তৃতীয় সপ্তাহে গড়ালো ইরান, ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার সংঘাত যা পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে ঠেলে দিয়েছে বড় রকমের যুদ্ধ পরিস্থিতির দিকে।
তৃতীয় সপ্তাহে এসে ইরান বড় রকমের হুমকি দিয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের দেশ সংযুক্ত আরব আমিরাতকে। মধ্যপ্রাচ্যের ব্যবসায়িক প্রাণভূমি হিসাবে খ্যাত দেশটির বন্দর খালি করতে বার্তা দিয়েছে ইরান।
দেশটি এক বার্তা জানিয়েছে, আরব আমিরাতের বন্দর ও ডকইয়ার্ড সাইটকে কাজে লাগিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের খারগ দ্বীপে হামলা চালাচ্ছে। তেল রফতানির টার্মিনাল হিসাবে ইরান এই দ্বীপকে ব্যবহার করে। মূলত ইরানের তেল সরবরাহ রুখে দিতেই যুক্তরাষ্ট্রের এই হামলা বলে অভিযোগ তেহরানের।
বন্দর খালি করতে বলায় ধারণা করা হয়েছিল কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই আমিরাতের গুরুত্বপূর্ণ এসব স্থাপনায় হামলা চালাবে ইরান। যদিও দুবাইয়ের ব্যস্ততম বন্দর জেবেল আলি ও আবুধাবির খলিফা বন্দরে ইরান এখনো কোনো হামলা চালায়নি, তবে ফুজারিয়াহ বন্দরে ইতোমধ্যে ইরান ড্রোন হামলা শুরু করেছে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি জানিয়েছেন, দুবাইয়ের আশপাশের এলাকা থেকে ইরানের তেলসমৃদ্ধ দ্বীপপুঞ্জে হামলা চালাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটিকে রুখে দিতেই আমিরাতে ফিরতি হামলা চালাতে হচ্ছে ইরানকে। এই হামলায় লোকালয়ে যেন হতাহতের ঘটনা না ঘটে সে বিষয়ে যথাসাধ্য সজাগ থাকবে ইরান।
যদিও ইরানের এই অভিযোগ নিয়ে এখনো কিছু জানায়নি যুক্তরাষ্ট্র। মুখে একরকমের কুলুপ এঁটে বসে আছে আমিরাতও। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই মধ্যপ্রাচ্যের দেশে আমেরিকান ঘাটি লক্ষ্য করে হামলা চালাচ্ছে ইরান। এই হামলায় সাধারণ নাগরিকদের হতাহতের মতো ঘটনা ঘটেছে।
যুদ্ধের তৃতীয় সপ্তাহে উত্তেজনা চরমে পৌঁছেছে হরমুজ প্রণালীকে কেন্দ্র করে, যেখান থেকে পুরো পৃথিবীর পাঁচ ভাগের এক ভাগ বাণিজ্যিক তেল বহনকারী জাহাজ চলাচল করে। ইরান হরমুজ প্রণালী একরকমের বন্ধ করে দেয়ায় শুক্রবার ইরানের তেলসমৃদ্ধ অবকাঠামো ধ্বংস করে দেয়ার হুমকি দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে ইরানের তেল টার্মিনাল কিংবা মজুতের অবকাঠামো ধ্বংসের চেষ্টা করা হলে যুদ্ধ আরও ভয়াবহ রূপ নেবে বলে হুঁশয়ারি ইরানের।
হরমুজ প্রণালী একেবারে বন্ধ করে দেয়া হয়নি জানিয়ে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “যারা ইরান আক্রমণ করছে, আক্রমণকারী দেশকে মদদ দিচ্ছে এবং তাদের মিত্র হিসাবে পরিচিত একমাত্র তাদের জন্যই হরমুজ প্রণালী বন্ধ। বাকি যারা আছে তারা এই প্রণালী ব্যবহার করে তেল পরিবহন করতে পারবেন।”
হরমুজ প্রণালীতে তেল সরবরাহ স্বাভাবিক করতে ট্রাম্প রীতিমতো মরিয়া হয়ে উঠেছে। শনিবার তিনি চীন, ফ্রান্স, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও যুক্তরাজ্যকে হরমুজ প্রণালীতে যুদ্ধজাহাজ পাঠানোর আহ্বান জানিয়েছেন। যুক্তরাজ্য জানিয়েছে, সরবরাহ স্বাভাবিক করতে এখুনি যুদ্ধজাহাজ পাঠানোর কথা চিন্তা করছেন না তারা। বরং বিকল্প পন্থায় কীভাবে সরবরাহ স্বাভাবিক করা যায় তা নিয়ে মিত্র দেশগুলোর সঙ্গে আলাপ চলছে।
ট্রাম্পের এই আহ্বানকে ভিক্ষাবৃত্তির সঙ্গে তুলনা করে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশকে হরমুজের সার্বভৌমত্ব রক্ষার্থে একজোট হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
এদিকে ইসরাইল জানিয়েছে, গত চব্বিশ ঘণ্টায় তারা ইরানের ২০০ স্থানে মিসাইল হামলা চালিয়েছে। বিশেষ করে ইরানের অস্ত্র তৈরি কারখানা, মিসাইল নিক্ষেপের স্টেশন, প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ভবন ধ্বংসে এসব ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে বলে দাবি ইসরাইলের।
ইরান সমর্থিত লেবাননের হিজবুল্লাহ সংগঠনের ওপরেও হামলা চালিয়েছে ইসরাইল। এতে করে দেশটিতে ৮০০ বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। প্রাণভয়ে এলাকা ছেড়েছেন প্রায় সাড়ে ৮ লাখের বেশি মানুষ। বড় রকমের মানবিক বিপর্যয় সৃষ্টি হয়েছে দেশটিতে।
হামলা অব্যাহত রেখেছে ইরানও। শনিবার ইরাকের বাগদাদে মার্কিন কূটনৈতিক ভবনের হেলিপ্যাডে মিসাইল হামলা চালানো হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ইরাকে থাকা নাগরিকদের তৎক্ষনাৎ দেশ ছাড়ার বার্তা দিয়ে জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের লক্ষ্য করে হামলা চালানোর পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে ইরান ও ইরানের মদদপুষ্ট সশস্ত্র সংগঠনগুলো। এতে করে ইরাকে যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কিত যেকোনো স্থাপনা ও ব্যক্তির ওপর ইরান হামলা চালাতে পারে বলে শঙ্কা প্রকাশ করেছে যুক্তরাষ্ট্র।
সহসাই মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতি শান্ত হচ্ছেনা বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। আরব সাগরে নিজেদের অবস্থান শক্ত করছে যুক্তরাষ্ট্র। শনিবারও মধ্যপ্রাচ্যে আড়াই হাজার মেরিন সেনা পাঠিয়েছে দেশটি। গত সপ্তাহেই যুক্তরাষ্ট্রের বারোটি যুদ্ধজাহাজ নতুন করে অবস্থান নিয়েছে আরব সাগরে। সব মিলিয়ে তৃতীয় সপ্তাহে এসেও বলা মুশলিক মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি কোনদিকে মোড় নিচ্ছে।
পূর্বের পোস্ট :