বছর কয়েক ধরে টানা অর্থনৈতিক চাপের ভেতর দিয়ে যাওয়া বাংলাদেশের সামনে নতুন অর্থবছরের বাজেট প্রণয়ন এখন বড় এক পরীক্ষার নাম। মূল্যস্ফীতি, রাজস্ব ঘাটতি, বিনিয়োগ স্থবিরতা, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা ও বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার মধ্যে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট করতে হচ্ছে সরকারকে। এর মধ্যেই নির্বাচনের আগে বিএনপির দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়নের চাপও থাকছে অর্থমন্ত্রীর ওপর।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এবারের বাজেটে চমকের সুযোগ খুব কম। বরং সরকারের সামনে “কি করা যাবে”র চেয়ে “কি করা যাবে না”র তালিকাই দীর্ঘ।
তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর অর্থনীতিতে স্থিতি ফেরার আশা তৈরি হলেও ইরান যুদ্ধ ও বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতায় সেই প্রত্যাশা শুরুতেই ধাক্কা খেয়েছে। জ্বালানি তেলের দাম বাড়ছে, বিদ্যুতের দাম বাড়ার আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব আবার মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে দিতে পারে বলে শঙ্কা রয়েছে।
বিশ্ব ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, “সাশ্রয়ী হওয়াটা এখন কোনো বিকল্প না, এটা বাধ্যবাধকতা।”
তার মতে, এখন সরকারের প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখা এবং নিম্নআয়ের মানুষের দুর্ভোগ যেন আরও না বাড়ে, তা নিশ্চিত করা।
বড় বাজেটের পরিকল্পনা, কিন্তু অর্থের জোগান কোথায়?
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্র বলছে, আগামী বাজেটের সম্ভাব্য আকার ধরা হচ্ছে প্রায় ৯ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আকার বাড়িয়ে ৩ লাখ কোটি টাকা করার পরিকল্পনা রয়েছে।
নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির জন্য ১৩ হাজার কোটি টাকা, সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন বেতন কাঠামোর আংশিক বাস্তবায়নে প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকা এবং ঋণের সুদ পরিশোধে বড় অঙ্কের অর্থ বরাদ্দের কথাও ভাবা হচ্ছে।
চলতি অর্থবছরেই শুধু সুদ পরিশোধে সরকারের ব্যয়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ লাখ ২২ হাজার কোটি টাকা। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বাড়তি দামে জ্বালানি আমদানির চাপ।
অর্থ সচিব মো. খায়েরুজ্জামান মজুমদার বলেন, “দীর্ঘদিন সংকোচনমূলক বাজেট করলে প্রবৃদ্ধিতে কাঠামোগত দুর্বলতা তৈরি হয়। সেই চিন্তা থেকেই বাজেটের আকার বড় করার কথা ভাবা হচ্ছে।”
রাজস্ব ঘাটতি ও ঋণনির্ভরতার শঙ্কা
সরকারের সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তার জায়গা এখন রাজস্ব আদায়। চলতি অর্থবছরের প্রথম নয় মাসেই প্রায় ৯৮ হাজার কোটি টাকার ঘাটতি দেখেছে এনবিআর।
আগামী অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ৬ লাখ কোটি টাকার বেশি ধরা হতে পারে বলে আলোচনা চলছে। তবে অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বর্তমান বাস্তবতায় এমন প্রবৃদ্ধি অর্জন অত্যন্ত কঠিন।
সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেন, বিদেশি ঋণের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল না হয়ে অভ্যন্তরীণ রাজস্ব ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করাই এখন জরুরি।
তিনি বলেন, “সংস্কার ছাড়া রাজস্ব আহরণ বাড়বে না। তবে সংস্কারও রাতারাতি করা সম্ভব নয়।”
এদিকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল-আইএমএফের ঋণের কিস্তি ছাড় আটকে আছে নতুন শর্তের কারণে। ফলে বাজেট ঘাটতি পূরণে সরকার ব্যাংক ঋণের ওপর আরও নির্ভরশীল হয়ে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, সরকার যদি অতিরিক্ত ব্যাংক ঋণ নেয়, তাহলে বেসরকারি খাতের জন্য ঋণপ্রবাহ আরও সংকুচিত হতে পারে।
মূল্যস্ফীতির চাপে সাধারণ মানুষ
দেশে মূল্যস্ফীতি দীর্ঘদিন ধরেই উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। এপ্রিল শেষে তা আবার ৯ শতাংশে পৌঁছেছে।
এ অবস্থায় সরকার যদি টাকা ছাপিয়ে বাজেট ঘাটতি মোকাবিলার পথে হাঁটে, তাহলে মূল্যস্ফীতি আরও বাড়তে পারে বলে সতর্ক করছেন অর্থনীতিবিদরা।
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী অবশ্য বলেছেন, “টাকা ছাপানো এবং বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে উচ্চ সুদের বড় ঋণ নেওয়া এড়িয়ে চলা আমাদের এক নম্বর অগ্রাধিকার।”
তবে একই সঙ্গে তিনি বড় বাজেটের প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেছেন।
তার ভাষায়, “আপনি যদি প্রবৃদ্ধি চান, বিনিয়োগ চান, তাহলে বাজেট বাড়ানো ছাড়া উপায় নেই।”
সামাজিক নিরাপত্তা বনাম আর্থিক সক্ষমতা
উচ্চ মূল্যস্ফীতির মধ্যে সরকার ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড ও কৃষিঋণ মওকুফের মতো কর্মসূচি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে। এসব উদ্যোগ নিম্নআয়ের মানুষের জন্য স্বস্তি আনলেও সরকারের ব্যয়ের চাপ বাড়াচ্ছে।
অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলছেন, এখন দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে সরাসরি সহায়তা দেওয়া ছাড়া সরকারের সামনে খুব বেশি বিকল্প নেই।
তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির অর্থ যেন প্রকৃত উপকারভোগীদের কাছেই পৌঁছায়, সেটি নিশ্চিত করাও বড় চ্যালেঞ্জ।
সংস্কারের ওপর জোর
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে শুধু বড় বাজেট করলেই হবে না, কাঠামোগত সংস্কারেও জোর দিতে হবে সরকারকে।
জাহিদ হোসেনের ভাষায়, “এনবিআরের দক্ষতা ও সুশাসন বাড়াতে হবে, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা কাটাতে হবে।”
তার মতে, এসব সংস্কার বাস্তবায়িত হলে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের আস্থা বাড়বে এবং বিদেশি অর্থায়ন পাওয়াও সহজ হবে।
অর্থনীতিবিদদের পর্যবেক্ষণ, এবার সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে—একদিকে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, অন্যদিকে প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা এবং একই সঙ্গে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন।
সংকটের এই বাস্তবতায় আগামী বাজেট কতটা স্বস্তি দিতে পারে, এখন সেদিকেই নজর সবার।
পূর্বের পোস্ট :