রপ্তানি আয়ের ফোলানো-ফাঁপানো তথ্য প্রকাশের অভিযোগ নিয়ে দুই বছর পেরিয়ে গেলেও পণ্য রপ্তানির পরিসংখ্যানে গরমিল কাটেনি। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার পেরিয়ে বর্তমানে বিএনপি সরকারের সময়েও রপ্তানি আয়ের হিসাব নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে।

বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরের ১১ মাসের (জুলাই-মে) রপ্তানি তথ্য প্রকাশ করেছে রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি)। তবে বাংলাদেশ ব্যাংক প্রকাশ করেছে ১০ মাসের (জুলাই-এপ্রিল) তথ্য। দুই সংস্থার প্রকাশিত তথ্য তুলনা করলে দেখা যাচ্ছে, ১০ মাসে ইপিবি ও বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবের পার্থক্য প্রায় ৪০০ কোটি ডলার।

এছাড়া ২০২৪-২৫ অর্থবছরের পুরো সময়ে দুই সংস্থার হিসাবের মধ্যে পার্থক্য ছিল ৪৩১ কোটি ডলার।

রপ্তানি আয়ের এই গরমিল নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেছেন তৈরি পোশাকশিল্প মালিকদের শীর্ষ সংগঠন বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি ও বাংলাদেশ চেম্বারের বর্তমান সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী পারভেজ।

তিনি বলেন, “এত কিছুর পরও ইপিবি ও বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে কেন ব্যবধান হচ্ছে বুঝতে পারছি না। এটা মোটেও কাম্য নয়।”

রপ্তানি আয়ের হিসাবে বড় গলদ ধরা পড়ার পর ২০২৪ সালের আগস্টে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়। অভিযোগ ওঠে, রপ্তানি আয় বেশি দেখাতে ইপিবি ফোলানো-ফাঁপানো তথ্য প্রকাশ করছে।

এ নিয়ে আলোচনা-সমালোচনার পর ২০২৪ সালের জুলাইয়ে ইপিবি রপ্তানি আয়ের হালনাগাদ তথ্য প্রকাশ বন্ধ করে দেয়। তখন সংস্থাটি জানিয়েছিল, পণ্য রপ্তানি থেকে আয়ের ‘প্রকৃত’ তথ্য প্রকাশের জন্য দুই-তিন মাস সময় লাগবে।

এরপর ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতন হলে মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়। পরে ৯ অক্টোবর ইপিবি চার মাসের (জুন-সেপ্টেম্বর) তথ্য একসঙ্গে প্রকাশ করে।

তৎকালীন ইপিবির ভাইস চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন জানিয়েছিলেন, ইপিবি রপ্তানির তথ্য সংগ্রহ করে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) থেকে। একই রপ্তানির তথ্য একাধিকবার হিসাব হওয়ার কারণে গরমিল তৈরি হয়েছিল।

তিনি আরও জানিয়েছিলেন, ইপিবি, এনবিআর, বাংলাদেশ ব্যাংক ও বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য সমন্বয় করে প্রতি মাসে রপ্তানির তথ্য প্রকাশ করা হবে।

তবে দুই অর্থবছর পার হতে চললেও পণ্য রপ্তানির পরিসংখ্যানের গরমিল পুরোপুরি দূর হয়নি।

২০২৪-২৫ অর্থবছর শেষে ইপিবি জানিয়েছিল, পণ্য রপ্তানি থেকে বাংলাদেশের আয় হয়েছে ৪ হাজার ৮২৮ কোটি ৩৯ লাখ ডলার। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে ওই অর্থবছরে পণ্য রপ্তানি আয় ছিল ৪ হাজার ৩৯৭ কোটি ডলার। অর্থাৎ দুই সংস্থার হিসাবে পার্থক্য ছিল ৪৩১ কোটি ডলার।

২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই-এপ্রিল সময়ের তথ্যেও একই ধরনের পার্থক্য দেখা গেছে। ইপিবির হিসাবে এই সময়ে পণ্য রপ্তানি আয় ছিল ৩ হাজার ৯৪০ কোটি ডলার। অন্যদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে আয় হয়েছে ৩ হাজার ৬০২ কোটি ডলার। পার্থক্য দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩৯০ কোটি ডলার।

সবশেষ এপ্রিল মাসে ইপিবি ৪০১ কোটি ডলার রপ্তানি আয়ের তথ্য দিলেও বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে ওই মাসে আয় হয়েছে ৩৬৩ কোটি ডলার। মার্চ মাসেও ইপিবির হিসাব ছিল ৩৪৯ কোটি ডলার, আর বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে তা ছিল ৩১২ কোটি ডলার।

বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২৪ সালের জুলাইয়ে জানিয়েছিল, এতদিন ইপিবির তথ্যের ভিত্তিতে রপ্তানির হিসাব করা হতো। কিন্তু সেই অনুযায়ী দেশে রপ্তানি আয় আসছিল না। এ কারণে প্রকৃত তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদন তৈরির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

ব্যাংকের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, ইপিবির তথ্যে একই রপ্তানির হিসাব একাধিকবার অন্তর্ভুক্ত হওয়া, স্থানীয় রপ্তানি ও নমুনা রপ্তানির তথ্য যুক্ত থাকা—এ ধরনের কারণে পার্থক্য তৈরি হয়েছে।

ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদরা বলছেন, রপ্তানির তথ্য সঠিক না হলে নীতি নির্ধারণে ভুল সিদ্ধান্ত হতে পারে এবং দেশের ভাবমূর্তিও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান মাসরুর রিয়াজ বলেন, “১০ মাসে ৪ বিলিয়ন ডলারের পার্থক্য কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যই সঠিক বলে মনে হচ্ছে। সামান্য ব্যবধান হতে পারে, কিন্তু এত বড় গরমিল গ্রহণযোগ্য নয়।”

ইপিবির ভাইস চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হাসান আরিফ বলেন, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) গাইডলাইন মেনে এনবিআর ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে সমন্বয় করে ইপিবি রপ্তানি পরিসংখ্যান প্রকাশ করে। তবে এত বড় পার্থক্য থাকার কথা নয় বলে তিনি বিষয়টি খতিয়ে দেখবেন বলে জানান।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বলেন, আগে এনবিআর, ইপিবি ও বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা বসে বিষয়টির সমাধান করেছিলেন। এরপরও কেন এত ব্যবধান হচ্ছে, তা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করে দেখা হবে।