ইরাক যুদ্ধের মতো ভুল গোয়েন্দা তথ্য নয়, বরং সঠিক গোয়েন্দা মূল্যায়ন উপেক্ষা করেই ইরান যুদ্ধে জড়িয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প—এমনটাই উঠে এসেছে বিশ্লেষণে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সাময়িকী The Atlantic-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তথ্যের দিক থেকে এবার মার্কিন গোয়েন্দারা সঠিক ছিল; কিন্তু রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে।
২০০৫ সালে ইরাক যুদ্ধ পর্যালোচনায় এক দ্বিদলীয় কমিশন বলেছিল, গণবিধ্বংসী অস্ত্র সংক্রান্ত গোয়েন্দা তথ্য ছিল ‘সম্পূর্ণ ভুল’। সেই ভুল তথ্যের ভিত্তিতেই তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ ইরাক আক্রমণ করেন।
কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপটে বিশ্লেষকদের মতে, পরিস্থিতি ভিন্ন। এবার গোয়েন্দা তথ্য সঠিক হলেও তা উপেক্ষা করেছেন ট্রাম্প।
গোয়েন্দা সতর্কতা বনাম প্রেসিডেন্টের দাবি
মার্কিন গোয়েন্দারা ট্রাম্পকে জানিয়েছিলেন, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের প্রস্তুতি নিচ্ছিল না এবং যুক্তরাষ্ট্রে আঘাত হানতে সক্ষম ক্ষেপণাস্ত্র তাদের নেই। এমনকি হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরির সম্ভাবনার কথাও তারা আগেই সতর্ক করেছিলেন।
তবে ট্রাম্প দাবি করেন, ইরান দ্রুতই যুক্তরাষ্ট্রে আঘাত হানতে সক্ষম ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করবে এবং মধ্যপ্রাচ্যে আধিপত্য বিস্তার করবে।
মার্কিন প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা সংস্থার (DIA) মূল্যায়ন অনুযায়ী, ইরানের আন্তঃমহাদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্র তৈরিতে অন্তত ২০৩৫ সাল পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।
হরমুজ প্রণালি ও বৈশ্বিক অর্থনীতি
গোয়েন্দাদের সতর্কতা উপেক্ষার অন্যতম বড় উদাহরণ হিসেবে উঠে এসেছে হরমুজ প্রণালি।
গোয়েন্দারা আগেই সতর্ক করেছিলেন, এই নৌপথ বন্ধ হয়ে গেলে বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধাক্কা লাগবে। কিন্তু যুদ্ধের পর ইরান কার্যত এই প্রণালিতে নিয়ন্ত্রণ জোরদার করে এবং জাহাজ চলাচলে বাধা সৃষ্টি করে।
এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বেড়ে যায় এবং জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়।
উপদেষ্টাদের মত উপেক্ষা
মার্কিন গোয়েন্দা ও সামরিক উপদেষ্টারা বারবার সম্ভাব্য পাল্টা হামলা, উপসাগরীয় অঞ্চলে অস্থিতিশীলতা এবং অর্থনৈতিক ঝুঁকির কথা তুলে ধরলেও ট্রাম্প তা গুরুত্ব দেননি বলে অভিযোগ উঠেছে।
ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্স পরিচালক তুলসি গ্যাবার্ড কংগ্রেসে জানান, ইরান ভবিষ্যতে ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা বাড়াতে পারে, তবে তাৎক্ষণিক কোনো হুমকি ছিল না।
এদিকে সিআইএ পরিচালক জন র্যাটক্লিফ বলেন, ইরানের পক্ষ থেকে আঞ্চলিক জ্বালানি স্থাপনায় হামলার পরিকল্পনার তথ্য ছিল।
যুদ্ধের প্রতিক্রিয়া ও সমালোচনা
যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই ট্রাম্প প্রশাসনের ভেতরে-বাইরে সমালোচনা শুরু হয়। হোয়াইট হাউজের ভেতরেও মতবিরোধ দেখা দেয়, এমনকি এক শীর্ষ উপ-সহকারী পদত্যাগ করেন।
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প যদি গোয়েন্দা তথ্য সঠিকভাবে উপস্থাপন করতেন, তাহলে যুদ্ধ এড়ানো বা অন্তত কূটনৈতিক সমাধানের সুযোগ তৈরি হতে পারত।
ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি?
দুই দশক আগে ভুল গোয়েন্দা তথ্য গ্রহণ করে ইরাক যুদ্ধে জড়িয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। আর এখন সঠিক তথ্য উপেক্ষা করে ইরান যুদ্ধে জড়ানোর অভিযোগ উঠছে।
বিশেষজ্ঞদের ভাষায়, যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা কাঠামো তথ্য দিতে পারে, কিন্তু প্রেসিডেন্ট যদি সেই তথ্য উপেক্ষা করেন বা বিকৃত করেন, তার দায় শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক নেতৃত্বের ওপরই বর্তায়।
পূর্বের পোস্ট :