দু’দিনের সফরে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় দিল্লির পালম ইন্দিরা গান্ধী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছান রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। প্রোটোকল ভেঙে তাকে স্বাগত জানান ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। প্রেসিডেন্ট প্রাসাদে নৈশভোজ শেষে দুই নেতা হায়দরাবাদ হাউজে ২৩তম ভারত–রাশিয়া শীর্ষবৈঠকে বসেন।

ইউক্রেইন যুদ্ধের পর রাশিয়াকে পশ্চিমাদের বিচ্ছিন্ন করার প্রচেষ্টার প্রেক্ষাপটে পুতিনকে দিল্লির এই অভ্যর্থনা পশ্চিমা দেশগুলোর প্রতি এক দৃশ্যমান বার্তা হিসেবে দেখছেন পর্যবেক্ষকেরা।

আড়ম্বর, কিন্তু বড় চুক্তি কম

পুতিনকে রাষ্ট্রপতি ভবনে ২১ বার তোপধ্বনি ও গার্ড অব অনার দিয়ে সম্মান জানানো হয়। তবে চুক্তির তালিকা ছিল তুলনামূলক ছোট।

রাশিয়া–ভারত অর্থনৈতিক সহযোগিতা কর্মসূচি, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ ও সাপ্লাই চেইন, এবং রাশিয়ার কালুগা অঞ্চলে যৌথ ফার্মাসিউটিক্যাল কারখানা নির্মাণ– এসব বিষয়ে সমঝোতা হয়।

জ্বালানির ক্ষেত্রে রাশিয়া ভারতকে ‘নিরবচ্ছিন্নভাবে’ সরবরাহ অব্যাহত রাখার কথা জানালেও বিস্তারিত কিছু জানায়নি। যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চ শুল্ক ও চাপের মধ্যে ভারতকে নিজস্ব সিদ্ধান্তে এগোতে হবে— এমন বার্তাও এসেছে মস্কোর পক্ষ থেকে।

প্রতিরক্ষা খাতে জঙ্গিবিমান ও এস–৪০০ নিয়ে গুঞ্জন থাকলেও কোনো বড় চুক্তি হয়নি। জাহাজ নির্মাণ ও বেসামরিক পারমাণবিক খাতে সমঝোতা হয়েছে।

রাশিয়ার পররাষ্ট্রনীতি উপদেষ্টা ইউরি উশাকভ জানিয়েছেন, মোদী–পুতিন রুদ্ধদ্বার বৈঠকেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর বিষয়গুলো আলোচনা হয়।

বাণিজ্যই ছিল কেন্দ্রবিন্দু

মোদীর আলিঙ্গনে বিরল কূটনৈতিক সৌজন্যে স্বাগত পেলেও চুক্তির ক্ষেত্রে বড় অগ্রগতি দেখা যায়নি।

রাশিয়া থেকে মূল্যছাড়ে ভারত তেল কেনা অব্যাহত থাকবে কি না— এ বিষয়ে দুই নেতা কোনো ঘোষণা দেননি।

তবে তাদের বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে, সফরের কেন্দ্র ছিল বাণিজ্য বিস্তার। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞায় আক্রান্ত রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চ শুল্কের চাপে থাকা ভারত— উভয় দেশই নতুন বাজার খুঁজছে।

দুই দেশের বাণিজ্য এখন ৬৮.৭২ বিলিয়ন ডলার, যা ২০২০ সালের ৮ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়েছে মূলত ভারতীয় তেল আমদানির কারণে।

রাশিয়ার ‘নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ’–এর প্রস্তাব যুক্তরাষ্ট্রের চাপের মধ্যেও ভারতকে রুশ তেল কেনা অব্যাহত রাখার এক ধরনের ইঙ্গিত বলেই বিশ্লেষকদের মত।

অন্যান্য চুক্তি ও ভবিষ্যৎ পথ

দুই দেশ পাঁচ বছরে ১০০ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে নতুন অর্থনৈতিক কাঠামো সই করেছে।

জাহাজ নির্মাণ, নাবিক প্রশিক্ষণ, নতুন শিপিং লেন, ভিসামুক্ত ভ্রমণ, গুরুত্বপূর্ণ খনিজসহ আরও বেশ কয়েকটি খাতে চুক্তি হয়।

মোদী জানান, ইউরেশিয়ান ইকোনমিক ইউনিয়নের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তিতে অগ্রগতি হয়েছে।

প্রতিরক্ষায় রাশিয়ার প্রভাব অটুট

এস–৪০০ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার বাকি ইউনিট সরবরাহে বিলম্ব হচ্ছে। ইউক্রেইন যুদ্ধের চাপের কারণে দ্রুত সরবরাহ রাশিয়ার জন্য কঠিন হতে পারে।

তবে দুই দেশের প্রতিরক্ষা সহযোগিতা অটুট এবং অলক্ষ্যে জঙ্গিবিমানসহ অন্যান্য বড় প্রকল্পে আলোচনা চলতে পারে— এমন ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।

সব মিলিয়ে, পুতিনের এবারের দিল্লি সফর আড়ম্বরপূর্ণ হলেও মূল কেন্দ্র ছিল অর্থনীতি ও বাণিজ্য; প্রতিরক্ষা খাতে বড় কোনো ঘোষণা আসেনি।