জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো ছাড়া সরকারের সামনে কোনো বিকল্প ছিল না বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। একই সঙ্গে দাম বাড়ানোর কারণে সাধারণ মানুষের যে কষ্ট হবে, সে জন্য দুঃখ প্রকাশ করেছেন তিনি।

সোমবার জ্বালানি তেলের মূল্য সমন্বয় নিয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে প্রতিমন্ত্রী এসব কথা বলেন।

অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতির কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। এর সঙ্গে বিমার প্রিমিয়াম ও জাহাজভাড়াও বেড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে সরকারকে জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয়ের সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়া অত্যন্ত কঠিন। জনগণের জীবনমানের কষ্ট লাঘবের অভিপ্রায়েই রাজনীতিতে এসেছি। একজন রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে জনগণের যে কষ্ট হবে, তা আমি উপলব্ধি করি। সে কারণে জনগণের কাছে আন্তরিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করছি।’

সরকার আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয় করে সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়েছে। নতুন দামে ডিজেল, কেরোসিন, পেট্রোল ও অকটেনের দাম লিটারে ২০ টাকা করে বেড়েছে।

নতুন দাম অনুযায়ী ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ১৩৫ টাকা, কেরোসিন ১৩৫ টাকা, অকটেন ১৬০ টাকা এবং পেট্রোল ১৫৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। সোমবার থেকেই এ দাম কার্যকর হয়েছে।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, সরকার উপায়হীন না হলে এমন একটি ‘অজনপ্রিয় সিদ্ধান্ত’ নিতে চাইত না। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে জ্বালানি তেলের দাম আবার সমন্বয় করে আগের পর্যায়ে বা তার চেয়েও কমিয়ে আনার চেষ্টা করা হবে।

প্রতিমন্ত্রী জানান, গত মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয় না করায় বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনকে (বিপিসি) ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি টাকা লোকসান বহন করতে হয়েছে। এ সময়ে প্রতি মাসে গড়ে লোকসান হয়েছে ৩ হাজার ৮১৩ কোটি টাকা।

তিনি বলেন, বাংলাদেশে বছরে প্রায় ৭০ লাখ মেট্রিক টন জ্বালানি তেল আমদানি করতে হয়। এর মধ্যে ডিজেল প্রায় ৪৫ লাখ মেট্রিক টন। আন্তর্জাতিক বাজারে ডিজেলের গড় দাম প্রায় ২০৫ টাকা লিটার। মূল্য সমন্বয়ের আগে দেশে ডিজেলের দাম ছিল ১১৫ টাকা। অর্থাৎ প্রতি লিটারে প্রায় ৯০ টাকা ভর্তুকি বা লোকসান হচ্ছিল।

দাম বাড়ানোর পরও প্রতি লিটার ডিজেলে বিপিসিকে গড়ে প্রায় ৭০ টাকা ভর্তুকি দিতে হবে বলে জানান প্রতিমন্ত্রী।

তিনি বলেন, জ্বালানির দাম সমন্বয় না করলে শুধু ডিজেলেই বছরে সরকারের প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা লোকসান বা ভর্তুকি দিতে হতো। সব ধরনের জ্বালানি তেল মিলিয়ে এই অর্থের পরিমাণ প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা হতে পারত।

অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, জ্বালানি তেলে অতিরিক্ত ভর্তুকি অব্যাহত রাখলে সরকারের বিভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি বাধাগ্রস্ত হতে পারে। প্রতিবন্ধী সন্তানের মা সরকারি ভাতার ওপর নির্ভর করে সন্তানকে বড় করেন। বিধবা নারীরাও বিধবা ভাতার ওপর নির্ভর করে সংসার চালান। জ্বালানি খাতে অতিরিক্ত ভর্তুকি দিতে গেলে এসব কর্মসূচিতে অর্থসংকট তৈরি হতে পারে।

অসচ্ছল পরিবারগুলোকে পারিবারিক কার্ডের আওতায় আনার পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি। তাঁর ভাষ্য, এ কার্ডের মাধ্যমে প্রতি মাসে আড়াই হাজার টাকা করে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এতে মানুষের জীবনের অনিশ্চয়তা কিছুটা কমবে।

প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, সরকারি হাসপাতালগুলোতে বিনা মূল্যে ওষুধ সরবরাহ, ইপিআই কার্যক্রমসহ সরকারের বিভিন্ন কর্মসূচি জ্বালানি খাতে অতিরিক্ত ভর্তুকির কারণে বাধাগ্রস্ত হতে পারে। এ কারণেও সরকারকে মূল্য সমন্বয়ের সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, পার্শ্ববর্তী ও এ অঞ্চলের দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের দাম এত দিন সর্বনিম্ন পর্যায়ে ছিল।

তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, কলকাতায় ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ১৩৪ টাকা ৭৬ পয়সা, মিয়ানমারে ১৬৪ টাকা ৮৩ পয়সা, নেপালে ১৬১ টাকা ২৪ পয়সা, শ্রীলঙ্কায় ১৭৯ টাকা ৪২ পয়সা, থাইল্যান্ডে ১৫১ টাকা ২২ পয়সা, ভিয়েতনামে ১৩৭ টাকা, মালদ্বীপে ১৪০ টাকা, ফিলিপাইনে ১৬৮ টাকা ৫৩ পয়সা, পাকিস্তানে ১৮৫ টাকা ৪৮ পয়সা এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতে ১৪৪ টাকা ৭৯ পয়সা।

বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের দাম তুলনামূলক কম থাকায় প্রতিবেশী দেশে পাচারের ঝুঁকি তৈরি হয়েছিল বলেও জানান প্রতিমন্ত্রী। তাঁর ভাষ্য, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি অব্যাহত রাখা এবং জ্বালানি তেলের পাচার ঠেকাতে সরকারকে দাম সমন্বয় করতে হয়েছে।

প্রতিবেশী দেশে জ্বালানি তেল পাচারের কোনো তথ্য আছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বিভিন্ন দায়িত্বশীল সূত্র থেকে এ ধরনের ঝুঁকির কথা জানা গেছে। এসব তথ্যের ভিত্তিতেই সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে দেশে বাড়বে এবং কমলে কমবে—এমন স্বয়ংক্রিয় মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি পুরোপুরি কার্যকর করা হয়নি কেন, জানতে চাইলে প্রতিমন্ত্রী বলেন, সেটি পুরোপুরি কার্যকর করা হলে ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ২০৫ টাকা নির্ধারণ করতে হতো।

তিনি বলেন, দেশের কৃষক, সেচব্যবস্থা ও গণপরিবহন ২০৫ টাকা লিটার দামের ডিজেল দিয়ে পরিচালনা করা কঠিন হবে। তাই আন্তর্জাতিক বাজারের দামের সঙ্গে পুরোপুরি সমন্বয় না করে দেশে তুলনামূলক কম দাম রাখা হয়েছে।

আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ১৬ বছরে জ্বালানি তেলের দাম ৭২ থেকে ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছিল—সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে প্রতিমন্ত্রী বলেন, বর্তমান মধ্যপ্রাচ্য সংকটের পরিস্থিতি অতীতের সঙ্গে তুলনীয় নয়।

তিনি বলেন, বাংলাদেশ যেসব উৎস থেকে জ্বালানি সংগ্রহ করে, তার বড় একটি অংশ হরমুজ প্রণালির আশপাশের অঞ্চল থেকে আসে। বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ এই পথ দিয়ে পরিচালিত হয়। বাংলাদেশের আমদানিকৃত জ্বালানির প্রায় ৭০ শতাংশও এই রুটের ওপর নির্ভরশীল বলে জানান তিনি।

প্রতিমন্ত্রীর ভাষ্য, মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতি যে ধরনের সংকট তৈরি করেছে, তার সঙ্গে কোভিড-১৯ মহামারি বা রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সময়কার পরিস্থিতির তুলনা করা যায় না।

বিপিসির তহবিলে বিপুল অর্থ থাকার পরও লোকসানের কথা বলে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হচ্ছে কেন—এমন প্রশ্নের জবাবে প্রতিমন্ত্রী বলেন, বিপিসির তহবিলে অর্থ ছিল বলেই এত দিন দাম সমন্বয় না করেও ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি টাকা লোকসান বহন করা সম্ভব হয়েছে।

আইএমএফের ঋণের শর্ত প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বর্তমান সরকারের সময়ে ওই ঋণ নেওয়া হয়নি। আগের সরকার আইএমএফের কাছ থেকে ঋণ নেওয়ার সময় যেসব শর্ত নিয়েছিল, সেগুলো পূরণে সরকারের দায় থাকলে তা পূরণের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমার খবরের মধ্যেই বাংলাদেশে দাম বাড়ানো হলো কেন—এমন প্রশ্নের জবাবে প্রতিমন্ত্রী বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম প্রতিনিয়ত ওঠানামা করে। প্রতিটি ওঠানামার সঙ্গে সঙ্গে দেশের বাজারে দাম সমন্বয় করা সম্ভব নয়।

মধ্যপ্রাচ্যের সংকট দ্রুত কেটে যাবে বলে আশা প্রকাশ করে তিনি বলেন, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে দ্রুততম সময়ের মধ্যে জ্বালানি তেলের দাম আবার সমন্বয় করে আগের পর্যায়ে বা তার চেয়েও কমিয়ে আনার চেষ্টা করা হবে।