দ্বিতীয় মাসে গড়ানো ইরানকে ঘিরে চলমান যুদ্ধে সবচেয়ে বেশি চাপ পড়েছে উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের ছয় সদস্য রাষ্ট্রের ওপর। হামলার সংখ্যা, নিরাপত্তা ঝুঁকি ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা—সব মিলিয়ে এই দেশগুলোর সামনে এখন বড় প্রশ্ন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের পাশে দাঁড়িয়ে সরাসরি যুদ্ধে নামা ছাড়া আর কোনো পথ খোলা আছে কি না।

মার্কিন গবেষণা প্রতিষ্ঠান কুইন্সি ইনস্টিটিউট ফর রেসপনসিবল স্টেটক্র্যাফ্ট-এর তথ্য অনুযায়ী, ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ইরান যে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে, তার ৮৩ শতাংশই ছিল এই পরিষদের দেশগুলোর দিকে। বাকি ১৭ শতাংশ হামলা হয়েছে ইসরায়েলের ওপর।

সবচেয়ে বেশি হামলার শিকার হয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত। এখন পর্যন্ত দেশটিতে ২ হাজার ১৮৭টি হামলায় ৮ জন নিহত ও ১৬১ জন আহত হয়েছেন। এরপর রয়েছে কুয়েত, যেখানে ৯৫১টি হামলায় ৫ জন নিহত ও ১০৩ জন আহত হয়েছেন। তৃতীয় অবস্থানে থাকা সৌদি আরব-এ ৮০২টি হামলায় ৩ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং আহত হয়েছেন ১৫ জন।

এ ছাড়া বাহরাইন, ওমান ও কাতার-এও দফায় দফায় হামলা চালিয়েছে তেহরান।

গবেষক অ্যানেল শেলাইন মনে করেন, ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার ক্ষোভ থেকেই আমিরাতে বেশি হামলা চালানো হয়েছে। কুয়েতের ক্ষেত্রে ভৌগোলিক নৈকট্য বড় কারণ। তাঁর মতে, এই পরিষদের সব দেশেই যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি থাকায় ইরানের দৃষ্টিতে এগুলো বৈধ লক্ষ্যবস্তু হয়ে উঠেছে।

যদিও শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার কারণে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি এড়ানো গেছে, তবুও দীর্ঘমেয়াদে এই হামলা উপসাগরীয় অর্থনীতির জন্য বড় হুমকি তৈরি করছে। বিশেষ করে বিদেশি শ্রমিক ও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা বাড়ছে। এতে আমিরাত ও কাতারের মতো দেশগুলো বেশি ঝুঁকিতে পড়তে পারে, যাদের অর্থনীতি অনেকাংশেই নিরাপত্তা ও বিলাসিতার ভাবমূর্তির ওপর নির্ভরশীল।

এই যুদ্ধ সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে সৌদি আরবের জন্য। যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান-এর ‘ভিশন ২০৩০’ পরিকল্পনা—যার লক্ষ্য তেলনির্ভরতা কমানো—এখন অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। যদিও ২০২৩ সালে ইরান ও সৌদি আরব সম্পর্ক স্বাভাবিক করার উদ্যোগ নেয়, বর্তমান পরিস্থিতি সেই অগ্রগতিকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল শুরু থেকেই উপসাগরীয় দেশগুলোকে সরাসরি যুদ্ধে অংশ নিতে চাপ দিয়ে আসছে। তবে এখনো এই পরিষদের দেশগুলো সে পথে হাঁটেনি। বিশ্লেষকদের মতে, তাদের সামনে এখন বিকল্প হিসেবে রয়েছে—ইরানের সঙ্গে উত্তেজনা কমানো, নতুন আঞ্চলিক জোট গঠন অথবা যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা কমানো।

ইতোমধ্যে পাকিস্তান, তুরস্ক ও মিশর-এর সঙ্গে সম্ভাব্য নিরাপত্তা সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।

বিশ্লেষণ বলছে, উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটিগুলো এখন নিরাপত্তার চেয়ে বেশি ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। তবে দীর্ঘদিনের কৌশলগত সম্পর্কের কারণে এই নির্ভরতা থেকে বেরিয়ে আসা সহজ নয়।

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আশা প্রকাশ করেছেন, কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই সংঘাত শেষ হতে পারে। কিন্তু একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সেনা ও সামরিক উপস্থিতি বাড়ানোয় সেই আশার বাস্তবতা নিয়ে সংশয় রয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই যুদ্ধের প্রভাব শুধু উপসাগরীয় অঞ্চলেই সীমাবদ্ধ নয়; এর প্রভাব পড়ছে বৈশ্বিক অর্থনীতি ও নিরাপত্তার ওপরও। এই পরিষদের দেশগুলোর জন্য এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ—নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, না কি বৃহৎ শক্তির সংঘাতে জড়িয়ে পড়া এড়িয়ে চলা।