আর্টেমিস ২: মানুষ নিয়ে চাঁদের পথে

নাসা ‘আর্টেমিস ২’ মিশনের জন্য চার নভোচারীর নাম ঘোষণা করেছে। এই মিশন হবে ১৯৭২ সালের অ্যাপোলো ১৭ অভিযান-এর পর প্রথম মানববাহী চাঁদ অভিযান।

২০২৬ সালের ১ এপ্রিল নির্ধারিত এই মিশনে নভোচারীরা চাঁদের চারপাশে ঘুরে আসবেন, তবে অবতরণ করবেন না। প্রায় ১০ দিনের এই মিশন ভবিষ্যৎ অবতরণের প্রস্তুতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হিসেবে বিবেচিত।

নতুন নেতৃত্বে পরিবর্তন

নাসার প্রশাসক জ্যারেড আইজ্যাকম্যান দায়িত্ব নেওয়ার পর কর্মসূচিতে বড় পরিবর্তন আনেন। তিনি চাঁদের কক্ষপথে মহাকাশ স্টেশন তৈরির পরিকল্পনা বাতিল করে সেই সম্পদ চাঁদের পৃষ্ঠে স্থায়ী ঘাঁটি তৈরিতে ব্যবহারের সিদ্ধান্ত দেন।

এ ছাড়া চাঁদে অবতরণের আগে আরও একটি মানববাহী মিশন যুক্ত করার পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে, যাতে নভোচারীরা মহাকাশে কাজের বাড়তি অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারেন।

ভবিষ্যৎ লক্ষ্য: চাঁদ থেকে মঙ্গল

আর্টেমিস কর্মসূচির লক্ষ্য বাণিজ্যিকভাবে তৈরি ল্যান্ডারের মাধ্যমে আবার চাঁদে নভোচারী পাঠানো। এ ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা করছে স্পেসএক্স ও ব্লু অরিজিন।

নাসার মতে, চাঁদে এই দীর্ঘমেয়াদি উপস্থিতিই ভবিষ্যতে মঙ্গল গ্রহে মানুষের অভিযান পরিচালনার জন্য ভিত্তি তৈরি করবে।