১০ দিনের ঐতিহাসিক সফরে নাসার আর্টেমিস টু মিশনের সফল সমাপ্তি টেনে ওরিয়ন ক্যাপসুলে চড়ে চার নভোচারী ফিরলেন পৃথিবীতে।

বাংলাদেশ সময় শনিবার সকাল ৬টা ৭ মিনিট ২৭ সেকেন্ডে (যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় সময় শুক্রবার সন্ধ্যা ৭টা ৭ মিনিটে) স্যান ডিয়েগোর কাছে প্রশান্ত মহাসাগরে অবতরণ করে ওরিয়ন।

এই মিশনে মোট সময় লেগেছে নয় দিন এক ঘণ্টা ৩২ মিনিট ৫ সেকেন্ড।

অবতরণ পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে নাসা ওরিয়ন কর্মসূচির ব্যবস্থাপক হাওয়ার্ড হু বলেন, “আজকের দিনটি মানুষের মহাকাশ অনুসন্ধানের একটি নতুন যুগের সূচনা।”

এন্ট্রি ফ্লাইট ডিরেক্টর রিক হেনফ্লিং জানান, আর্টেমিস টু মিশনের নভোচারীরা মোট ৭ লাখ ২৩৭ মাইল ভ্রমণ করেছেন এবং ঘণ্টায় সর্বোচ্চ গতি ছিল ২৪ হাজার ৬৬৪ মাইল।

ইউএসএস জন পি মার্থা থেকে নাসার তরফে মেগান ক্রুজ মজা করে বলেন, “গ্রিন মানে তারা খুব ভালো অনুভব করছেন, তাদের ত্বকের রঙ নয়।”

এ মিশনকে ‘বিশ্বের জন্য একটি উপহার’ হিসেবে বর্ণনা করে নাসার সহযোগী প্রশাসক অমিত ক্ষত্রিয় বলেছেন, প্রত্যাশার চেয়েও বেশি সফল হয়েছে মিশন।

তিনি এও বলেন, নভোচারীদের নির্ধারিত মেডিকেল বে’তে নিয়ে যাওয়ার জন্য এখনও কিছু কাজ বাকি আছে, তবে নভোচারীদের দেখতে ‘চমৎকার’ লাগছে।

“আমরা একসঙ্গে কাজ করলে কী করতে পারি, দেখুন... সমস্যাগুলো যত কঠিনই হোক না কেন, আমরা সেগুলো সমাধান করতে পারি।”

পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশের পর এর তিনটি লাল সাদা প্যারাশুট খুলে যায় এবং ওরিয়নের গতি কমিয়ে আনতে সহায়তা করে। এক সময় এ মহাকাশযান নেমে আসে পানিতে, যাকে বলা হচ্ছে স্প্ল্যাশডাউন।

নাসার নভোচারী রিড ওয়াইজম্যানের নেতৃত্বে এ মিশনে ছিলেন পাইলট ভিক্টর গ্লোভার, মিশন স্পেশালিস্ট ক্রিস্টিনা কোচ ও কানাডীয় নভোচারী জেরেমি হ্যানসেন। একে একে তাদেরকে ওরিয়ন ক্যাপসুল থেকে বের করে হেলিকপ্টারের মাধ্যমে তুলে এনে নেওয়া হয়েছে কাছাকাছি মার্কিন নৌবাহিনীর একটি জাহাজে।

এরপর শুরু হবে নতুন অভিযানে প্রস্তুতি। ওরিয়ন ক্যাপসুল থেকে প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণ করা হবে। সব ঠিক থাকলে ২০২৬ সালের শেষে আর্টেমিস থ্রি মিশনে আবার চাঁদের মাটিতে পা পড়বে মানুষের। তার আগের এক চূড়ান্ত পরীক্ষা হয়ে গেল আর্টেমিস টু মিশনে।

দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর মহাকাশ গবেষণায় এক ঐতিহাসিক মুহূর্তের সাক্ষী হল বিশ্ব। পৃথিবীর কক্ষপথ ছাড়িয়ে চাঁদের আকাশ ছুঁয়ে আসার এ রোমাঞ্চকর অভিযানে আর্টেমিস টু মিশন যে সাফল্য দেখাল, তা চাঁদের বসতি গড়ার স্বপ্নকে আরো একধাপ এগিয়ে নিয়ে গেল।

আর্টেমিস টু মিশন একের পর এক সাফল্য পাওয়ার পাশাপাশি রেকর্ডও ভেঙেছে অনেক। ওরিয়ন মহাকাশযানের নিখুঁত পথচলা ও নভোচারীদের অদম্য সাহসিকতা প্রমাণ করেছে, চাঁদে মানুষের নতুন বাড়ি হয়ত খুব বেশি দূরের পথ নয়।

মিশনের প্রথম ছয় দিনের কার্যক্রমেই ইঙ্গিত মিলেছে, ওরিয়ন ক্যাপসুলটি প্রত্যাশা অনুসারেই কাজ করেছে। অ্যাপোলো মিশনের চেয়ে আরও প্রায় ৪ হাজার ১০২ মাইল এগিয়ে গিয়ে পৃথিবী থেকে ২ লাখ ৫২ হাজার ৭৫৭ মাইল দূরত্বে পৌঁছানোর পর চাঁদের চারপাশ প্রদক্ষিণ করে পৃথিবীতে ফিরে এসেছেন নভোচারীরা।

আর্টেমিস মিশন

আর্টেমিস কর্মসূচি হচ্ছে অ্যাপোলো যুগের পর মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার আবারও চাঁদে মানুষ পাঠানোর এক ঐতিহাসিক চন্দ্রাভিযান কর্মসূচি।

‘আর্টেমিস ওয়ান’, ‘আর্টেমিস টু’ ও ‘আর্টেমিস থ্রি’ নামে আর্টেমিস মিশন তিনটি প্রধান ধাপে পরিকল্পিত, যার লক্ষ্য পর্যায়ক্রমে মানুষকে চাঁদে নিয়ে যাওয়া। আর্টেমিস ওয়ান মহাকাশে যায় ২০২২ সালে, যা ছিল মানববিহীন পরীক্ষামূলক ধাপ।

আর্টেমিস ওয়ান মিশনে শক্তিশালী এসএলএস রকেট ও ওরিয়ন ক্যাপসুল কোনো নভোচারী ছাড়াই চাঁদের কক্ষপথ ঘুরে নিরাপদে পৃথিবীতে ফিরে আসে।

এবার হল আর্টেমিস মিশনের প্রথম মানববাহী ধাপ আর্টেমিস টু। এ মিশনে নভোচারীরা ওরিয়ন ক্যাপসুলে করে চাঁদের চারপাশ প্রদক্ষিণ এবং মহাকাশযানের সব ব্যবস্থা পরীক্ষা করেলেও চাঁদে পা রাখেননি।

আর্টেমিস থ্রি মিশনের সম্ভাব্য উৎক্ষেপণ সময় ২০২৭, যা আর্টেমিস মিশনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।

এ ধাপে ৫৫ বছর পর মানুষ পুনরায় চাঁদের মাটিতে পা রাখবে। এরপর আরও কয়েকটি ধাপে আর্টেমিস প্রোগ্রামটি এগিয়ে নিয়ে যেতে চায় নাসা।

আর্টেমিস টু এর অবতরণ দেখার জন্য ক্যালিফোর্নিয়ার স্যান ডিয়েগোর কাছে এয়ার অ্যান্ড স্পেস মিউজিয়ামে ভিড় জমে। ছবি: রয়টার্স

আর্টেমিস টু এর অবতরণ দেখার জন্য ক্যালিফোর্নিয়ার স্যান ডিয়েগোর কাছে এয়ার অ্যান্ড স্পেস মিউজিয়ামে ভিড় জমে। ছবি: রয়টার্স

কেন এই মিশন

শত শত কোটি ডলারের এ সিরিজ মিশনের লক্ষ্য চীনকে প্রতিযোগিতায় হারিয়ে দিয়ে ২০২৮ সালের মধ্যে চাঁদের পৃষ্ঠে নভোচারীদের পুনরায় নিয়ে যাওয়া এবং আগামী দশকে সেখানে দীর্ঘমেয়াদী মার্কিন উপস্থিতি নিশ্চিত করা।

ভবিষ্যতে মঙ্গল গ্রহে সম্ভাব্য মিশনের প্রস্তুতির জায়গা হিসেবে কাজ করবে চাঁদে তৈরি ঘাঁটি। ভবিষ্যতে কেবল চাঁদের পৃষ্ঠে পা রাখাই নয়, বরং সেখানে মানুষের দীর্ঘমেয়াদী উপস্থিতি নিশ্চিত করা ও পরবর্তী ধাপে মঙ্গল অভিযানের প্রস্তুতিপর্ব হিসেবে এ প্রকল্পকে দেখা হচ্ছে।

রয়টার্স লিখেছে, চীনের সঙ্গে ক্রমাগত প্রতিযোগিতার মুখে মহাকাশে নিজেদের নেতৃত্ব ধরে রাখার জন্য আর্টেমিস মিশনকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখছে ওয়াশিংটন।

এসএলএস রকেট

মানুষের মহাকাশ জয়ের স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে নাসা তৈরি করেছে তাদের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় রকেট। ‘স্পেস লঞ্চ সিস্টেম’ বা এসএলএস নামের রকেটের মূল অংশটি ২১২ ফুট দীর্ঘ।

যাত্রার সময় রকেটটি প্রায় ৮৮ লাখ পাউন্ড ধাক্কা বা শক্তি তৈরি করে মহাকাশের দিকে ছুটে গেছে। রকেটের দুই পাশে থাকা দুটি বুস্টারই প্রয়োজনীয় শক্তির প্রায় ৭৫ শতাংশ যোগান দিয়েছে।

এসএলএস রকেটের মূল কাঠামোর প্রধান ঠিকাদার বোয়িং, ‘নরথ্রপ গ্রুম্যান’ হচ্ছে রকেটের সলিডফুয়েল বুস্টারের নির্মাতা।

আর্টেমিস টু উৎক্ষেপণের প্রতিটি পর্যায়, যেমন সর্বোচ্চ বায়ুমণ্ডলীয় চাপ, মূল ইঞ্জিনের কাজ শেষ ও বুস্টার বিচ্ছিন্ন হওয়া এসবই ছিল নাসার কন্ট্রোল রুমের ভাষায় একদম ‘নিখুঁত’।

চাঁদে যাওয়ার নির্ধারিত তিনটি পথ সংশোধনের মধ্যে দুটিরই আর প্রয়োজন পড়েনি। কারণ রকেটের গতিপথ এতটাই নির্ভুল ছিল যে, বাড়তি কোনো পরিবর্তনের দরকার ছিল না।

ফলে মহাকাশযানটি কোনো বড় ধরনের বাড়তি কৌশল ছাড়াই সরাসরি চাঁদের কক্ষপথের দিকে যাত্রা করে।

ওরিয়ন ক্যাপসুল

ওরিয়ন হচ্ছে নাসার বিশালাকার ‘স্পেস লঞ্চ সিস্টেম’ বা এসএলএস রকেটে চড়ে মানুষকে মহাকাশে নিয়ে যাওয়ার জন্য তৈরি মহাকাশযান।

এ ক্যাপসুলের মধ্যে করেই প্রায় ১০ দিনের এ মিশনে নভোচারীরা চাঁদের চারপাশে চক্কর দিয়ে পুনরায় পৃথিবীতে ফিরে এলেন।

ওরিয়নের প্রধান দুটি অংশের একটি হচ্ছে ‘ক্রু মডিউল’, যেখানে নভোচারীরা ছিলেন। দ্বিতীয়টি ‘ইউরোপীয় সার্ভিস মডিউল’, যা বিদ্যুৎ ও বাতাস সরবরাহ করেছে।

ক্যাপসুলটির বিশেষ ‘হিটশিল্ড’ বা তাপ সুরক্ষা ব্যবস্থা ২৭০০° সেলসিয়াস পর্যন্ত তাপ সহ্য করে নিরাপদে বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করেছে।

‘লকহিড মার্টিন’-এর তৈরি ক্যাপসুলটি অন্য যে কোনো সময়ের চেয়ে উন্নত ও দ্রুতগামী। ২১ দিন পর্যন্ত চার জন নভোচারীকে নিয়ে মহাকাশে থাকতে পারবে এ ক্যাপসুল।

উৎক্ষেপণের একদিন পরই ওরিয়ন মহাকাশযানটি এর প্রধান ইঞ্জিন ৫ মিনিট ৫৫ সেকেন্ডের জন্য চালু করে, যা ‘ট্রান্সলুনার ইনজেকশন বার্ন’ নামে পরিচিত। এ কাজটি সফলভাবে করেছে ওরিয়ন।

মিশনের ১০ দিনে যা যা হল

নভোচারীরা প্রথম এক থেকে দুই দিন পৃথিবীর উচ্চ কক্ষপথে অবস্থান করে মহাকাশযানের বিভিন্ন সিস্টেম পরীক্ষা করেন। যার মধ্যে রয়েছে ওরিয়নের ‘লাইফ সাপোর্ট’ বা জীবন রক্ষাকারী ব্যবস্থা, প্রপালশন বা চালিকাশক্তি, নেভিগেশন ও যোগাযোগ ব্যবস্থা যাচাই করা।

পরীক্ষা সফলভাবে সম্পন্ন হওয়ার পর ওরিয়নের প্রপালশন সিস্টেম গুরুত্বপূর্ণ ইঞ্জিন বার্ন বা ‘ট্রান্সলুনার ইনজেকশন’ প্রক্রিয়াও সম্পন্ন করে। যার মাধ্যমে মহাকাশযানটি পৃথিবীর কক্ষপথ থেকে বেরিয়ে চাঁদের অভিমুখে নিজের যাত্রা শুরু করতে পেরেছে।

উৎক্ষেপণের তিন থেকে চার দিনে চাঁদের দিকে যাত্রা করেন নভোচারীরা। চাঁদে পৌঁছানোর এ কয়েক দিনের যাত্রাপথে নভোচারীরা মহাকাশযানের বিভিন্ন সিস্টেম পর্যবেক্ষণের কাজটি চালিয়ে গেছেন।

ওরিয়ন ‘ফ্রি রিটার্ন ট্র্যাজেক্টোরি’ বা কক্ষপথ ব্যবহার করে চাঁদের পেছন দিক দিয়ে ঘুরে আসে। এ বিশেষ পথটি এমনভাবে তৈরি, যাতে কোনো বাড়তি জ্বালানি খরচ না করেই মহাকাশযানটি প্রাকৃতিকভাবে আবার পৃথিবীতে ফিরতে পারে।

পৃথিবীর কাছাকাছি পৌঁছানোর পর ওরিয়ন ঘণ্টায় প্রায় ৪০ হাজার ২৩৩ কিলোমিটার বেগে বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করেছে।

ঐতিহাসিক ‘ফ্লাইবাই’

পৃথিবী থেকে রেকর্ড ২ লাখ ৫২ হাজার ৭৫৬ মাইল দূরত্ব পেরিয়ে চাঁদের রহস্যময় অন্ধকার অংশ ঘুরে এসেছেন নাসার ঐতিহাসিক আর্টেমিস টু মিশনের চার নভোচারী।

চাঁদ প্রদক্ষিণের এই যাত্রা বা ফ্লাইবাই প্রায় ছয় ঘণ্টা স্থায়ী হয়। এ যাত্রাপথে পৃথিবী থেকে মানুষের মহাকাশে সবচেয়ে বেশি দূরত্বে ভ্রমণের নতুন রেকর্ড গড়েন নভোচারীরা। চাঁদের ‘ফার সাইড’ বা অন্ধকার অংশ প্রদক্ষিণ করার সময় তারা সেই দৃশ্য দেখেন, যা আগে কখনো কোনো মানুষ দেখেনি।

নাসা জানিয়েছে, চাঁদের চারপাশ ঘুরে আসতে মিশনের ওরিয়ন ক্যাপসুলের সময় লেগেছে সাত ঘণ্টার মত। এ সময় চাঁদের দূরবর্তী অংশের ছবিও ধারণ করেছেন নভোচারীরা।

১৯৭২ সালে অ্যাপোলো ১৭ মিশনের পর মানবজাতির প্রথম চাঁদে প্রত্যাবর্তনের মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হল এবারের অভিযান। এর আগে ১৯৭০ সালে অ্যাপোলো ১৩ মিশনের নভোচারীরা পৃথিবী থেকে ২ লাখ ৪৮ হাজার ৬৫৫ মাইল দূরত্ব পেরিয়েছিলেন।

সেই দূরত্ব পেরিয়ে আরো প্রায় ৪ হাজার ১০২ মাইল এগিয়ে গিয়ে পৃথিবী থেকে ২ লাখ ৫২ হাজার ৭৫৭ মাইল দূরত্বে পৌঁছানোর নতুন রেকর্ড গড়েন এবারের অভিযানের চার নভোচারী।

রেকর্ড দূরত্ব পেরিয়ে নভোচারীদের বার্তা

অ্যাপোলো ১৩ এর রেকর্ড ভাঙার পর কানাডীয় নভোচারী জেরেমি হ্যানসেন বলেন, “আমরা পৃথিবী থেকে মানুষের এ যাবৎকালের সবচেয়ে দূরবর্তী পথ পেরিয়েছি। মহাকাশ গবেষণায় আমাদের পূর্বসূরীদের অসাধারণ পরিশ্রম ও সাফল্যকে সম্মান জানিয়েই আমরা এ কৃতিত্ব পেলাম।”

সবশেষে তিনি বর্তমান ও পরবর্তী প্রজন্মের উদ্দেশ্যে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে বলেন, “তোমাদের নিশ্চিত করতে হবে যেন এই রেকর্ডটি খুব বেশিদিন টিকে না থাকে। তোমরা যেন শিগগিরই রেকর্ডটি ভেঙে আরও দূরে যেতে পার।”

সবচেয়ে বেশি দূরত্বে ভ্রমণের নতুন রেকর্ড গড়ার পর এক হৃদয়স্পর্শী মুহূর্তে জেরেমি হ্যানসেন বলেন, তারা চাঁদের দুটি নতুন গহ্বরের নামকরণ করতে চান, যা তারা মহাকাশযান থেকে খালি চোখে দেখতে পাচ্ছেন।

চাঁদের ‘ওম’ গর্তের কাছে অবস্থিত এক গহ্বরেন নাম রাখা হয়েছে তাদের ওরিয়ন মহাকাশযানের সম্মানে ‘ইন্টেগ্রিটি’। ‘গ্লুশকো’ নামের এক উজ্জ্বল গর্তের পাশে অন্য গহ্বরের নাম তারা দিয়েছেন ‘ক্যারল’। আর্টেমিস টু মিশনের কমান্ডার রিড ওয়াইজম্যানের প্রয়াত স্ত্রী ক্যারল টেলর ওয়াইজম্যানের স্মরণে এই নামকরণ।

পেশায় নার্স ক্যারল ২০২০ সালে ক্যান্সারের সঙ্গে লড়াই করে মারা যান।

আর্টেমিস টু মিশনের নভোচারীরা চাঁদের উল্টো পাশে গেলে পৃথিবী ও মহাকাশযানের মধ্যে বাধা হয়ে দাঁড়ায় চাঁদ। এ সময় রেডিও সিগন্যাল যাতায়াত করতে না পারায় প্রায় ৪০ মিনিট পৃথিবী থেকে নভোচারীদের সঙ্গে যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন ছিল।

অ্যাপোলো ১৩ বনাম আর্টেমিস টু

১৯৭০ সালের অ্যাপোলো ১৩ মিশনটি আসলে যতটা দূরে যাওয়ার কথা ছিল, তার চেয়েও বেশি দূরে গিয়েছিল। পরিকল্পনা ছিল তারা চাঁদকে প্রদক্ষিণ করে সেখানে অবতরণ করবে। তবে যাত্রাপথে অক্সিজেন ট্যাংক বিস্ফোরিত হওয়ায় সেই পরিকল্পনা ভেস্তে যায়।

ওই সময় গ্রাউন্ড কন্ট্রোল ও তিন নভোচারী লোভেল, ফ্রেড হাইস ও জ্যাক সুইগার্ট সঙ্গে সঙ্গে পরিকল্পনা বদলে ফেলেন। সব প্রতিকূলতা জয় করে তারা চাঁদকে কেবল প্রদক্ষিণ করে সফলভাবে পৃথিবীতে ফিরে আসেন।

এর বিপরীতে, আর্টেমিস টু মিশনটি একদম নির্ধারিত পরিকল্পনা অনুসারে এগিয়েছে। মিশনটি পরীক্ষামূলক এক যাত্রা, যা প্রমাণ করেছে ওরিয়ন মহাকাশযানটি গভীর মহাকাশে নভোচারীদের নিরাপদে রাখতে পারে।

আর্টেমিস টু মিশনের যা যা রেকর্ড

সবচেয়ে বেশি দূরত্বে ভ্রমণের রেকর্ডটি এই মিশনের অনেকগুলো সাফল্যের মধ্যে একটি।

১ এপ্রিল যাত্রা শুরু করা আর্টেমিস টু নাসার আর্টেমিস প্রোগ্রামের প্রথম মানুষবাহী মিশন। ১৯৭২ সালের অ্যাপোলো ১৭ মিশনের পর এটিই প্রথম মানববাহী মহাকাশযাত্রা, যা পৃথিবীর নিম্ন কক্ষপথ ছাড়িয়ে এত দূরে গেছে।

এ মিশনে আরও কিছু ঐতিহাসিক রেকর্ড হয়েছে। প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ ব্যক্তি হিসেবে পৃথিবীর নিম্ন কক্ষপথ পেরিয়েছেন আর্টেমিস টু-এর পাইলট ভিক্টর গ্লোভার। মিশন স্পেশালিস্ট ক্রিস্টিনা কোচ ও জেরেমি হ্যানসেন হলেন যথাক্রমে প্রথম নারী ও প্রথম অ-মার্কিন নাগরিক, যারা এ ইতিহাসের সঙ্গী হলেন।

আর্টেমিস টু থেকে পাওয়া শিক্ষা

যুক্তরাষ্ট্রের কেনেডি স্পেস সেন্টারের লঞ্চ প্যাডে নাসার এসএলএস রকেটটি পৌঁছানোর কয়েক দিনের মধ্যেই আর্টেমিস টু মিশনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাটি মিলেছে।

ফেব্রুয়ারি ও মার্চে আলাদা আলাদা কারিগরি ত্রুটির কারণে দুবার উৎক্ষেপণ স্থগিত হওয়ার পর নাসা প্রশাসক জ্যারেড আইজ্যাকম্যান বলেছিলেন, “এসএলএস-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ ও জটিল রকেট প্রতি তিন বছর অন্তর উৎক্ষেপণ করা সাফল্যের কোনো পথ হতে পারে না।”

এর আগের মানববিহীন আর্টেমিস ওয়ান মিশনটি ২০২২ সালের নভেম্বরে যাত্রা করেছিল।

আইজ্যাকম্যান বলেন, প্রতিটি রকেটকে ‘শিল্পকর্ম’ হিসেবে দেখা বন্ধ করে এমন এক পেশাদার প্রোগ্রামের মতো নিয়মিত উৎক্ষেপণ শুরু করতে হবে, যা সত্যিকার অর্থেই বড় লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে।

নাসা প্রশাসকের সেই উচ্চাকাঙ্ক্ষার নিরিখে বিচার করলে, ১ এপ্রিল নভোচারীরা মহাকাশে পাড়ি দেওয়ার পর গত দশ দিনে এ মিশন শিখিয়েছে, চরম উৎসাহীরা যা আশা করেছিলেন এই মিশন তার চেয়েও বেশি কিছু করে দেখিয়েছে।

ওরিয়ন-নভোচারীদের মেলবন্ধন

এ মিশনের মূল উদ্দেশ্য ওরিয়ন মহাকাশযানের ভেতরে মানুষকে রাখা এবং এর প্রভাব পর্যবেক্ষণ করা। কেবল মহাকাশযানের ক্ষেত্রে নয়, বরং মানুষ ও যন্ত্রের মধ্যকার মিথস্ক্রিয়া কেমন হয় তা-ও বোঝা।

এখন পর্যন্ত যা যা ঘটেছে তা ঠিক যেমনটা আশা করা হয়েছিল তেমনই এবং এসব অভিজ্ঞতা কখনোই কোনো সিমুলেটর বা কৃত্রিম পরিবেশে বসে শেখা সম্ভব নয়।

ইঞ্জিনিয়াররা ওরিয়নের কার্বন ডাই অক্সাইড অপসারণ ব্যবস্থা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন। এজন্য আর্টেমিস টু নভোচারীরা টানা শরীরচর্চা করছেন, যা সিস্টেমে বাড়তি চাপ তৈরি করেছে। রকেটের থ্রাস্টারগুলো ইচ্ছা করে বন্ধ রেখেও পরীক্ষা করা হয়েছে যে, মহাকাশযানটি কীভাবে তা সামাল দেয়।

মিশনের প্রতিটি পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত করা হয়েছে যে নভোচারীদের নিয়ে চাঁদের পৃষ্ঠে নামার জন্য এ মহাকাশযানটি যথেষ্ট নিরাপদ।

ধরা পড়েছে কিছু সমস্যাও

আর্টেমিস টু অভিযানের পথে কিছু সমস্যাও দেখা দিয়েছিল। যেমন, শৌচাগার বা টয়লেটে সমস্যা ও পানি সরবরাহ ব্যবস্থায় ত্রুটি।

ফলে নভোচারীদের ব্যাগে করে পানি সংরক্ষণ করতে হয়েছে। হিলিয়াম সিস্টেমে সামান্য ত্রুটির কথা শুরুর দিকে নাসার সংবাদ সম্মেলনে জানানো হলেও তা পরে নীরবেই সমাধান করেছে সংস্থাটি।

কেবল বিজ্ঞানই এ মিশনের মূল লক্ষ্য নয়

মিশনের সবচেয়ে আবেগঘন মুহূর্তটি কোনো যন্ত্রের মাধ্যমে আসেনি, এসেছে নভোচারীদের কাছ থেকে।

১৯৭০ সালে অ্যাপোলো ১৩ মিশনের দূরত্বের রেকর্ড যখন আর্টেমিস টু ক্রু সদস্যরা ভেঙে দেন তখন মিশন স্পেশালিস্ট হ্যানসেন হিউস্টনের মিশন কন্ট্রোলে যোগাযোগ করেন।

তিনি বলেন, চাঁদের দৃশ্যমান অংশ ও দূরবর্তী অংশ বা উল্টো পিঠের সীমানায় ‘গ্লুশকো’ গর্তের উত্তর-পশ্চিমে এক উজ্জ্বল বিন্দুর মতো এক গহ্বর দেখা যাচ্ছে। তারা এ গহ্বরটির নাম ‘ক্যারল’ রাখতে চান, যিনি মিশন কমান্ডার রিডের স্ত্রী এবং কেটি ও এলির মা।

এরপর ৪৫ সেকেন্ড সেখানে পিনপতন নীরবতা বিরাজ করে। সেই মুহূর্তটি কেবল আবেগের কারণেই গুরুত্বপূর্ণ নয়। যেসব মহাকাশ কর্মসূচি মানুষের অকৃত্রিম ও স্বতঃস্ফূর্ত আবেগ তৈরি করতে পারে না, সেগুলো খুব বেশিদিন টিকে থাকে না।

‘অ্যাপোলো’ মিশন যে আজও মানুষের স্মৃতিতে অমলিন, তার কারণ কেবল এর প্রকৌশলগত উৎকর্ষ নয়, বরং মানুষের সাহস এবং অজানাকে ছোঁয়ার আকুলতা মিশনটি যেভাবে ফুটিয়ে তুলেছিল, তা অনন্য।

সফল প্রত্যাবর্তন

ওরিয়নের ফেরার সময়ের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জটি ছিল পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে পুনরায় প্রবেশ। ঠিক এ মুহূর্তটি নিয়েই ‘আর্টেমিস ওয়ান’ মিশনের পর অনেক উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল।

ওই সময় হিট শিল্ড বা তাপ নিরোধক ঢালের অপ্রত্যাশিত ক্ষতি হয়। তার কারণ খুঁজতে গিয়ে আর্টেমিস টু মিশনটি এক বছরের বেশি সময় পিছিয়ে যায়।

তবে এবার আর কোনো বিপত্তি ঘটেনি। ওরিয়ন ক্যাপসুলটি ঘণ্টায় প্রায় ৪০ হাজার কিলোমিটার বেগে বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করে এবং পরে নিরাপদেই প্রশান্ত মহাসাগরে নেমে আসে।

এ পরীক্ষার ফলাফলই নির্ধারণ করে দিল আর্টেমিস টু মিশনের প্রকৃত সাফল্য, যা চাঁদের উল্টো পিঠের যে কোনো ছবির চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ।

ক্যাপসুলটি প্রচণ্ড গতিতে প্রায় ঘণ্টায় ২৫,০০০ মাইল বেগে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করেছে। ঘর্ষণের ফলে এর বাইরের তাপমাত্রা প্রায় ৫ হাজার ডিগ্রি ফারেনহাইটে পৌঁছালেও এর হিট-শিল্ড নভোচারীদের রক্ষা করতে পেরেছে।

অবশেষে তিনটি বিশাল প্যারাশুট খুলে আলতো করে প্রশান্ত মহাসাগরে অবতরণ করে ওরিয়ন।

নাসা বলেছে, এ মিশনের সাফল্য আগামী কয়েক দশকের মধ্যে মঙ্গল গ্রহে মানুষ পাঠানোর স্বপ্নকে আরও একধাপ এগিয়ে দিল।