মালদ্বীপের সাবেক প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ নাশিদ বলেছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলো কোনো দান-খয়রাত বা অনুদান চায় না; তারা চায় ন্যায্য পাওনা।

“পৃথিবীর সম্পদ ব্যবহার করে কিছু দেশ নিজেদের সমৃদ্ধ করেছে, যার মূল্য দিতে হচ্ছে অন্য দেশগুলোকে। তাই জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর অধিকার নিশ্চিত করতে হবে,” সোমবার রাজধানীর একটি হোটেলে বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন-২০২৬-এর সমাপনী দিনে দেওয়া বক্তব্যে মোহাম্মদ নাশিদ এসব কথা বলেন।

তিন দিনব্যাপী এই আন্তর্জাতিক সম্মেলনের আয়োজন করে গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস)।

মোহাম্মদ নাশিদ বলেন, কিছু দেশ পৃথিবীর সম্পদ নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করে ধনী হয়েছে। কিন্তু এর মূল্য দিতে হয়েছে অন্যদের। নেপালের মানুষ এমন কিছু করেনি, যার কারণে দেশটিতে ভয়াবহ বন্যা হতে পারে। একইভাবে মালদ্বীপের মানুষও এমন কিছু করেনি, যার কারণে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা এতটা বেড়ে যেতে পারে। তাই এই ক্ষতির খেসারত কাউকে না কাউকে দিতে হবে।

তিনি বলেন, ‘আমি সমৃদ্ধি বুঝি, আমি বাণিজ্য বুঝি, আমি ফাইন্যান্স বুঝি। আমি জানি, পৃথিবীর সবকিছুই টাকার ওপর নির্ভর করে। কিন্তু সেই টাকা ব্যবহার করতে হলে আগে আমাদের বেঁচে থাকতে হবে।’

নাশিদের মতে, এমন উন্নয়ন কৌশল প্রয়োজন, যাতে অর্থনৈতিকভাবে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায়, কিন্তু পৃথিবী ও পরিবেশের ক্ষতি কম হয়।

তার ভাষায়, পৃথিবী যখন পরিবর্তিত হচ্ছে, তখন মানুষেরও নিজেদের অভ্যাস পরিবর্তন করা উচিত। তবে শুধু পৃথিবীকে বাঁচানোর জন্য দরিদ্র দেশগুলোর মানুষকে দরিদ্র অবস্থায় থাকতে বলা যায় না।

তিনি বলেন, ‘এমন কিছু দেশ রয়েছে, যারা এই গ্রহের সম্পদ নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করে ধনী হয়েছে—যা করা হয়েছে আমাদের বিনিময়ে।’

জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর অবদানের বিষয়টি তুলে ধরে মোহাম্মদ নাশিদ বলেন, এসব দেশ এখনো নিজেদের বেঁচে থাকার তাগিদে পৃথিবীকে পরিবেশগত সেবা দিয়ে যাচ্ছে। ফলে এর বিনিময়ে তাদের মূল্য পাওয়া উচিত।

তিনি বলেন, ‘আমরা কোনো দান-খয়রাত চাইছি না। আমরা কোনো অনুদান বা সাহায্য প্রার্থনা করছি না। আমরা কেবল একটি ন্যায্য বা সঠিক পাওনা চাইছি। কারণ আমরা এই গ্রহকে একটি পরিবেশগত সেবা দিচ্ছি।’

মালদ্বীপের সাবেক এই প্রেসিডেন্ট বলেন, প্রকৃতিকে রক্ষা করা না গেলে মানুষও বেঁচে থাকতে পারবে না। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে কোনো রাষ্ট্র যদি একসময় সমুদ্রের পানিতে তলিয়ে যায়, তখন শুধু মানুষ বেঁচে থাকলেই হবে না; দেশটির ভূখণ্ড ও রাষ্ট্রীয় সীমানার ভবিষ্যৎ নিয়েও প্রশ্ন উঠবে।

সমুদ্র আইন প্রসঙ্গে নাশিদ বলেন, উপকূল থেকে ১২ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত একটি দেশের রাজনৈতিক সীমানা নির্ধারিত হয়। কিন্তু সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়তে থাকায় কোনো দেশের তটরেখা যদি তলিয়ে যায়, তাহলে সেই দেশের ভূখণ্ড ও সীমানার কী হবে, সেটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

তিনি বলেন, মালদ্বীপের ২ হাজার নটিক্যাল মাইলের একটি অর্থনৈতিক অঞ্চল রয়েছে এবং ৩৫০ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত তারা বিভিন্ন সম্পদ ব্যবহার করতে পারে। এসব হিসাবই করা হয় উপকূলরেখার ভিত্তিতে। কিন্তু সমুদ্রের পানি বেড়ে উপকূল তলিয়ে গেলে এসব অধিকারের কী হবে, তা নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে।

নাশিদ বলেন, ‘আমাদের কারণে নয়, বরং আপনারা যা করেছেন, তার কারণে আমরা আমাদের দেশকে হারাতে পারি না।’ জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ভবিষ্যতে যে ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে, এটি তারই একটি বাস্তব উদাহরণ।

জলবায়ু পরিবর্তনকে শুধু অন্যদের সমস্যা হিসেবে দেখার মানসিকতারও সমালোচনা করেন তিনি। নাশিদ বলেন, অনেকে মনে করেন, মালদ্বীপ একদিন হারিয়ে যাবে। কিন্তু বিষয়টি শুধু মালদ্বীপের নয়; জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব সবার ওপরই পড়ছে।

তিনি বলেন, ‘মালদ্বীপ গায়েব হওয়ার আগে আপনার ভূখণ্ড বা আপনার দেশ হারিয়ে যাবে। এটি সবার সঙ্গেই ঘটছে। তাই দয়া করে জেগে উঠুন।’

জলবায়ু পরিবর্তনের বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে সমুদ্রসীমা নির্ধারণের বিষয়টি নতুন করে ভাবার আহ্বান জানিয়ে নাশিদ বলেন, সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর উচিত কোনো রাষ্ট্রের বা সমুদ্রসীমার সংজ্ঞা নতুন করে বিবেচনা করা।